Sunday 05 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রেশন কমায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে উদ্বেগ ও ক্ষোভ

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৩৫

নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পের মেহের খাতুন।

কক্সবাজার: কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পে তিন ছেলে-মেয়েসহ আট সদস্যের পরিবার নিয়ে বসবাস করেন মেহের খাতুন। প্রায় এক দশক আগে স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে দাতা সংস্থার খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভর করেই চলছে তার পরিবারের জীবনযুদ্ধ। সেই লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠেছে একটি শারীরিক প্রতিবন্ধী সন্তানকে ঘিরে।

মেহের খাতুনের ছেলে ইব্রাহিম সাত বছর আগে ক্যাম্পে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এর একটি গাড়ির ধাক্কায় পা হারায়। সেই ঘটনার পর থেকেই পরিবারটির জীবনে অনিশ্চয়তা যেন স্থায়ী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে উখিয়া-টেকনাফ ও ভাসানচরের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নতুন পদ্ধতিতে খাদ্য সহায়তা বিতরণ শুরু হয়েছে। আগে প্রতি ব্যক্তির জন্য নির্ধারিত ১২ ডলারের পরিবর্তে এখন পরিবারভেদে ৭, ১০ ও ১২ ডলারের তিনটি ক্যাটাগরিতে রেশন দেওয়া হচ্ছে। নতুন এই পদ্ধতি ঘিরে ক্যাম্পজুড়ে দেখা দিয়েছে চরম অসন্তোষ।

বিজ্ঞাপন

রোহিঙ্গারা আশঙ্কা করছেন, রেশন কমানোর ফলে খাদ্যসংকট, অপুষ্টি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে মেহের খাতুনের মতো অসহায় পরিবারগুলো পড়েছেন সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায়। দীর্ঘদিন ধরে শুধুমাত্র এই রেশনের ওপর নির্ভর করে যারা বেঁচে ছিলেন, তাদের জীবনে নেমে এসেছে নতুন অনিশ্চয়তা।

মেহের খাতুন বলেন, ‘কোনো ভেদাভেদ না করে সবাইকে সমান হারে রেশন দিতে হবে। আগের রেশনেই যেখানে চলা কঠিন ছিল, সেখানে এখন কমে গেলে বেঁচে থাকাই দুষ্কর হয়ে পড়বে।’

একই ধরনের সংকটে রয়েছেন হাসিনা বেগম। সাত মেয়ে ও এক প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে তার সংসার। সম্প্রতি তার ছেলেকে অপহরণ করে নির্যাতনের পর মুক্তিপণ দিয়ে ফিরিয়ে আনা হলেও সে এখন শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছে।

হাসিনা বেগম বলেন, ‘ক্যাম্পের নানা বিধিনিষেধের মধ্যে জীবনযাপনই কঠিন। বাইরে কাজের সুযোগ নেই। এর মধ্যে রেশন কমে গেলে সন্তানদের নিয়ে কীভাবে বাঁচব, তা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’

টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের একটাই দাবি, কোনো ভেদাভেদ ছাড়াই আগের মতো সমান হারে রেশন প্রদান এবং নতুন এই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। তাদের আশঙ্কা, এই সিদ্ধান্তে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটতে পারে।

এ বিষয়ে টেকনাফের তিনটি ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা ক্যাম্প ইনচার্জ ও অতিরিক্ত সচিব খানজাদা শাহরিয়ার বিন মান্নান জানান, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির অর্থসংকটের কারণে ‘প্রয়োজনভিত্তিক’ সহায়তা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষকে মাসে ৭ ডলার, ৫০ শতাংশকে ১০ ডলার এবং ৩৩ শতাংশকে ১২ ডলার করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। নারী-নেতৃত্বাধীন পরিবার, প্রতিবন্ধী সদস্য বা বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইউএনএইচসিআরের ডাটাবেজ ব্যবহার করা হচ্ছে।’

তিনি আরও জানান, এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কিছু ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেছেন এবং কোথাও কোথাও রেশন গ্রহণ থেকেও বিরত রয়েছেন। তবে বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলা অবনতির আশঙ্কা নেই বলেও মনে করেন তিনি।

খাদ্য সহায়তা কমানোর প্রতিবাদে গত ১ এপ্রিল ও বৃহস্পতিবার টেকনাফের ২৪ নম্বর ও নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন রোহিঙ্গারা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কিছু ক্যাম্পে রেশন সংগ্রহে অনীহা রয়েছে। ২৪ ও ২৫ নম্বর ক্যাম্পে মাত্র ১০ থেকে ১২টি পরিবার রেশন নিয়েছে। তবে ২৬ ও ২৭ নম্বর ক্যাম্পে শতাধিক পরিবার খাদ্য সংগ্রহ করেছে।

রেশন কমানোর এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে টেকনাফের শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে এখন বাড়ছে উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা এবং ক্ষোভ। যা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সারাবাংলা/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর