রংপুর: রংপুর মহানগরীতে জ্বালানি তেলের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন বন্ধ, কয়েকটার সামনে ‘অকটেন ও পেট্রোল নেই’ লেখা নোটিশ ঝুলছে, কোথাও প্রবেশপথে আড়াআড়ি দড়ি টানা। যে দু-একটি পাম্প খোলা আছে, সেখানে শুধু সিএনজি প্রাইভেটকারে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। খোলা পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন ও উপচে পড়া ভিড়—ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অধিকাংশ চালক তেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন। অনেক মোটরসাইকেল রাস্তায় অচল হয়ে পড়েছে। এই সংকট শুধু যানবাহন চলাচল নয়, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকেই পুরোপুরি স্তব্ধ করে দিয়েছে।
রোববার (৫ এপ্রিল) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রংপুর নগরীর অর্ধশতাধিক ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, মাত্র একটি ছাড়া বাকি সবগুলো ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহ বন্ধ।
১০টি পাম্পে সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়—কোথাও নোটিশ ঝুলছে, কোথাও আবার দড়ি টানা, কর্মচারীরা বলছেন, ‘তেল নেই, ডিপো থেকে আসেনি।’ পার্বতীপুর ডিপোতে শুক্রবার (৩ এপ্রিল) ট্যাংক-লরি পাঠানো হয়েছে, কিন্তু এখনও ফেরেনি। কবে আসবে, কোনো নিশ্চয়তা নেই।
নগরীর সালেক ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায় দীর্ঘ মোটরসাইকেলের লাইন, কিন্তু তেল নেই তার সাইনবোর্ড ঝুলছে। ম্যানেজার আশরাফ হোসেন জানান, শুক্রবার (৩ এপ্রিল) বিকেলে মাত্র ২ হাজার লিটার পেট্রোল এসেছিল, রাতেই বিক্রি হয়ে গেছে। আমাদের দৈনিক চাহিদা ৫ হাজার লিটার, কিন্তু ডিপো থেকে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২ হাজার লিটার। ফলে দুই ঘণ্টার মধ্যে তেল শেষ তাই দিনের বাকি সময় বন্ধ রাখতে হয়।
শাপলা চত্বরের ইউনিক ট্রেডার্স ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র। কর্মচারী রিপন বলেন, ‘প্রতিদিনের চাহিদা ৪ হাজার লিটার কিন্তু দেওয়া হচ্ছে ২ হাজার লিটার। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) রাতে লরি ডিপোতে গেছে, এখনও আসেনি। ভোর থেকে আধা মাইল লাইন তেল না পেয়ে শত শত চালক ফিরে যাচ্ছেন।’
মোটরসাইকেল চালকদের অভিযোগ আরও করুণ। অনেকে বলছেন, ‘৮-১০টা পাম্প ঘুরে ২০০ টাকার তেল পাই, তা দিয়েও বেশি দূর যাওয়া যায় না। খুঁজতে খুঁজতে নিজের তেলই শেষ হয়ে যায়। ফলে হাজারো মোটরসাইকেল অচল, চালকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা।
রংপুর জেলা ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক আশফাক মাহাতাব বলেন, ‘আগে জানানো হতো কখন কোন পাম্পে তেল আসবে। এখন পুরোপুরি সমন্বয়হীনতা চলছে। চালকরা এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরে হয়রান হয়ে যাচ্ছেন। এটা ভোগান্তি ছাড়া আর কিছু নয়।’
সম্প্রতি রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় ট্যাংকলরি শ্রমিকদের কর্মবিরতির কারণে পার্বতীপুর ডিপো থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়েছিল। যদিও পরে কর্মবিরতি প্রত্যাহার হয়েছে, তবু সরবরাহে সমন্বয়হীনতা ও রেশনিংয়ের কারণে সংকট কাটছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু মহল কৃত্রিম সংকট তৈরি করে খোলাবাজারে চড়া দামে তেল বিক্রি করছে এবং ইটভাটায় অবৈধ মজুত রাখছে। প্রশাসনের কার্যকর তদারকি ও সমন্বয় বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রমিজ আলম বলেন, ‘জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। পেট্রোল ও অকটেন নিয়ম করে দেওয়া হচ্ছে। আমরা সার্বিক বিষয়ে নজর রাখছি।’
কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। সারাবাংলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, রেশনিংয়ের নামে চাহিদার অর্ধেকেরও কম তেল পাওয়ায় পাম্প মালিকরা বাধ্য হয়ে বেশিরভাগ সময় বন্ধ রাখছেন। ফলে সাধারণ চালকরা চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। সংকট দ্রুত সমাধান না হলে পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা লাগবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।