Friday 10 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

শোভাযাত্রার আঁতুড়ঘর যশোরে বর্ষবরণ ঘিরে চলছে প্রস্তুতি

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১০ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৪৯

চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ছবি: সারাবাংলা

যশোর: দরজায় কড়া নাড়ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ। পুরাতন বছরকে বিদায় দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত যশোরের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। বৈশাখ উদযাপনকে রঙিন করতে মঙ্গল শোভাযাত্রার আতুরঘর যশোরে এবারও জমে উঠেছে বর্ষবরণের প্রস্তুতি।

পহেলা বৈশাখের উৎসবকে ফুটিয়ে তুলতে শোভাযাত্রার জন্যে তৈরি হচ্ছে বর্ণিল মুখোশ, রঙিন ফুল-পাখি। চলছে নাচ, গান, নাটকের অনুশীলন। আয়োজন ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা। কয়েক বছর রমজানে বর্ষবরণ থাকাতে জাঁকজমকপূর্ণ হয়নি অনুষ্ঠান। তবে এবার ঈদের পরে বর্ষবরণ হওয়ায় যেন প্রাণের ছোঁয়া লেগেছে সংস্কৃতির শহরে। এখন চলছে শেষ সময়ের প্রস্তুতি।

বিজ্ঞাপন

পহেলা বৈশাখের অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গলশোভাযাত্রা। যার সূচনা হয় যশোরের চারুপীঠ থেকে। এ বছর ‘নিত্য নতুনের অমৃতধারা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে কাজ করছে সংগঠনটি। বর্ষবরণে বর্ণিল শোভাযাত্রা করতে মুখোশ, পায়রা, মোরগ, শিয়াল, হাতি-ঘোড়া, পেঁচা তৈরি করেছেন তারা। শোভাযাত্রায় অংশ নিতে কাজ করছেন অন্যান্য সংগঠনগুলোও।

মাহবুব জামাল শামীম ও হীরণ্ময় চন্দ্রের উদ্যোগে ১৯৮৫ সালে যশোরে নববর্ষের প্রথম শোভাযাত্রা বের হয়। পরে ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে তা সম্প্রসারিত হয়েছে। যা এখন জাতিসংঘের ইউনেস্কো স্বীকৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে শোভাযাত্রার নাম নিয়ে বিতর্ক হলেও তা নিয়ে কোন আক্ষেপ নেই সূচনাকারীদের। তবে মানুষের প্রাণের আনন্দ, কৃষ্টি, শিক্ষা, বিজ্ঞান গবেষণা এসবকে রাজনীতির উর্দ্ধে রাখার দাবি তাদের।

চলছে বর্ষবরণের প্রস্তুতি। ছবি: সারাবাংলা

কাগজ কেটে কেউ ফুল, প্যাঁচা, গড়ছেন। সবচেয়ে বড় আকর্ষণ থাকছে নতুন ভোরের বার্তাবাহক মোরগের ১৮ ফুট উচ্চতার বিশাল এক রেপ্লিকা, যা এরই মধ্যেই মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। লাল-হলুদ-সবুজের মিশেলে তৈরি হচ্ছে মোরগ। নতুন দিনের জাগরণের প্রতীক হিসেবেই ধরা হচ্ছে এটিকে। পাশাপাশি থাকছে সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে বড় আকৃতির শান্তির প্রতীক পায়রা। আর শিয়ালের প্রতিকৃতি গ্রামীণ জীবনের চিরচেনা ছাপ তুলে ধরবে।

আয়োজন শুধু এতেই সীমাবদ্ধ নয়। বৈশাখী শোভাযাত্রাকে বর্ণিল করে তুলতে প্রস্তুত করা হয়েছে ৩০০টি রাজা-রানির মুকুট, ২০০টি রঙ-বেরঙের মুখোশ এবং ৫০টি থিমভিত্তিক ফেস্টুন। ‘নিত্য নতুনের অমৃতধারা’ প্রতিপাদ্য নিয়ে কাজ করছেন সংগঠনটি। বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ-সংঘাতের প্রেক্ষাপটে শান্তি, সম্প্রীতি ও সবুজ পৃথিবীর বার্তা দিতে চান তারা।

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা দেশে প্রথম শোভাযাত্রার আয়োজক মাহবুব জামিল শামীম। গত বছর পহেলা বৈশাখে চারুশিল্পী মাহবুব জামাল শামীমকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এ বছরের সার্বিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘আমরা যখন প্রথম শুরু করি, তখনই বলেছিলাম বিভিন্ন অঞ্চল বিভিন্ন নাম রাখতে পারবে এই শোভাযাত্রার। শোভাযাত্রা যে উদ্দেশ্যে করা, তা হলো অঞ্চলে অঞ্চলের সংস্কৃতির চর্চা। এখন নাম পরিবর্তন হয়েছে; সেটা তো আমার কিছু করার নেই। আমি একজন সংস্কৃতি কর্মী। সংস্কৃতি কর্মীরা বিবাদে জড়ায় না। তারা চায় বন্ধুত্ব। যে নামই হোক না কেন-এটার যে লক্ষ্য ছিল তা থেকে বিচ্যুত না হই আমরা। আমরা চাই এই আয়োজনটি হোক সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে একটি সার্বজনীন উৎসব। বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ-সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আমরা শান্তি, সম্প্রীতি ও সবুজ পৃথিবীর বার্তা দিতে চাই।’

চারুপীঠ প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা যায় কেউ কাগজ কেটে ফুল, প্যাঁচা কিংবা নানা পাখ-পাখালির আদল গড়ছেন; কেউ গভীর মনোযোগে আঁকছেন নকশা। রঙে রঙে প্রাণ পাচ্ছে মুখোশগুলো। শিল্পীদের চোখ-মুখে ক্লান্তি থাকলেও তাতে নেই বিরক্তি, বরং আছে এক ধরনের তৃপ্তি আর ভালোবাসা।

ছবি: সারাবাংলা

শোভাযাত্রার জন্য চারুতীর্থ যশোরও তৈরি করছে মুখোশ, পাখি, ফেস্টুনসহ প্রাণ প্রকৃতি। তবে আধুনিকতার ভিড়ে এসব শোভাযাত্রার অনুসঙ্গের ঐতিহ্যে জৌলুশ হারাতে বসেছে বলে দাবি করছে সংগঠনটি। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সজল ব্যানার্জী বলেন, ‘প্রতিবছরের মতো এবারও আমরা ব্যাপক আয়োজন করেছি। আমাদের থিম ‘প্রকৃতি’। আমরা চাই মানুষ বুঝুক প্রকৃতি ধ্বংস হলে মানবজাতির অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়বে। শোভাযাত্রার প্রতিটি উপস্থাপনায় এই বার্তাই তুলে ধরা হবে।’

বৈশাখের প্রথম প্রভাতে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে জেলা শহরের ৪০টিরও বেশি সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়ে চলছে গান ও নৃত্য চর্চা। সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত যশোরে বৃহৎ পরিসরে হয় বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। কয়েক বছর রমজানে বর্ষবরণ থাকাতে জাঁকজমকপূর্ণ হয়নি অনুষ্ঠান। তবে এবার ঈদের পরে বর্ষবরণ হওয়ায় যেন; প্রাণের ছোঁয়া লেগেছে সংস্কৃতির শহরে। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় জেলার সাংস্কৃতিক সংগঠন এবার বর্ষবরণে নিয়েছে নানা আয়োজন। এখন চলছে শেষ সময়ের প্রস্তুতি। বিশেষ করে উদীচী, বিবর্তন, পুনশ্চ, তির্যক, সুরবিতান, সুরধুনীসহ সংগঠনগুলো নাচ, গান, নাটক ও গীতিনাট্যের মহড়া।

উদীচী যশোরের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খাঁন বিপ্লব বলেন, ‘বরাবরের মতো পৌর উদ্যানে উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এবার সকালে ও বিকালে দুই দফায় আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকবে। আমরা চাই সবাই অংশগ্রহণ করুক এবং এই উৎসবকে সবার উৎসবে পরিণত করুক।’

তির্যকের সভাপতি দীপংকর দাস রতন বলেন, ‘আমাদের স্লোগান ‘যা বলার তা বলবোই’ এটি আমাদের চেতনার প্রতিফলন। আমরা চাই সংস্কৃতির মাধ্যমে সমাজের কথা বলতে, মানুষের ভাবনা জাগাতে। বৈশাখ আমাদের জন্য শুধু উৎসব নয়, এটি একটি বার্তা দেওয়ার সুযোগ।’

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু বলেন, ‘যশোরের ৪০টির বেশি সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রায় এক হাজার সাংস্কৃতিক কর্মী উৎসবকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বর্ষবরণ ঘিরে যেন প্রাণের ছোঁয়া লেগেছে এই শহরে। এবার টাউন হল ময়দান থেকে সাড়ে ৮টায় সকল শ্রেণী পেশার মানুষের অংশগ্রহনে বের হবে বর্ষবরণের শোভাযাত্রা। দিনব্যাপী শহরজুড়ে থাকছে দেশীয় সংস্কৃতির নানা আয়োজন।’

যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবারও বর্ণিল আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপিত হবে। এবারের শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা কোনো মুখোশ পরতে পারবেন না। তবে প্রতিকৃতি বা প্ল্যাকার্ড হিসেবে মুখোশ ব্যবহার করা যাবে। সকল অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে সন্ধ্যার আগেই। জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে প্রতিটি আয়োজক সাংস্কৃতিক সংগঠনকে পাঁচ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে। অনুষ্ঠানস্থলে থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারি।’

বিজ্ঞাপন

বায়ুর মান এখনো 'অস্বাস্থ্যকর'
১০ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৪৪

আরো

সম্পর্কিত খবর