Sunday 12 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রাজধানীর বুকে এক টুকরো পাহাড়: ‘বিঝু’

ফারহানা নীলা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১২ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৯ | আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২০

মেলায় ব্যস্ত সময় পার করছেন বিক্রেতারা। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: চৈত্রের খরতাপ পেরিয়ে বৈশাখের আগমনী বার্তা! চারদিকে উৎসবের আমেজ। আর এই উৎসবের আমেজে রাজধানীবাসীকে পাহাড়ের স্বাদ দিতে মিরপুরে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী এক অনন্য মেলা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি আদিবাসীদের প্রধান সামাজিক ও ঐতিহ্যবাহী উৎসব ‘বিঝু, বৈসু, সাংগ্রাই, বিহু, চাংক্রান ও বিষু’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এই মেলা যেন এক টুকরো পাহাড়ের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

মিরপুর-১৩ নম্বরের শাক্যমুনি বৌদ্ধ বিহার প্রাঙ্গণে পা রাখতেই কানে আসবে পাহাড়ের সুমধুর সুর। চারদিকে ভেসে আসবে ঐতিহ্যবাহী গান ও নাচের আওয়াজ। মেলার প্রবেশপথ থেকেই শুরু হয় উৎসবের আমেজ। রঙিন পোশাকে সজ্জিত পাহাড়ী নারীরা দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায়। তাদের হাতে থাকে জুম চাষের তাজা সবজি ও ফলের ডালি।

বিজ্ঞাপন

মেলায় ঢুকতেই চোখে পড়বে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় রূপ। মারমা নারীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘থামি’ পরে মেলা প্রাঙ্গণকে রঙিন করে তোলে। চাকমা নারীরা ‘পিনন’ ও ‘হাদি’র বাহারি রঙে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দেয়। আর ত্রিপুরা নারীরা তাদের ‘রিনা’ ও ‘রাসা’র সাজে মেলা প্রাঙ্গণকে বর্ণিল করে তোলে।

পোশাকের স্টলের একজন উদ্যোক্তা জানালেন, ‘আমাদের স্টলে আছে চাকমাদের ট্র্যাডিশনাল ড্রেস পিনন-হাদি, তারপর গারোদের হচ্ছে দকমান্দা আর মনিপুরীদের মনিপুরী থামি আর মারমাদের মারমা থামি। আর আমাদের কিছু স্টকে আছে চিনা ড্রেস। মেলায় বেচা বিক্রি ভালোই হচ্ছে খারাপ না। আমাদের আদিবাসী জনগোষ্ঠীরা তো নিচ্ছেই পাশাপাশি রাজধানীবাসিরাও এগুলি সংগ্রহ করছে।’

ছবি: সারাবাংলা

মেলায় ৩০ থেকে ৩৫টি স্টলে সাজানো হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের নানা সামগ্রী। পাহাড়ের টাটকা কৃষিপণ্য, যেমন- জুম চাষের চাল, পাহাড়ি কলা, পেঁপে, তরমুজ, আদা, হলুদ, লঙ্কা, বাঁশকোড়ল, কলার থোড় ইত্যাদি পাওয়া যাচ্ছে খুব সস্তায়। এছাড়াও রয়েছে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের নানা সামগ্রী। বাঁশ ও বেতের তৈরি ডালা, চালনি, আসবাবপত্র, ঘর সাজানোর জিনিস ইত্যাদি দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে।

মেলার ভিড়ের মাঝখানে গহনার স্টলে দেখা যায় পাহাড়ি আদিবাসীদের বিভিন্ন তৈরি গহনা। বিশেষ করে পয়সা দিয়ে তৈরি কানের দুল। হাতে বানানো নেকলেসে সাজানো এক টুকরো পাহাড়ি সৌন্দর্য। সেখানে কথা হয় এক বিক্রেতার সঙ্গে। হাসিমুখে তিনি বলেন, ‘এই গহনাগুলো আমরা নিজেরাই বানাই। প্রতিটা ডিজাইনের পেছনে আমাদের সংস্কৃতির গল্প আছে। শহরের মানুষ এগুলো খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছে, কিনছেও। এতে আমাদের কাজের মূল্যায়ন হচ্ছে।এটাই সবচেয়ে বড় আনন্দ।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘অনেকে শুধু কেনার জন্য না, জানার জন্যও আসে, কীভাবে বানাই, কোথা থেকে শিখেছি,এসব জানতে চায়। এতে মনে হয় আমরা আমাদের সংস্কৃতিটা তুলে ধরতে পারছি।’

অন্যদিকে, এক ক্রেতার চোখে এই মেলার অভিজ্ঞতা যেন একটু ভিন্নরকম। স্টল ঘুরে একটি ব্যাগ হাতে নিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় এমন জিনিস খুব একটা পাওয়া যায় না। সবকিছুই একদম আলাদা,হাতে বানানো, ইউনিক। মনে হচ্ছে যেন একটু পাহাড়কে সঙ্গে করে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।’

পাহাড়ি খাবারের কথা না বললে যেন মেলার বর্ণনা অধরাই থেকে যায়। মেলায় বিভিন্ন স্টলে মিলছে নানা পদের পাহাড়ি খাবার।

পাহাড়ি আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘মুন্ডি’। ছবি: সারাবাংলা

তেমনই এক পাহাড়ি খাবারের স্টলের বিক্রেতা জানান, এখানে আছে পাহাড়ী মাছের শুটকি, পাহাড়ী মুর্গির কাবাব, পাহাড়ী শুয়োরের মাংস, বাঁশকোড়ল ও কলার থোড় দিয়ে রান্না করা নানা পদ। এছাড়াও রয়েছে নানা ধরণের পাহাড়ী পিঠা, যেমন- পিনুন্ পিঠা, হাদি পিঠা, থামি পিঠা ইত্যাদি।

সরজমিনে দেখা গেল খাবারের স্বাদ নিতে ভীড় করছে খাদ্যরসিকরা।

এদিকে, মেলা পরিদর্শনে এসেছিলেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘পাহাড়ের মানুষ তাদের কষ্টার্জিত তাজা পণ্য এবং নিপুণ হাতে তৈরি শিল্প নিয়ে আমাদের মাঝে এসেছেন, এটি অত্যন্ত আনন্দের। রাজধানীর বুকে এ ধরনের আয়োজন আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে আরও সুদৃঢ় করবে। আমি আশা করি, প্রতিবছরই এমন মেলার আয়োজন হবে যেখানে সমতলের মানুষের সাথে পাহাড়ের মানুষের হৃদয়ের বন্ধন আরও গাঢ় হবে।’

মেলা পরিদর্শনে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান। ছবি: সারাবাংলা

মেলায় বিশেষভাবে নজর কাড়ছে হাতের তৈরি পাখা আর ছোট ছোট পুতুল। প্রতিটি জিনিসে আছে নিপুণ হাতের কাজ আর গ্রামীণ সরলতার ছাপ। গরমের এই সময়ে হাতে তৈরি পাখাগুলো যেমন ব্যবহারিক, তেমনি নান্দনিকও।

শিশুদের জন্যও রয়েছে আলাদা আকর্ষণ ছোটদের ফতুয়া-ধুতি সেট। রঙিন, আরামদায়ক আর ঐতিহ্যের ছোঁয়া মাখা এসব পোশাক অনেক অভিভাবকই কিনে নিচ্ছেন আগ্রহ নিয়ে।

মেলায় যুক্ত হয়েছে আরেকটি ভিন্ন স্বাদ লটারি আয়োজন। মাত্র ৫০ টাকার টিকিট কিনেই দর্শনার্থীরা অংশ নিতে পারছেন এই লটারিতে। যেখানে প্রথম পুরস্কার হিসেবে রাখা হয়েছে একটি মোটরসাইকেল। ফলে কেনাকাটার পাশাপাশি অনেকেই ভাগ্য পরীক্ষা করতেও ভিড় করছেন লটারি স্টলে।

ছবি: সারাবাংলা

সব মিলিয়ে, এই মেলা শুধু কেনাবেচা বা প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই এটি হয়ে উঠেছে অভিজ্ঞতার এক পূর্ণাঙ্গ জায়গা, যেখানে রঙ, স্বাদ, সংস্কৃতি আর আনন্দ একসাথে মিশে গেছে।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় মেলা প্রাঙ্গণে বসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আসর। পাহাড়ী শিল্পীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী গান ও নাচের মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, খিয়াং, লুসাই, পাংখোয়া, বম ও চাক ইত্যাদি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী গান-নাচ দর্শকদের মনে পাহাড়ের প্রতি ভালোবাসার সঞ্চার করে।

এই মেলা যেন রাজধানীবাসীকে পাহাড়ের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ।

মেলা প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

সারাবাংলা/এফএন/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর