Monday 13 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ব্যাংক খাতে এস আলম ফেরার ইস্যুতে লুকোচুরি

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৪৭ | আপডেট: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:০১

– ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা: অন্তর্বর্তী সরকারের করা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ সংশোধন বিল পাস করায় একীভূত ব্যাংকের আগের মালিক এস আলম গ্রুপসহ অন্যদের কাছে পুনরায় ফিরে পাওয়া নিয়ে লুকোচুরি চলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টি স্বীকার কিংবা অস্বীকার না করে কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছে। তবে পূর্বের মালিকের কাছে ফেরার সুযোগ তৈরির বিষয়ে একমত বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে একীভূত ব্যাংক পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার এ পর্যন্ত যে অর্থ দিয়েছে, তার সাড়ে ৭ শতাংশ পরিশোধ করে আগের মালিকরা এর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন বলে জানার কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সূত্র জানায়, ব্যাংকের ওপর খড়গহস্ত আসার শঙ্কা সৃষ্টি করেছে নতুন ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইনটি। এখন এস আলম, নাসার মত সবার ব্যাংক ফিরে পাওয়ার পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে। সরকার যেহেতু আইন করছে, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক নীরবতা পালন করবে ঠিক বিগত সরকারের আমলে যা ঘটেছে। এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এককভাবে কিছু করতে পারবে না। সেজন্য এস আলমের মত বড় গ্রুপের ইস্যুতে নীরবতার সঙ্গে সাপোর্ট করতে বাধ্য হবে।

বিজ্ঞাপন

সূত্র জানায়, রোববার (১২ এপ্রিল) এস আলমের বিশেষ ইশারায় ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওমর ফারুক খাঁন-কে বাধ্যতকমূলক ছুটি প্রদান করা হয়েছে। তার ছুটি গতকাল (সোমবার) থেকে কার্যকর করতে আজ বিকালে অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে তাকে তিন মাসের জন্য জোরপূর্বক ছুটি দেয়া হয়। তাকে আওয়ামী লীগের আমৱে ডিমডি পদ থেকে চাকরিচ্যূত করা হয়। পে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার বদলের পন চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, পূর্বের ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশটিকে এখন প্রথাগত আইনে পরিণত করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় আইনের কাঠামোকে আরও সুসংগঠিত করা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতিগত বিষয়কে আলাদা করে বিধিমালার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগে রেজল্যুশনের সুযোগ কেবল লিকুইডেশন (বিলুপ্তি), ব্রিজ ব্যাংক গঠন বা তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আর বিশ্বজুড়ে প্রচলিত পদ্ধতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই আইনে “বেইল-ইন” অপশন রাখা হয়েছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন এবং মূলধন সংস্থানের মাধ্যমে একটি ব্যাংককে স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে। ​ব্যাংকের পুনর্গঠনে অংশগ্রহণের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। ​পূর্বের পরিচালক বা বিনিয়োগকারীর বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা আপত্তি নেই। তারা চাইলে মূলধন সংস্থানের মাধ্যমে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন। তবো কোন গ্রুপ নতুন করে আসবে কিংবা তাদোর পূর্বের ব্যাংক ফিরে পাবে তা আইনে নিশ্চিত করা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কোন গ্রুপের বিষয়ে বলতে চায় না। এটা ব্যাংকের রেগুলেটরি হিসাবে করা যায় না।

উল্লেখ্য যে, সরকার আগে এই খাতে ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং আমানত বিমা থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিল। নতুন এই আইনি কাঠামোর লক্ষ্য হলো বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার মাধ্যমে জনগণের অর্থের ওপর চাপ কমানো।

স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি: সরকার ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই আইনি পরিবর্তনটি আইএমএফ-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সাথেও সংগতিপূর্ণ।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের অভ্যন্তরীণ বৈঠকে এমন ধারা সংযোজনের বিপক্ষে মত দিয়েছিল। বিরোধী দলও সংসদে এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তবে ১৮(ক) ধারা সংযুক্ত করেই গত শুক্রবার সংসদে বিলটি পাস হয়। বিলের ১৮(ক) ধারায় বলা হয়েছে, আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইন কিংবা এ আইনের অন্যান্য বিধানে যা কিছু থাকুক না কেন, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর আওতায় তালিকাভুক্ত হওয়ার আগের শেয়ার ধারক অথবা শেয়ার ধারকরা অথবা বাংলাদেশ ব্যাংক উপযুক্ত বিবেচিত ব্যক্তি ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ-দায় পুনঃধারণ বা ধারণ করার জন্য রেজল্যুশন কর্তৃপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর আবেদন করতে পারবে। তবে শেয়ার পুনঃধারণের আবেদন করার ক্ষেত্রে একটি পৃথক অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।

নতুন আইনের উপধারা (৪) অনুযায়ী, সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া বাকি সাড়ে ৯২ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ হারে সরল সুদসহ ফেরত দেবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, এর মাধ্যমে কেবল সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূত ব্যাংককে যে পরিমাণ অর্থ দিয়েছে তার সাড়ে ৭ শতাংশ অর্থের পে অর্ডার দিয়ে ব্যাংকের মালিকানায় ফেরা যাবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এভাবে একবার কেউ মালিকানা পেলে তাঁকে বাদ দেওয়া সহজ হবে না।

অধ্যাদেশটি কোনো সংশোধনী ছাড়া পাস করতে বিরোধী দল অনাপত্তি দিয়েছিল। কিন্তু যাচাই-বাছাই করে সংশোধিত খসড়া প্রণয়নের জন্য গত ১ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আজিম উদ্দিন বিশ্বাসকে আহ্বায়ক করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্য হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে চারজন, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের দুজন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তিনজন ছিলেন। সাচিবিক দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশ ব্যাংককে।

জানা গেছে, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশে ৯৮টি ধারা ছিল। ধারার সংখ্যা কমিয়ে ৭৪টি করার সুপারিশ করে কমিটি। আইনের পরিধি কমানোর জন্য তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ ২৪টি ধারা প্রবিধানে যুক্ত করা হয়। এ ছাড়া অধ্যাদেশে সামান্য যেসব অসংগতি ছিল, তা সংশোধন করে সরকারকে খসড়া কপি দেওয়া হয়। অধ্যাদেশ কিংবা গঠিত কমিটির সুপারিশে ১৮(ক) ধারাটি ছিল না বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিলটি সংসদে যাওয়ার আগে এই ধারা যুক্ত করা হয়।

একীভূত পাঁচ ব্যাংকের অবস্থা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫-এর আলোকে গত বছর শরিয়াহভিত্তিক এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক একীভূতকরণ করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। আন্তর্জাতিক ফার্ম দিয়ে অডিটসহ বিভিন্ন পর্যায় শেষে এ সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আমানতকারীদের শেয়ার দেওয়া হবে। এর বাইরে আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ধার হিসেবে দিয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংকের চাঁদায় গড়ে ওঠা আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে আমানতকারীদের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে পুরো অর্থ যেন তুলতে পারেন, সে জন্য আলাদা একটি স্কিম ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত একীভূত পাঁচ ব্যাংকের ঋণ রয়েছে এক লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে এক লাখ ৬৫ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। আর দেশের পুরো ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

সারাবাংলা/এসএ/এসআর