সয়াবিনের সংকট থাকলেও ছোলা-চিনিতে স্বস্তি, দামও কমেছে
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১০:০৪
ঢাকা: রোজার প্রধান কয়েকটি পণ্যের মধ্য সয়াবিন তেল ছাড়া বাজারে বাকি পণ্যগুলোর সরবরাহ এবার বেশি রয়েছে। চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত আমদানির প্রভাবে এরইমধ্যে দাম কমেছে ছোলা ও চিনির। মাস ব্যবধানে ছোলা ও চিনির দাম কমেছে কেজিতে ১০ থেকে ২৫ টাকা। আলু ও পেঁয়াজের বাজারও অনেকটাই আগের মতো স্থির। দেশের একাধিক বাজার ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীর বেশিরভাগ বাজারে ছোলা ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজি, চিনি ১২০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি, মুড়ি ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতাদের ভাষ্যমতে, ছোলার দাম কেজিতে সর্বনিম্ন ১০ থেকে ২০ টাকা কমেছে। আর চিনির দামও কেজিতে কমেছে ১০ থেকে ২০ টাকা। তবে মুড়ির দাম অপরিবর্তত রয়েছে। আর এ বছর সর্বনিম্ন ১৮০ থেকে ২২০ টাকা কেজিতে খেজুর বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে ভালো মানের খেজুর বিক্রি হচ্ছে ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকা কেজিতে। মাঝারি মানের খেজুর পাওয়া যাচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা কেজিতে। খেজুর আমদানি বেশি হওয়ায় গতবারের চেয়ে এবার দাম কিছুটা কম বলে জানান বিক্রেতারা।

আসন্ন রোজার কারণে দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভীড়। ছবি: সারাবাংলা
এদিকে, সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)’র তথ্যমতে, খুচরা বাজারে বর্তমানে (মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি) প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে ১০৫ থেকে ১২০ টাকা কেজিতে, যা এক আগে কিনতে হয়েছে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায়। প্রতি কেজি চিনির দাম এখন ১২০ থেকে ১২৫ টাকা। এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ১২০ থেকে ১২২ টাকায়। বর্তমানে সাধারণ মানের খেজুর ২২০ থেকে ৫৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এক মাস দাম ছিলো ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা। এখন পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজিতে। এক মাস আগে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। আর আলু বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা কেজিতে। মাস খানেক আগেও একই দাম ছিলো।
রাজধানীর কারওয়ানবাজার কিচেন মার্কেটে কথা হলে মায়ের দোয়া স্টোরের কর্মচারী বাবুল সারাবাংলাকে বলেন, ‘এ বছর ছোলা, চিনি ও মুড়ির সরবরাহ ভালো, দামও স্থিতিশীল রয়েছে। দাম হাতের নাগালে রয়েছে, দাম কমেছে। এক মাস আগে যে ছোলা ১৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে, এখন সেই ছোলা ১০০ থেকে ১০৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। চিনির দাম ছিলো ১৪৫ টাকা, এখন সেই চিনি বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা কেজিতে। লাল চিনি ছিলো ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, এখন ১৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মুড়ির কেজি ৭০ টাকা, ভালো মানের মুড়ি ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এবার শুধুমাত্র তেলের সরবরাহ কম। পাম তেলের সরবরাহ ঠিক থাকলেও সয়াবিন তেলের সরবরাহ ঠিক নেই। সয়াবিন তেল ১৭৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে, তবে সরবরাহ নেই।’
রোজার আগে কয়েকটি পণ্যের দাম কমার কারণ জানতে চাইলে এই বিক্রেতা বলেন, ‘দাম কমার কারণ এবার এলসি বেশি হয়েছে। পর্যাপ্ত পণ্য এসেছে। এজন্য এসব পণ্যের দাম কম।’
কারওয়ান বাজারের জব্বার স্টোরের মালিক জব্বার সারাবাংলাকে বলেন, ‘ছোলার দাম আগে ১৩০ টাকা ছিলো, এখন ছোলা ১০৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। চিনি ১১৮ থেকে ১২৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। খোলা চিনি ১১৮ টাকা ও প্যাকেট চিনি ২২৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মুড়ি আগের দামেই রয়েছে। ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। তেলের সমস্যা রয়েছে। তেল পাওয়া যায়না।’
পেঁয়াজ ও আলুর বাজার স্থিতিশীল: রোজার আগে এখন পর্যন্ত পেঁয়াজ ও আলুর বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। মাত্র কয়েক মাস আগে মৌসুম শেষ হওয়ায় বাজারে এখনও নতুনত্বের প্রভাব রয়েছে। ফলে ‘নতুনের’ দামেই বিক্রি হচ্ছে এ দুটি পণ্য।
কারওয়ান বাজারের পাইকারি বাজারে মের্সাস মাতৃভান্ডারের এক কর্মচারী জানান, ‘এখন পাইকারিতে পেঁয়াজ ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। পেঁয়াজের দাম ৩৩ টাকায় নেমেছিল। গত কয়েকদিনে দাম কিছুটা বেড়েছে।
কারওয়ান বাজারের পেঁয়াজের পাইকারি দোকানদার আফতাব সারাবাংলাকে বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতে পেঁয়াজের দাম কম থাকে। মুড়িকাটা পেঁয়াজ উঠা শুরু করে প্রায় দুই মাসে আগে। মানে নতুন পেঁয়াজ উঠেছে প্রায় দুই মাস। কিছুদিন পর হালি পেঁয়াজ উঠবে। যেহেতু প্রায় দুই মাস আগে নতুন পেঁয়াজ উঠেছে, তখন সবাই একসঙ্গে পেঁয়াজ বিক্রি করেছে, তাই এখন পেঁয়াজের দাম একটু বেশি। পেঁয়াজের সরবরাহ নিয়ে কোন সমস্যা নেই।’

পর্যাপ্ত পেঁয়াজের সরবরাহ রয়েছে বাজারে। ছবি: সারাবাংলা
এদিকে বাজারে আলুর দামও কিছুটা বেড়েছে। এখন সাদা আলু ২০ টাকা কেজি ও লাল আলু ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে। কারওয়ানবাজারে পাইকারি বাজারে ১০০ টাকা পাল্লায় (৫ কেজি) সাদা আলু বিক্রি হতে দেখা গেছে। আর লাল আলুও প্রায় একই দামে বিক্রি হচ্ছে। আলু বিক্রেতা বাবুল হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘কিছুদিন আগে পাইকারিতে সাদা আলু ১৮ থেকে ১৯ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। এখন আবার ১৮ টাকা কেজিতেই বিক্রি হচ্ছে। বস্তায় কেজিতে আরও এক টাক কম থাকে। প্রতিটি বস্তায় ৬০ থেকে ৮০ কেজি আলু থাকে।’
প্রসঙ্গত, দেশে রোজায় ছোলার চাহিদা প্রায় এক লাখ টন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর তথ্যমতে, এরইমধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার টনের বেশি ছোলা আমদানি হয়েছে। ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি এই সময়ে গত বছ আমদানি হয়েছিলো ৮৯ লাখ টন। সে হিসাবে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার টনের বেশি ছোলা আমদানি হয়েছে। আর প্রতিদিনই ছোলা আমদানি হচ্ছে। এখনও আমদানির পথে রয়েছে অনেক ছোলা। হিলি স্থলবন্দর দিয়ে প্রচুর ছোলা আসছে।
সেখানকার ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, কেজি ছোলা আমদানিতে খরচ পড়ছে ৯০ থেকে ৯১ টাকা। বন্দরে প্রতি কেজি ছোলা পাইকারি দরে (ট্রাক সেল) বিক্রি হচ্ছে ৯১ থেকে ৯২ টাকায়। তবে দেশের খুচরা বাজারে ছোলা বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১১০ টাকায়। এছাড়া এবার চিনির আমদানিও বেশি রয়েছে, ফলে সরবরাহ ভালো রয়েছে। এর প্রভাবে বাজারে চিনির দামও কমেছে।
তথ্যমতে, বছরে অপরিশোধিত চিনির চাহিদা ২০ থেকে ২২ লাখ টন। রমজান মাসে চিনির চাহিদা প্রায় ৩ লাখ টনের মতো। রাষ্ট্রীয় চিনিকলে বছরে চিনির উৎপাদন মাত্র ২৫ থেকে ৫০ হাজার টনের মতো। অর্থাৎ চিনির পুরোটাই প্রায় আমদানি নির্ভর। তথ্যমতে, চলতি (২০২৪-২০২৫) অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ লাখ ৯ হাজার অপরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছে। পাশাপাশি একই সময়ে দেড় লাখ টনের কাছাকাছি পরিশোধিত চিনি আমদানি হয়েছে। চিনির আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
এদিকে, দেশের প্রায় সব বাজারেই কয়েক মাস ধরে সয়াবিন তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। বাজারগুলোতে কাঙ্খিত ব্রান্ডের সয়াবিন তেলের সরবরাহ একেবারেই কম। ‘পরিচিত নয়’ এমন কিছু ব্রান্ডের বোতালজাত সয়াবিন তেলের দেখা মেলে ছোটখাটো দোকানগুলোতে। বেশিরভাগ খুচরা দোকানে সরকার নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না সয়াবিন তেল। তবে সয়াবিন তেল নিয়ে অস্বস্তি থাকলেও রোজার অন্য পণ্যগুলোর ‘সরবরাহ ভালো ও দাম কম থাকায় বাজারে স্বস্তি রয়েছে।
সারাবাংলা/ইএইচটি/এমপি