বিএফডিসির উচ্চপদে ‘মতবিরোধ’
বদলির পর নতুন কর্মকর্তা আসার আগেই সরানো হলো ব্যবস্থাপককে
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১০:০০ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৩:৩৬
রাঙ্গামাটি: বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) নিয়ন্ত্রণাধীন কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক পদে গত সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বদলি ও নতুন ব্যবস্থাপক পদায়ন করেছে সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর পরদিনই অর্থাৎ মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) নতুন পদায়নকৃত ব্যবস্থাপক যোগদান করে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই বর্তমান ব্যবস্থাপককে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নিয়েছে বিএফডিসি।
এতে করে আলোচনা হচ্ছে- হঠাৎ করে কী এমন হলো, বদলির পর নতুন কর্মকর্তার যোগদানের আগেই ব্যবস্থাপককে সরিয়ে নিচ্ছে কেন্দ্র। এ নিয়ে বিএফডিসি রাঙ্গামাটি বিপণনকেন্দ্রের কর্মকর্তা ও মাছ ব্যবসায়ীদের মধ্যেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে, ২৪ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (প্রেষণ-১ শাখা) আবুল হায়াত মো. রফিকের সই করা এক প্রজ্ঞাপনে কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক কমান্ডার মো. আশরাফুল আলম ভুঁইয়াকে বদলি করে বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। একই প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কমান্ডার মো. ফয়েজ আল করিমকে কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলেও জানিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
অন্যদিকে কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক কমান্ডার মো. আশরাফুল আলম ভুঁইয়াকে বদলি করে প্রজ্ঞাপন জারির পরদিন অর্থাৎ মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) আরেক অফিস আদেশে নতুন ব্যবস্থাপক যোগদানের আগেই তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ব্যবস্থাপকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিপণনকেন্দ্রটির বর্তমান উপব্যবস্থাপক মো. বদরুদ্দৌজাকে।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) সুরাইয়া আখতার জাহানের সই করা অফিস আদেশে জানানো হয়, ‘জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২৪ তারিখের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক কমান্ডার মো. আশরাফুল আলম ভুঁইয়াকে আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) অপরাহ্নে নিজ দায়িত্ব হতে এতদ্বারা অবমুক্ত করা হলো। পরবর্তী কর্মকর্তা যোগদানের পূর্ব পর্যন্ত কেন্দ্রের উপব্যবস্থাপক বদরুদ্দৌজা নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপকের রুটিন দায়িত্ব পালন করবেন।’
সূত্রে আরও জানায়, চলতি মাসের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিএফডিসির রাঙ্গামাটি বিপণনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক একটি অফিস আদেশ জারি করে কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণনকেন্দ্রের মৎস্য অবতরণ ও শুল্ক আদায়ের সময়সূচি নির্ধারণ করেন। এ ঘটনার তিনদিন পর বিএফডিসির চেয়ারম্যান আরেক অফিস আদেশে জারিকৃত অফিস আদেশটি বাতিল করেন।
বিএফডিসি চেয়ারম্যানের সই করা ওই অফিস আদেশে বলা হয়, ‘করপোরেশনের রাঙ্গামাটি কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক কর্তৃক গত ১৩ ফেব্রুয়ারি জারিকৃত কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণনকেন্দ্রের মৎস্য অবতরণ ও শুল্ক আদায়ের সময়সূচি নির্ধারণ সংক্রান্ত অফিস আদেশটি বাতিল করা হলো। রাঙ্গামাটিস্থ কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণনকেন্দ্রের মৎস্য অবতরণের সময়সূচি ও যাবতীয় নীতিনির্ধারণ বিষয়ক যে কোনো আদেশ জারি করার ক্ষেত্রে প্রধান কার্যালয়ের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন হবে।’
বিএফডিসির কর্মকর্তারা বলছেন, সম্প্রতিক সময়ে বিএফডিসির প্রধান কার্যালয়ের সঙ্গে পরামর্শ না করে ব্যবস্থাপকের একক সিদ্ধান্তে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কেন্দ্র করে রাঙ্গামাটি বিপণণকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক ও প্রধানকেন্দ্রের সঙ্গে ‘মতানৈক্য’ দেখা দেয়। এ ঘটনার সপ্তাহ খানেকের মধ্যে বদলি হলেন ব্যবস্থাপক আশরাফুল। আবার নতুন কর্মকর্তা যোগদানের আগেই ‘অসম্মানমূলক’ভাবে বর্তমান ব্যবস্থাপককে দায়িত্ব হস্তান্তরের আগেই সরিয়ে নেওুয়া হচ্ছে।
বিএফডিসি নিয়ন্ত্রনাধীন কাপ্তাই হ্রদ মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক কমান্ডার মো. আশরাফুল আলম ভুঁইয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘বদলির হওয়ার খবর সঠিক শুনেছেন। গতকালকে (মঙ্গলবার) বদলির অর্ডার আসছে।’ তবে নতুন কর্মকর্তা বা ব্যবস্থাপক যোগদানের আগেই বর্তমান ব্যবস্থাপককে অবমুক্ত কেন করা হলো? এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটার কারণ তো আমি বলতে পারব না। যিনি অর্ডার দিয়েছেন এ বিষয়ে উনাকে জিজ্ঞেস করলে ভালো হয়। তিনি জানতে পারেন, কারণ আমি তো জানি না।’
যদিও পুরো ঘটনাকে ‘স্বাভাবিক’ প্রক্রিয়া বলছেন বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) চেয়ারম্যান সুরাইয়া আখতার জাহান। বিএফডিসি চেয়ারম্যান সারাবাংলাকে বলেন, ‘বদলি হচ্ছে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, এটার আবার কারণ কী। বদলি হলে রিলিজ হবে, এটাও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। আমি তো বুঝলাম না কেন এটা নিয়ে কথা উঠছে। এটা নিয়ে আসলে প্রশ্ন করার কিছু নেই।’
উল্লেখ্য যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম জলাধার কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য চাষ ও আহরিত মাছ থেকে শুল্কহার আদায় করে থাকে বিএফডিসি। রাঙ্গামাটি জেলার রাজস্থলী ও কাউখালী ছাড়া আট উপজেলা এবং খাগড়াছড়ির মহালছড়ি ও দীঘিনালা উপজেলার জেলেরা কাপ্তাই হ্রদে মাছ শিকার জীবিকা নির্ভর করে।
দুই জেলার ১০ উপজেলা মিলে মৎস্য বিভাগের নিবন্ধিত জেলে তালিকা অনুযায়ী সাড়ে ২৬ হাজারেরও অধিক জেলে পরিবার রয়েছে। কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণের মৌসুমে প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ৩টা ও সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বিএফডিসির বিপণনকেন্দ্রগুলোতে মাছ অবতরণ করা হয়। এর পর অবতরিত মাছের রাজস্ব আহরণ শেষে বিপণন করে থাকেন ব্যবসায়ীরা।
সারাবাংলা/পিটিএম