স্মৃতির শহরে নোমান ফিরলেন কফিনবন্দি হয়ে
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৮:৫৫ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ২১:০০
জাতীয় পতাকায় মোড়ানো বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল্লাহ আল নোমানের মরদেহ ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছেছে। ছবি: সারাবাংলা
চট্টগ্রাম ব্যুরো: যে শহরের আলো-হাওয়া আর রাজপথে আবদুল্লাহ আল নোমান নিয়েছিলেন রাজনীতির প্রথম পাঠ, যে শহর তাকে ‘জনমানুষের রাজনীতিবিদ’ বানিয়েছে, সেই শহরে তিনি ফিরেছেন। তবে গত ছয় দশকের মতো মানুষের উদ্দেশে হাত নাড়তে নাড়তে নয়, নোমান ফিরেছেন কফিনবন্দি হয়ে। স্মৃতির শহর থেকে শেষ বিদায় নিয়ে ঠাঁই নেবেন সাড়ে তিন হাত মাটির ঘরে।
বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টায় জাতীয় পতাকায় মোড়ানো বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল্লাহ আল নোমানের মরদেহ ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছে। নগরীর আউটার স্টেডিয়ামে হেলিকপ্টার অবতরণ করে। ছেলে সাঈদ আল নোমানসহ পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন।
মরদেহ আউটার স্টেডিয়াম থেকে নিয়ে যাওয়া হয় নগরীর কাজির দেউড়িতে ভিআইপি টাওয়ারের বাসায়। আউটার স্টেডিয়াম থেকে ভিআইপি টাওয়ার পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক বিএনপি নেতাকর্মীর সমাগম ঘটে। এ ছাড়া, নগরীর নুর আহমদ সড়কে বিএনপির দলীয় কার্যালয় প্রাঙ্গনে আবদুল্লাহ আল নোমানের অন্তিম যাত্রার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
আবদুল্লাহ আল নোমানের একান্ত সহকারী নুরুল আজিম হিরু সারাবাংলাকে জানিয়েছেন, শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি এন্ড অ্যানিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নোমানের মরদেহ রাখা হবে। এরপর নেওয়া হবে নোমানের প্রতিষ্ঠিত ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি প্রাঙ্গণে। সেখানে ১০টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ রাখা হবে।
সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির দলীয় কার্যালয় নসিমন ভবন প্রাঙ্গনে নেতাকর্মীদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নোমানের মরদেহ রাখা হবে। এরপর মরদেহ নেয়া হবে জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ ময়দানে। সেখানে জুমার নামাজের পর বেলা আড়াইটায় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
এর পর আবদুল্লাহ আল নোমানের জন্মস্থান রাউজানে নেওয়া হবে। আসরের নামাজের পর রাউজানের গহিরা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে গহিরায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রয়ারি) ভোরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে নিজ বাসায় বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আবদুল্লাহ আল নোমানের জীবনাবসান ঘটে।

জাতীয় পতাকায় মোড়ানো বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল্লাহ আল নোমানের মরদেহ ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছেছে। ছবি: সারাবাংলা
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন আবদুল্লাহ আল নোমানের। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সরকারের গঠিত হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে ছাত্র আন্দোলন। সেই আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে যোগ দেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে। সেই শুরু সাম্যবাদী রাজনীতির পথচলার। ১৯৬৫ সালে বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলন দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আবদুল্লাহ আল নোমান ছাত্র ইউনিয়নের মেননপন্থী হিসেবে পরিচিত চীনপন্থী অংশে যোগ দেন। তিনি সংগঠনটির বৃহত্তর চট্টগ্রামের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।
ঊনষত্তুরের গণঅভ্যুত্থানে নোমান চট্টগ্রামের একজন সামনের কাতারের সংগঠক ছিলেন। ছাত্র রাজনীতি শেষ হলে তিনি যোগ দেন শ্রমিক রাজনীতিতে। এর আগেই অবশ্য তিনি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সংস্পর্শে আসেন। নোমানকে পূর্ববাংলা শ্রমিক ফেডারেশনের সহ-সভাপতি করা হয়। পাশাপাশি ভাসানীপন্থী ন্যাপের রাজনীতিতেও সক্রিয় হন। ১৯৭০ সালে তাকে ন্যাপের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আবদুল্লাহ আল নোমান বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সত্তরের দশকের শেষদিকে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জাগদলের সঙ্গে ‘ভাসানী ন্যাপ’ একীভূত হয়। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে ন্যাপ নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান যোগ দেন বিএনপিতে। আমৃত্যু তিনি এ দলের সঙ্গেই ছিলেন। সর্বশেষ তিনি দলটির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। আশি-নব্বইয়ের দশক, এর পরবর্তী আরও অন্তত এক দশক চট্টগ্রামে বিএনপির রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে আবদুল্লাহ আল নোমানকে ঘিরেই।
১৯৯১ ও ২০০১ সালে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন আবদুল্লাহ আল নোমান। দু’বারই তিনি বিএনপির মন্ত্রিসভার একজন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে তিনি ডবলমুরিং-হালিশহর আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
সারাবাংলা/আরডি/পিটিএম
কফিনবন্দি টপ নিউজ বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল্লাহ আল নোমান স্মৃতির শহর