রোহিঙ্গা সংকট আজ শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের মানবিক দায়বদ্ধতার একটি পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে সেনা নিপীড়নের মুখে যে ৭ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল, সেই সংখ্যা আজ প্রায় ১৩ লাখে পৌঁছেছে। কক্সবাজার বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী ক্যাম্পে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, সমাজ ও নিরাপত্তার ওপর এর বোঝা দিন দিন বাড়ছে। এক দশকের কাছাকাছি সময় ধরে ১৩ লাখ মানুষকে বহন করা একটি দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। কক্সবাজারের স্থানীয় মানুষদের জীবিকা, পরিবেশ, সমাজব্যবস্থা—সবকিছুই প্রভাবিত হয়েছে। এ সংকট আমাদের সীমান্তের ভেতরে হলেও, এর দায় আসলে গোটা বিশ্বের। কারণ রোহিঙ্গাদের ওপর যে নিপীড়ন হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। তাই এর সমাধানও হতে হবে বৈশ্বিক দায়িত্ববোধ থেকে।
এই অবস্থায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন ছাড়া অন্য কোনো সমাধান নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কক্সবাজারে ‘রোহিঙ্গা বিষয়ক অংশীজন সংলাপ’-এ সম্প্রতি যে সাত দফা প্রস্তাব দিয়েছেন, তা এই সংকট সমাধানের জন্য একটি বাস্তব রূপরেখা হতে পারে।
প্রথমেই মনে রাখতে হবে, এই সংকটের মূল শেকড় মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নীতিতে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার, মৌলিক অধিকার হরণ, এবং নিয়মিত সহিংস আক্রমণ তাদের নিজ দেশে জীবনযাপন অসম্ভব করে তুলেছে। ফলে শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে সংকট দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব হলেও সমাধান হবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখন কাজ হচ্ছে মিয়ানমার সরকারকে বাধ্য করা, যাতে রোহিঙ্গারা দ্রুত ও নিরাপদে ফিরে যেতে পারে।
এই লক্ষ্য অর্জনে একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন। প্রত্যাবাসনের প্রতিটি ধাপ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও পর্যবেক্ষণযোগ্য হতে হবে। মিয়ানমারের ভেতরে নিরাপদ অঞ্চল তৈরি, রোহিঙ্গাদের স্থানীয় প্রশাসনে অংশগ্রহণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো পুনর্গঠন—এসব পদক্ষেপ ছাড়া প্রত্যাবাসন কার্যকর হবে না। শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, জাতিসংঘ ও আসিয়ানকে সরাসরি সম্পৃক্ত হতে হবে।
তবে সবচেয়ে বড় শর্ত হলো রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। বর্তমানে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত রোহিঙ্গাদের আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী কিংবা আঞ্চলিক নিরাপত্তা মিশনের উপস্থিতি বিবেচনা করা যেতে পারে। না হলে রোহিঙ্গারা নিরাপত্তাহীনতার ভয়ে দেশে ফেরার ঝুঁকি নেবে না।
এর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া অপরিহার্য। মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ আখ্যা দিয়ে নাগরিকত্ব অস্বীকার করেছে। অথচ তারা শত শত বছর ধরে রাখাইনে বসবাস করছে। নাগরিকত্ব না থাকলে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, চলাফেরা কিংবা কাজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। নাগরিকত্ব ছাড়া প্রত্যাবাসন মানে হবে রোহিঙ্গাদের আবারও অনিশ্চিত ভবিষ্যতে ঠেলে দেওয়া। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়—বিশেষ করে আসিয়ান, চীন ও ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তিকে—মিয়ানমারকে নাগরিকত্ব আইন সংস্কারে বাধ্য করতে হবে।
বাংলাদেশের ওপর দীর্ঘদিন ধরে মানবিক দায়িত্বের ভার চাপছে। কিন্তু এই বোঝা একা বইতে পারে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার বাজেট কমে আসায় রোহিঙ্গাদের অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে। দাতাদের অর্থায়ন কেবল মানবিক সহায়তায় সীমিত না থেকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা উচিত—যাতে মিয়ানমারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়।
এখানে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা উপেক্ষা করা যাবে না। চীন ও ভারত রাখাইনে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে গভীরভাবে জড়িত। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প কিংবা ভারতের সংযোগ পরিকল্পনা এই অঞ্চলকে তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তারা যদি প্রত্যাবাসন নিয়ে সক্রিয় না হয়, তবে মিয়ানমার সহজেই আন্তর্জাতিক চাপ এড়িয়ে যেতে পারবে। তাই বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে ভারত ও চীনের সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে আসিয়ানকে নীরব দর্শক না থেকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ন্যায়বিচার ও দায়বদ্ধতা প্রশ্নটিও সামনে আনতে হবে। রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত না হলে একই শক্তি আবারও নতুন সহিংসতা চালাতে উৎসাহিত হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া রোহিঙ্গাদের আস্থা ফেরাতে সহায়ক হবে এবং প্রত্যাবাসনের পথকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে।
বাংলাদেশ গত আট বছর ধরে সীমাহীন মানবিকতা দেখিয়েছে। সীমান্ত খুলে দিয়ে জীবন বাঁচিয়েছে, কোটি কোটি ডলারের অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু এই মানবিক দায়িত্ব এখন বৈশ্বিকভাবে ভাগাভাগি করা জরুরি। রোহিঙ্গারা নিজেরা স্পষ্টভাবে বলেছে, তারা নিরাপদে দেশে ফিরতে চায়। তাদের এই ন্যায্য আকাঙ্ক্ষা পূরণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপই এখন একমাত্র ভরসা।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাত দফা প্রস্তাব তাই নিছক আহ্বান নয়, বরং সংকট সমাধানের জন্য এক বাস্তব রূপরেখা। এখন প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আন্তরিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা। যদি তা দেখা না যায়, তবে রোহিঙ্গা সংকট আরও দীর্ঘায়িত হবে, যা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও মানবাধিকার ব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। সময় এসেছে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার—যাতে রোহিঙ্গারা মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরতে পারে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী