গত কয়েক মাস ধরে ভেনেজুয়েলার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টান-টান উত্তেজনা থাকার পর অবশেষে দেশটিতে সামরিক অভিযান চালিয়ে নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা ও দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে ‘বৃহৎ পরিসরের হামলা’ চালিয়েছে। ট্রুথ সোশালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, অভিযানের পর মাদুরো ও তার স্ত্রীকে ‘গ্রেফতার করে দেশটির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে’। ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে প্রতিবেশি কলম্বিয়া, কিউবাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে। ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো দেশজুড়ে তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন।
নতুন বছরের শুরুতেই ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালালেন ট্রাম্প। যদিও গত কয়েকমাস ধরেই এর আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল। তবে কখন এবং কিভাবে এই ঘটনাটি ঘটতে পারে সেটা ছিল অনুমান নির্ভর। মাদুরোও এর অনুমান করতে পেরেছিলেন। সিআইকে ভেনেজুয়েলায় গোপন অভিযানের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই মাদুরো প্রমাদ গুণতে শুরু করেছিলেন। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কৌশলগত দিক থেকে ভিন্ন অবস্থান নিতে দেখা গেছে। বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে শুরু করে মিত্রতার সমিকরণ সব ক্ষেত্রেই যেন বিগত প্রেসিডেন্টদের তুলনায় এক ভিন্ন কৌশল নিয়েছেন। আমেরিকা ফার্ষ্ট নীতিতে অটল থাকার প্রচেষ্টা হিসেবে দেশটির বহু বছরের পরীক্ষিত মিত্রদেরও খুব একটা ছাড় দেন নি। আবার কয়েকটি যুদ্ধ থামানোর সফল প্রচেষ্টার ক্রেডিটটাও তিনি নিয়েছেন। নোবেল পাওয়া দাবিদার নিয়ে বিশ্বে কম জল্পনা হয়নি! আবার তিনিই ভেনিজুয়েলার সাথে পরিস্থিতি যুদ্ধাবস্থায় নিয়ে গেছেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সাথে সম্পর্কটা অনেকটা সাপে নেউলে অর্থাৎ নিকোলাস মাদুরোর ভেনেজুয়েলার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কটা গত কয়েক বছর ধরেই তিতা ধরনের। যে কয়েকটি দেশের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্ক চলছে তার মধ্যে অন্যতম ভেনেজুয়েলা। এর কেন্দ্রে মাদুরো সরকার। মাদুরো সরকারকে হটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে নিজের মতো একটি সরকারকে সেখানে বসাবে সেটা সহজেই অনুমেয়। মাদুরো সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র কখনোই মেনে নিতে পারেনি।
মাদুরোর ক্ষমতায় আসার পথ বেশ আলোচিত। ১৯৯২ সালে সেনা কর্মকর্তা হুগো চাভেজের ব্যর্থ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সময় মাদুরো বাসচালক হিসেবে কাজ করতেন। তার শাসনামলে ভেনেজুয়েলা ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য ও নিত্যপণ্যের সংকট দেশটিকে বিপর্যস্থ করে তোলে। তার শাসন সবচেয়ে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে কথিত কারচুপিপূর্ণ নির্বাচন, খাদ্যসংকট এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য। ২০১৪ ও ২০১৭ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযানের অভিযোগ ওঠে। মাদুরোর সরকার সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালে বহু বছরের অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশের পর মাদুরো অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন, যার পর সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় জরুরি অবস্থাও জারি করা হয়। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও আরও কয়েকটি দেশের আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে মাদুরোর সরকার। সে সময় ওয়াশিংটন তার বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করে।
এর আগে র্মাকনি প্রসেডিন্টে ট্রাম্প একাধকিবার বলছেনে, তনিি সআিইএকে ভনেজেুয়লোয় গোপন অভযিান চালানোর অনুমতি দয়িছেনে এবং প্রয়োজনে স্থল হামলার কথাও ববিচেনা করছনে। গত দুই মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় সাগরে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ ঘটিয়েছে। যদিও বিষয়টির ব্যাখ্যায় যুক্তরাষ্ট্র তখন বলেছে, মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য এসব করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা। যুক্তরাষ্ট্র শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে কারাকাসকে বার্তা দিতে চায়। এটা স্পষ্ট ছিল যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে আর এক মুহূর্তও কারাকাসের ক্ষমতার কেন্দ্রে দেখতে চান না। ভেনেজুয়েলায় বিরোধী দলগুলোর উপর দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে ভেনেজুয়েলার ভিতরেও যথেষ্ট অস্থিরতা রয়েছে। মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবের অভিযোগ অনেক পুরাতন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় সরকার পরিবর্তনের নীতি থেকে সরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন বিদেশি সরকার উৎখাতের দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে না। তবে শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থান থেকে সরে এলেন তিনি।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, মাদক বিষয়টি কেবল সামনে আনা হয়েছে মাত্র। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য মাদুরোকে নির্বাচনে বিজয়ের পর থেকেই ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। ২০২৪ সালের সর্বশেষ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার বিরোধী দল উভয়েই স্বাধীন ও সুষ্ঠু নয় বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রথম থেকে এখন পর্যন্ত মাদুরোকে সেনাবাহিনী যথেষ্ট সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। কারণ, অনেক বিশ্লেষকের মতে, ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি হলো সেনাবাহিনী। সেই বাধা কাটিয়ে মাদুরোকে গ্রেফতার করা এখন ভেনেজুয়েলার সরকার পরিবর্তনের সময়ের ব্যাপার মাত্র। সেক্ষেত্রে সরাসরি সামরিক অভিযানেই তা ছোট পর্যায়ে হলেও তাহলেই সম্ভব। সমুদ্র পথে মাদক আটকাতে যুক্তরাষ্ট্র যে আধুনিক নৌবহর মোতায়েন করে। মাদকবাহী নৌযানে মার্কিন হামলায় কমপক্ষে ৪৩ জন নিহত হয়েছেন। দেশটির জনপ্রিয় নেতা হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসেন নিকোলাস মাদুরো। সেই নির্বাচন থেকেই দেশটির বিরোধীদল কারচুপির অভিযোগ আনেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নানা টানাপোড়েন তৈরি হয়। মাদুরোকে গ্রেফতার ও সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার সরকার পরিবর্তনের পথ সুগম করলো। প্রশ্ন হলো, মাদুরোর ভাগ্যে এখন কি ঘটতে যাচ্ছে?
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিষ্ট