Tuesday 27 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

নতুন ও তরুণ ভোটার— বিএনপির সামনে সুযোগ নাকি সংকট?

মো. শাহিন রেজা
২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:১১

শুরু হয়েছে ২০২৬-এর সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা। দেশ বিদেশের সবার চোখ এখন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দিকে। গ্রাম গঞ্জের চায়ের দোকানে ভোটের আলোচনা জমে উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন বিএনপির সামনে অগ্নি পরীক্ষা। ২০০৬ সালের পর থেকে নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বিএনপি আজ এখানে এসেছে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি জামাতের দাবি, গত ১৭ বছর তাদেরসহ বিরোধী দলগুলোর উপর নানা ধরনের নির্যাতন চালানো হয়েছে। ২০০৮ সালের পর থেকে মানুষ দীর্ঘদিন ভোট দিতে পারেনি। এবার সবাই আশা করছেন ভোট উৎসবমুখর হবে। তবে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা দু’টিই আছে। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে তরুণ ভোটার, দলীয় কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থী। নির্বাচনের ফলাফলে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে বিএনপি প্রতি মানুষের ভালোবাসার কারণ হচ্ছে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নীতি, আদর্শ ও দেশপ্রেম। বর্তমান দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন গবেষণা, জরিপ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— বিএনপির সামনে যেমন অবারিত সুযোগ আছে, তেমনি আছে কঠিন কিছু বাস্তবতাও। কারণ, এবারের নির্বাচনে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সি ভোটার প্রায় পাঁচ কোটি ৪৪ লাখ। যা মোট ভোটারের প্রায় ৪৩ শতাংশ। গত এক দশকে নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে সোয়া তিন কোটি। যার মধ্যে একেবারে নতুন ভোটার প্রায় অর্ধকোটি। আর ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সের ভোটারের সংখ্যা পৌনে চার কোটির কাছাকাছি। যা মোট ভোটারের ৩০ শতাংশ। মোট ভোটারের মধ্যে নতুন ভোটারের সংখ্যা ছয় কোটির মতো। যেখানে গত ১৫ বছরে বড় একটি সংখ্যার ভোটার ভোট দেননি বা দিতে পারেননি (DW, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫)। আবার এদের মধ্যে ৫২% জানিয়েছেন, কোনো দলকেই তারা পুরোপুরি বিশ্বাস করেন না (ব্র্যাক ইনস্টিটিউট জরিপ, জুন ২০২৫)। এই তথ্য বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তরুণ ও নতুন ভোটার। কারণ জয় পরাজয়ে এরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এখনকার তরুণরা অনেক সচেতন ফলে তারা ভেবে চিন্তে ভোট প্রদান করবেন। তারা অনেকক্ষেত্রে মার্কা না দেখে প্রার্থীর ইমেজ ও পূর্বের কর্মকান্ডও বিবেচনায় রাখবেন। ফলে তরুণদের নিয়ে বিএনপির ভাবনা কতটা আকৃষ্ট করতে পারছে এটা নিয়ে একটা জরিপ বা রিসার্চ করা প্রয়োজন।

৫ আগষ্টের পরবর্তী সরকারের সময় বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ছাত্র সংগঠন আশানুরূপ সাফল্য দেখাতে পারেনি। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে তুলনামূলক মুক্ত চিন্তা ও প্রগতিশীল ক্যাম্পাস হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে অনেক বছর শিবির প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে না পারলেও ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করায় নতুন কিছু ঈঙ্গিত দিচ্ছে কি না তা নিয়ে ভাবতে হবে। যদিও ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচনের সাথে তুলনা করা যাবে না। কিন্তু তরুণদের মনোজগৎ বুঝতে এটি একটি উদাহরণ হতে পারে।

তরুণ প্রজন্ম এখন রাজনীতিতে দলীয় প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব ফলাফল বেশি দেখতে চাই। এর আগে তরুণ ও নতুন ভোটারদের নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিশেষ করে ভোট আসলে নানা প্রতিশ্রুতি দেই কিন্তু নির্বাচনের পরে তা আর বাস্তবায়ন হয় না। এখনকার তরুণরা বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা কর্মসংস্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পড়াশোনার পরিবেশ, প্রযুক্তির ব্যবহার, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নেওয়া ও মুক্ত মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বেশি ভাবিত। বিএনপি যদি তাদের প্রচার কৌশলে শুধুমাত্র অতীতের আন্দোলন ও নিপীড়নের কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তবে তরুণদের কাছ থেকে হয়তো সহানুভূতি পাবে কিন্তু আস্থা তৈরিতে তাদের মনের ভাষা বোঝাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার চিন্তায় বিশেষ করে তরুণ শিক্ষিতদের নিয়ে নানা পরিকল্পনা রয়েছে কিন্তু এসব পরিকল্পনা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে কাজ করতে হবে।

অন্যদিকে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিএনপি বিরোধী ন্যারেটিভের তথ্য সমৃদ্ধ উত্তর প্রদান, যুগোপযোগী চিন্তা, উদ্ভাবনী শক্তির ও ইতিবাচক প্রচারণা বিএনপিকে পুরো উদ্যোমে শুরু করতে হবে। অর্থাৎ মানুষের দরজায় দরজায় পরিকল্পনা পৌঁছে দিয়ে ভোটারদের মনোভাব বুঝতে এবং পরবর্তীতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে উদ্যোগী হতে হবে। এটা না পারলে তারা নির্বাচনী মাঠে পিছিয়ে পড়বে। তরুণদের কাছে দলটিকে আধুনিক ও দূরদর্শী রূপে উপস্থাপন করা না গেলে তাদের আস্থায় আনা যাবে না। তরুণদের ভোট নিজেদের বাক্সে আনতে মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষতার উন্নয়ন, মানুষের দৌড় গোড়াতে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, স্টার্টআপ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মাদক মুক্ত সমাজ, ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ, বড় ভাই ও গেস্ট রুম সংস্কৃতি বিলুপ্ত, বুদ্ধি ভিত্তিক রাজনীতি, মেধার ভিত্তিতে চাকরি ও চাকরিতে প্রবেশের যৌক্তিক বয়স বৃদ্ধি, পরিবেশ ও জলবায়ু, কৃষি ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ট্যেকনোলজি, ক্রিয়া ও সংস্কৃতি চর্চা, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি ওয়েলফেয়ার রাজনৈতিক বর্তা পৌঁছে দিয়ে নিজেদের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা ও তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিলে বিএনপির জন্য তরুণ ভোটারা সম্ভবনাময় হতে পারে। ২৪ এর পট পরিবর্তনের পরে বিএনপি দলীয় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন অপরাধ মূলক কর্মকান্ডের খবর গণমাধ্যম এসেছে। বিএনপিকে নতুন করে ভাবতে হবে এগুলোর মোকাবিলার কৌশল নিয়ে। যদিও তারা কয়েক হাজার নেতাকর্মী বহিষ্কার করেছেন যা প্রশংসার দাবি রাখে।

তরুণ শিক্ষিত ভোটারদের আকৃষ্ট করে সংসদ সদস্য হওয়া একজন ব্যক্তির উদাহরণ দিয়ে লেখাটি শেষ করবো। ঝিনাইদহের সীমান্তবর্তী এক উপজেলার নাম মহেশপুর। আশি ও নব্বইয়ের দশকে প্রত্যান্ত অঞ্চল থেকে উপজেলা শহরের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে আসতেন শিক্ষার্থীরা। তখনকার সময়ে শিক্ষিত তরুণদের সমাজের মানুষ বেশ গুরুত্ব দিতেন। এই তরুণ শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল তাদের এক শিক্ষককে ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করতে। এবং তিনি পরপর চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বিএনপি থেকে নির্বাচন করা এই ব্যক্তির নাম শহিদুল ইসলাম মাস্টার। ছাত্র ও তরুণ ভোটারের উপর ভর করে এমপি হওয়া ব্যক্তিটি এখন ঝিনাইদহ -৩ (মহেশপুর, কোটচাঁদপুর) আসনের উন্নয়নের রূপকথার হিসেবে পরিচিত। তিনি অনেক বছর আগে গত হলেও এখানকার রাজনীতিতে এখনো প্রাসঙ্গিক। কিন্তু তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলের উচ্চ শিক্ষিত ও শিল্পপতি!

ফলে বিএনপিকে জয় পেতে হলে তরুণ শিক্ষিত ও নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করতে কাজ করতে হবে। একই কথা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু একটি জরিপ বলছে তরুণদের থেকে বয়স্করা বিএনপিকে বেশি পছন্দ করে। ফলে নতুন ও তরুণ ভোটারের মনোজগৎ এর বিষয়, চাহিদা ও প্রত্যাশা আমলে নিয়ে যাথাযথ পদক্ষেপ না নিলে বিপর্যয় ঘটতে পারে! বিএনপি কতটা প্রস্তুত? উত্তর জানতে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক: অফিসার, ইউএস বাংলা মেডিকেল কলেজ, নারায়ণগঞ্জ

সারাবাংলা/এনএল/এএসজি
বিজ্ঞাপন

রংপুরে যুবদলের ৩ নেতাকে শোকজ
২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:৫৩

আরো

সম্পর্কিত খবর