Tuesday 27 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ভারসাম্যের কূটনীতি
ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

সাইফুল ইসলাম শান্ত
২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:০৪

একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতিতে সবচেয়ে দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল। পূর্ব আফ্রিকার উপকূল থেকে শুরু করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিশাল ভূখণ্ড ও জলসীমা আজ বৈশ্বিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ জিডিপি, ৬৫ শতাংশ জনসংখ্যা এবং প্রধান সমুদ্রপথের বড় অংশ এই অঞ্চলের মধ্য দিয়েই প্রবাহিত। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় শক্তিগুলো এখানে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে সক্রিয়। এই বাস্তবতায় ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশও ক্রমশ ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানই তাকে এই সমীকরণের ভেতরে টেনে এনেছে। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় ১১৮,০০০ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক এলাকা, যেখানে রয়েছে বিশাল মৎস্যসম্পদ, প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল, ও নৌ-বাণিজ্যের বিপুল সম্ভাবনা। যে পথ দিয়ে বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালিত হয়। ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

এই অঞ্চলে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা মূলত তিনটি স্তরে দৃশ্যমান—বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও সামরিক উপস্থিতি এবং কূটনৈতিক প্রভাব। যুক্তরাষ্ট্র ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কথা বলছে। অন্যদিকে চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)–এর মাধ্যমে অবকাঠামো বিনিয়োগ, বন্দর উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সংযোগ জোরদার করছে। আর ভারত নিজেকে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক নেতৃত্বের দাবিদার হিসেবে তুলে ধরছে। আবার জাপান ও অস্ট্রেলিয়া উন্নয়ন সহায়তা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার মাধ্যমে প্রভাব বাড়াতে চাইছে। এই বহুমাত্রিক প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশকে বেছে নিতে হচ্ছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাস্তবতায় এই নীতির পরীক্ষাও কঠিন হয়ে উঠেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার এবং উন্নয়ন সহযোগী। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী, অবকাঠামো উন্নয়নের অংশীদার ও কৌশলগত মিত্র। ভারত আবার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং বাণিজ্যিক অংশীদার। এই তিন শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কোনো সহজ কাজ নয়। যদিও বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বাংলাদেশের জন্য সুযোগের ক্ষেত্র। এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজার, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি এবং অস্ট্রেলিয়ার কাঁচামাল—সবকিছুই বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানির জন্য সম্ভাবনা তৈরি করে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে রপ্তানির বড় অংশও এই সমুদ্রপথ নির্ভর। তাই এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা বাংলাদেশকে শিখিয়েছে যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে খুব বেশি সময় লাগে না।

২০২৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে ৩৮.৮২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানি করেছে। এর প্রায় ৮০ শতাংশই রপ্তানি হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে। চীন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১৭.৩৫ বিলিয়ন ডলার ছিল, যার মধ্যে বাংলাদেশ চীনে মাত্র ০.৭১৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করেছিল এবং চীন থেকে ১৬.৬৪ বিলিয়ন ডলার পণ্য আমদানি করেছিল। অর্থনৈতিক দিক থেকেও ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। যৌথ বিদ্যুৎ প্রকল্প, সীমান্ত-বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প—সব ক্ষেত্রেই ভারত একটি প্রভাবশালী অংশীদার। তবে ভারতের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় চীনের প্রভাবকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠে। বাংলাদেশকে তাই এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে হবে যাতে বন্ধুত্ব অটুট থাকে কিন্তু তা অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে।

নিরাপত্তা দিক থেকেও বাংলাদেশের অবস্থান সংবেদনশীল। বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটের অংশ নয়। কিন্তু সমুদ্র নিরাপত্তা, জলদস্যুতা, মানব পাচার, মাদক চোরাচালান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা ছাড়া এগোনো কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ এ ধরনের সহযোগিতা প্রস্তাব দিচ্ছে। প্রশ্ন হলো—কীভাবে এসব সহযোগিতা গ্রহণ করা হবে, যাতে তা কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখা না হয়। এখানে বাংলাদেশের জন্য নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক মূলত অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোভিত্তিক। বড় বড় প্রকল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও বন্দর উন্নয়নে চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। তবে একই সঙ্গে ঋণ, প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রভাব নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে হবে যে কোনো অংশীদারিত্বই যেন দেশের সার্বভৌম স্বার্থ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বোঝার সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বাংলাদেশের শ্রমমান, গণতান্ত্রিক চর্চা ও মানবাধিকার বিষয়ে ক্রমশ বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতার সঙ্গে এসব বিষয় জড়িয়ে পড়ছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য অভ্যন্তরীণ নীতিগত সংস্কারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

২০২৬ সালে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কীভাবে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেকে একটি দায়িত্বশীল ও শান্তিপ্রিয় অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। আমরা যদি স্পষ্টভাবে জানাতে পারি যে আমাদের অগ্রাধিকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ, জলবায়ু সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ বাণিজ্য তবে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মাঝেও সামনের দিকে এগিয়ে যেতে কোন সমস্যা হবে না। এই প্রেক্ষাপটে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। প্রথমত, বাংলাদেশের উচিত কোনো সামরিক বা কৌশলগত জোটে জড়িয়ে না পড়ে বহুপাক্ষিক কূটনীতিকে জোরদার করা। আসিয়ান, বিমসটেক, আইওআরএ ও জাতিসংঘের মতো প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় ভূমিকা রাখলে ভারসাম্য রক্ষা সহজ হবে। দ্বিতীয়ত, সমুদ্রনীতি ও ব্লু ইকোনমি নিয়ে সুস্পষ্ট কৌশল থাকা দরকার, যাতে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের স্বার্থ স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়। তৃতীয়ত, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে অংশীদার বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে, যাতে কোনো এক শক্তির ওপর অতিনির্ভরতা ঝুঁকি না বাড়ায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের নিজের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শক্তিশালী অর্থনীতি, কার্যকর প্রশাসন ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নীতি থাকলে বড় শক্তিগুলোর মাঝেও ছোট ও মাঝারি দেশ নিজের কণ্ঠস্বর জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারে। ইতিহাস বলে যারা নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার রাখতে পেরেছে, তারাই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে আছে।

ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ আজ একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মাঝেও দেশের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত শান্তিপূর্ণ উন্নয়ন, টেকসই বাণিজ্য ও সার্বভৌম স্বার্থের সুরক্ষা। কোনো পক্ষের সঙ্গে অতিনির্ভরতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি সুযোগ এড়িয়ে যাওয়াও আত্মঘাতী। তাই বাংলাদেশের কূটনীতিকে হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ, বাস্তববাদী ও বহুপাক্ষিক। শক্তিশালী অর্থনীতি, নীতির ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য অবস্থান থাকলে বড় শক্তিগুলোর মাঝেও বাংলাদেশ নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। বন্দর, সংযোগ ও সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতিকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগাতে পারলে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর