বাংলাদেশ আজ তার ইতিহাসের এক অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এখন আর কেবল মানচিত্রের দুটি পৃথক ভূখণ্ড নয়, বরং এটি দ্রুত পরিবর্তনশীল এক সমন্বিত ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য, নতুন বাণিজ্যিক পথ, প্রযুক্তির আদান-প্রদান এবং নিরাপত্তার সমীকরণ প্রতিনিয়ত নতুন রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল যখন বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে, তখন কেবল নিকট প্রতিবেশীদের ওপর অতি-নির্ভরশীল থাকা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আর যথেষ্ট নয়। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ এবং উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য অর্জনে দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিকে আরও বহুমুখী, সাহসী ও ভবিষ্যতমুখী করা এখন সময়ের দাবি।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক তৎপরতা মূলত ভারত ও চীন— এই দুই বড় প্রতিবেশীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান, ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক প্রয়োজনে এই দ্বিমুখী নির্ভরশীলতা একসময় যৌক্তিক ছিল। কিন্তু বর্তমানের বৈশ্বিক বাস্তবতায় একক বা দ্বৈত কোনো শক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আমাদের এই সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে প্রকট হয়ে ধরা দিয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারের সাথে বিদ্যমান রোহিঙ্গা সংকটের প্রেক্ষাপটে। মিয়ানমার আমাদের জন্য কেবল একটি প্রতিবেশী দেশ নয়, বরং এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল বাজারে প্রবেশের প্রধান ‘প্রবেশদ্বার’।
কিন্তু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কিংবা সীমান্ত সুরক্ষার প্রশ্নে আমরা দেখেছি, আমাদের দীর্ঘদিনের দুই বড় অংশীদার ভারত ও চীন—উভয়েই নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সাথে একধরনের ভারসাম্য রক্ষা করে চলছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, বড় সংকটের মুহূর্তে কেবল নিকট প্রতিবেশীর ওপর নির্ভর করা সবসময় ফলপ্রসূ হয় না। তাই মিয়ানমার সীমান্তের অস্থিরতা ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় আমাদের এখন আসিয়ানসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক শক্তির সাথে এমন এক শক্তিশালী সেতুবন্ধন তৈরি করতে হবে, যা সংকটের সময় আমাদের দরকষাকষির ক্ষমতা বা ‘বারগেইনিং পাওয়ার’ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
বাংলাদেশের জন্য সমৃদ্ধ আগামীর পথে পরবর্তী বড় সুযোগের নাম হচ্ছে ‘আসিয়ান’। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের এই অর্থনৈতিক জোট বর্তমানে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এটি চতুর্থ স্থানে উঠে আসবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে এই বিশাল বাজারকে আমরা এক প্রকার অবজ্ঞা করে এসেছি, ফলে আমাদের রপ্তানি সক্ষমতা মূলত ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারের ওপর আটকে রয়েছে। ২০২৬-পরবর্তী শুল্ক ও বাণিজ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আসিয়ানের সাথে ‘সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার’ মর্যাদা অর্জন করা এখন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি কূটনৈতিক লক্ষ্য নয়, বরং এটি আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি জীবনরক্ষাকারী রক্ষাকবচ।
আসিয়ানের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে আমাদের কার্যকর প্রবেশাধিকার থাকলে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীভূতকরণের পথ যেমন প্রশস্ত হবে, তেমনি আমাদের রপ্তানি পণ্যের বাজারও বহুমুখী হবে। বিশেষ করে ভিয়েতনামের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উত্থান আমাদের জন্য এক বড় শিক্ষা। ভিয়েতনামের সাথে ‘প্রতিযোগিতার’ পরিবর্তে ‘সহযোগিতার’ সম্পর্ক গড়ে তুলে যদি আমরা নিজেকে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত করতে পারি, তবে পোশাক শিল্পের প্রথাগত গণ্ডি পেরিয়ে ইলেকট্রনিক্স ও হালকা প্রকৌশল খাতে বাংলাদেশ এক নতুন শিল্প বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হবে।
এই নতুন কূটনৈতিক যাত্রায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশীদার। ঐতিহাসিকভাবে এই দেশগুলোর সাথে আমাদের সম্পর্ক মূলত অনুদান ও উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে আমরা মেগা-অবকাঠামো ও উচ্চপ্রযুক্তির এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছি। জাপানের ‘বিগ-বি’ (Bay of Bengal Industrial Growth Belt) উদ্যোগের আওতায় মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, মেট্রোরেল কিংবা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো প্রকল্পগুলো প্রমাণ করে যে, জাপান বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রধান অর্থনৈতিক ‘হাব’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে অত্যন্ত আগ্রহী।
ঠিক একইভাবে, দক্ষিণ কোরিয়া আমাদের জন্য উচ্চপ্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, রোবোটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো খাতে অপার সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্যামসাং বা হুন্দাইয়ের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো যখন বাংলাদেশে তাদের উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করছে, তখন আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত তাদের বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি অপরিহার্য অংশ হওয়া। এই দুই এশীয় জায়ান্টের সাথে সম্পর্কের গভীরতা বাড়লে ভারত ও চীনের মধ্যকার আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ের মাঝখানে বাংলাদেশ একটি ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’বজায় রাখতে পারবে। এটি কেবল আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিয়োগই নিশ্চিত করবে না, বরং উন্নত বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে একটি নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে ব্র্যান্ডিং করবে।
আমাদের বৈদেশিক নীতির নজর এখন কেবল দক্ষিণ বা পূর্বেই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার উদীয়মান বাজারগুলোর দিকেও ফেরাতে হবে। প্রথাগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যকে আমরা কেবল অদক্ষ জনশক্তির শ্রমবাজার ও জ্বালানি তেলের উৎস হিসেবে দেখে আসছি। কিন্তু সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’ কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের বৈচিত্র্যময় অর্থনৈতিক রূপান্তর আমাদের জন্য নতুন দ্বারের উন্মোচন করেছে।
আমাদের দক্ষ পেশাজীবী—যেমন প্রকৌশলী, চিকিৎসক এবং আইটি বিশেষজ্ঞদের জন্য সেখানে যেমন উচ্চমানের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তেমনি তাদের বিশাল ‘সার্বভৌম সম্পদ তহবিল’আমাদের দেশের আধুনিক অবকাঠামো বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। পাশাপাশি, দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে মধ্য এশিয়ার খনিজ সমৃদ্ধ দেশগুলোর সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা এখন অপরিহার্য। উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান বা তুর্কমেনিস্তানের মতো দেশগুলোর প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার আমাদের জ্বালানি উৎসকে বহুমুখী করবে। মনে রাখতে হবে, বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক দৌড়ে তারাই এগিয়ে থাকে, যারা বুদ্ধিমত্তার সাথে বৈশ্বিক জোটগুলোর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে এবং বহুমুখী বিকল্প হাতে রাখে।
তবে এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হলে আমাদের বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক কূটনীতির সনাতন খোলসটি দ্রুত ত্যাগ করতে হবে। কেবল লিয়াজোঁ রক্ষা করা বা প্রটোকলভিত্তিক কূটনীতি দিয়ে আজকের জটিল ও প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব-রাজনীতিতে টেক্কা দেওয়া অসম্ভব। বর্তমানের এই ‘অদম্য অঞ্চলে’ নিজেদের অবস্থান সংহত করতে আমাদের প্রয়োজন ‘অর্থনৈতিক কূটনীতিতে’বিশেষভাবে দক্ষ একদল পেশাদার প্রতিনিধি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি শক্তিশালী ‘ইকোনমিক উইং’ গঠন করা এখন সময়ের দাবি, যারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মারপ্যাঁচ বুঝবেন এবং দরকষাকষিতে পটু হবেন। বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী শুল্ক সুবিধা হারানোর সম্ভাব্য ধাক্কা সামলাতে বিভিন্ন দেশের সাথে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (PTA) স্বাক্ষর করার কোনো বিকল্প নেই। একই সাথে বিমসটেক-এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোকে কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ না রেখে একে কার্যকর কানেক্টিভিটির প্রধান হাতিয়ার বানাতে হবে।
পরিশেষে, প্রতিবেশীর গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের এই অগ্রযাত্রা কেবল একটি কূটনৈতিক বিলাসিতা নয়, এটি একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের টিকে থাকার প্রধান রক্ষা কৌশল। এশিয়া যখন বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক হৃৎপিণ্ডে পরিণত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশকে সেই গতির সাথে তাল মিলিয়ে প্রথম সারির যাত্রী হতে হবে। ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করা, বাণিজ্যিক জোটের বিস্তৃতি ঘটানো এবং পেশাদার অর্থনৈতিক কূটনীতি নিশ্চিত করাই হবে আগামীর ‘স্মার্ট বাংলাদেশের’প্রকৃত শক্তি। আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি অদম্য ও গতিশীল অঞ্চলে বাংলাদেশ কেবল অন্যের অনুসারী হয়ে নয়, বরং নিজস্ব স্বকীয়তা ও কৌশলগত মিত্রতা নিয়ে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী