Saturday 07 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ভাষার মাসে ভোটের কোলাহল, নীরব ভাষাচেতনা

মীর আব্দুল আলীম
৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:১৪

ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস। এই মাসে জাতির স্মরণ করার কথা ছিল ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগ, মাতৃভাষার মর্যাদা ও ভাষাচেতনার শক্ত ভিত। কিন্তু বাস্তবতা হলো ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে ভাষার চেয়ে বেশি উচ্চকিত নির্বাচন। রাজপথ, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে নির্বাচনী ব্যস্ততা চোখে পড়লেও ভাষার চেতনা প্রায় অনুপস্থিত। প্রশ্ন উঠছে ভাষার মাসে কি তাহলে ভাষাই সবচেয়ে উপেক্ষিত হয়ে পড়েছে? একসময় ফেব্রুয়ারি এলেই দেশের পরিবেশ বদলে যেত। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি মানুষকে নাড়া দিত। ছাত্রসমাজ প্রস্তুতি নিত, খালি পায়ে প্রভাতফেরিতে অংশ নিত। একুশ ছিল আত্মমর্যাদা ও প্রতিবাদের প্রতীক। আজ সেই আবেগ অনেকটাই ক্ষীণ। একুশে ফেব্রুয়ারি এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতা নির্ভর একটি দিনে পরিণত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ভাষার মাস জুড়েই এখন রাজনৈতিক কর্মসূচি, নির্বাচনী সভা, পোস্টার ও ব্যানারে ছেয়ে থাকে শহর, গ্রাম, বন্দর। অথচ এসব প্রচারণার ভাষার দিকে তাকালে হতাশ হতে হয়। ব্যানার, পোস্টারে বানান ভুল, বাংলা-ইংরেজির অযৌক্তিক মিশ্রণ কিংবা পুরোপুরি বিদেশি ভাষার ব্যবহার সব মিলিয়ে ভাষার মাসেই বাংলা ভাষার প্রতি চরম অবহেলা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

২০২৬ সালেও বাংলা ভাষার অবমাননার চিত্র বদলায়নি। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে ভুল বানান এখন স্বাভাবিক বিষয়। উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও বিদেশি ভাষায় নামফলক কমেনি। রাজধানীর বিপণিবিতান, রেস্তোরাঁ, আবাসন প্রকল্প ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ নাম এখনও ইংরেজিতে। খাবারের দোকানে ‘বিরিয়ানি’ লেখা হয় ‘বিরানী’, ‘ভর্তা’ হয়ে যায় ‘ভরতা’। ভাষার মাসেও এসব সংশোধনের উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

নির্বাচনের সময় ভাষার ব্যবহার আরও বাড়ে স্লোগান, বক্তৃতা, ইশতেহারে। কিন্তু সেই ভাষা কতটা শুদ্ধ, কতটা সচেতনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার বিষয়টি খুব কমই গুরুত্ব পায়। ভোটের রাজনীতিতে ভাষা যেন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম, চেতনার জায়গায় নয়।

ডিজিটাল যুগে এই অবহেলা আরও প্রকট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল বিলবোর্ড ও অনলাইন প্রচারণায় ইংরেজির আধিপত্য। ভাষার মাসেও প্রযুক্তির ভাষা হিসেবে বাংলা নিজ দেশে প্রতিষ্ঠা পায় না। অথচ বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা একটি ভাষা আজ নিজ দেশেই প্রান্তিক।

নবাবি আমলে বাংলায় আরবি ও ফার্সি শব্দের প্রবেশ হয়েছিল, যা সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে ভাষার অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে হিন্দি ও ইংরেজি শব্দ নির্বিচারে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনের চেয়ে আত্মপরিচয়ের সংকটকেই বেশি নির্দেশ করে। নির্বাচনী স্লোগানেও এই প্রবণতা স্পষ্ট।

একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জাতিসত্তার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি দিন। ভাষার জন্য জীবন দেওয়ার ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল। অথচ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে এই আত্মত্যাগের চেতনা আমরা কতটা ধারণ করছি? একুশ কি আজও আমাদের মননে-মননে জীবন্ত, নাকি কেবল রাষ্ট্রীয় ক্যালেন্ডারের একটি আনুষ্ঠানিক দিন হয়ে উঠেছে?

একসময় ফেব্রুয়ারি এলেই চারপাশে অন্য রকম এক আবহ তৈরি হতো। পাড়া-মহল্লায় ভেসে আসত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…’। সেই গান শুনলেই কিশোর-তরুণদের মনে ভাষার জন্য আত্মত্যাগের ইতিহাস নতুন করে নাড়া দিত। একুশের র‌্যালির প্রস্তুতি চলত দিনের পর দিন। ভোরে খালি পায়ে শহীদ মিনারের পথে যাওয়া ছিল নীরব শ্রদ্ধা আর আত্মপরিচয়ের প্রকাশ। আজ সেই আবেগ অনেকটাই ম্লান।

বর্তমানে একুশে ফেব্রুয়ারি যেন আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ। শিক্ষার্থীদের বড় অংশের কাছে ভাষা আন্দোলন পাঠ্যবইয়ের একটি অধ্যায় মাত্র। ফেব্রুয়ারির একটি দিন শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া ছাড়া বাংলা ভাষা নিয়ে তেমন কোনো তাগিদ দেখা যায় না। মাস পেরোতেই দৈনন্দিন জীবনে আবার ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার নিরঙ্কুশ প্রাধান্য। সংস্কৃতের অপভ্রংশ মাগধী প্রাকৃত থেকে জন্ম নেওয়া বাংলা ভাষা হাজার বছর ধরে মানুষকে এক সূত্রে বেঁধেছে। এই ভাষার ভিত্তিতেই বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। অথচ ভাষার মাসেই যদি রাজনীতি ভাষাকে উপেক্ষা করে, তবে তা ভাষা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।

আজ অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসাক্ষেত্রেও ইংরেজির প্রাধান্য বাড়ছে। চিকিৎসকরা বাংলায় প্রেসক্রিপশন লেখেন না, আদালতে বাংলা ব্যবহারে এখনও অনীহা। অথচ একসময় এই ভূখণ্ডেই বাংলায় বিচারকার্য ও চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থ রচিত হয়েছে। ভাষার মাসে এসব প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসে, কিন্তু নির্বাচনী ব্যস্ততায় তা গুরুত্ব পায় না।

গত কয়েক দশকে সমাজে পরিবর্তন এসেছে, রাজনীতির ভাষাও বদলেছে। পরিবর্তন অনিবার্য। কিন্তু ভাষার ক্ষেত্রে যে অবহেলা চলছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচন গণতন্ত্রের অংশ, কিন্তু ভাষা জাতিসত্তার ভিত্তি। একটিকে অন্যটির বিকল্প করা যায় না।

ভাষার মাসে যদি কেবল নির্বাচন থাকে, আর ভাষাচেতনা অনুপস্থিত থাকে, তবে একুশের আত্মত্যাগ প্রশ্নের মুখে পড়ে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই বাস্তবতা বদলানোর দায়িত্ব রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমাজ সবার।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সমাজ গবেষক

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর