মাঘের দুপুর। প্রচন্ড রোদের মধ্যেও মাঝে মাঝে হালকা বাতাস আসছে। লোহালিয়া নদীর ওপার থেকে আসা এই মৃদুমন্দ বাতাসে একটু জিরিয়ে নিতে বসে আছি চায়ের দোকানে। এপারে দুমকির চরগরবদী। ওপারে বাউফলের বগা। মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে নদী। একটি ফেরি একটু পর পর এপার-ওপার করছে। তাতে পারাপার হচ্ছে নানা ধরণের যানবাহন। এই দৃশ্য লোহালিয়া পাড়ের মানুষের কাছে খুবই চেনা-পরিচিত এবং স্বাভাবিক ব্যাপার।
কথা হচ্ছিলো নির্বাচন নিয়ে। একদম কাছে গিয়ে অনেকটা একান্তেই চা দোকানির কাছে জানতে চাইলাম নির্বাচনের খবর কি? কি মনে হয়? কারা জিততে পারে? বললেন-এইখানটা পটুয়াখালী-১ আসনের মধ্যে। নদীর ওপার গেলেই পটুয়াখালী-২। দুই পাড়ে দুই ধরণের হাওয়া। তবে মানুষ নতুন কিছু খুঁজছে। ভোটের পরিবেশ সুষ্ঠু থাকলে বলা যায় না পরিবর্তন আসতেও পারে। আমি ও আমার পরিবার দীর্ঘদিন যে দলটির সঙ্গে ছিলাম এবার মনে হয় আর থাকা হবে না। মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের একটা ভাব দেখছি। কিন্তু মুখে কেউ কিছু বলবে না আপনাকে।
লোকটির কথার সঙ্গে আমার গত দু’দিনের মাঠের পর্যবেক্ষণ মিলে গেলো। মনে হলো তিনি সত্যি বলছেন। কেননা বরিশালের বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে খুব কম মানুষের কাছ থেকেই পছন্দের মার্কার নাম জানতে পেরেছি। বেশিরভাগ ভোটারই প্রকাশ্যে তাদের পছন্দের প্রতীক কিংবা ব্যক্তির কথা বলেননি। কিন্তু আকারে-ইঙ্গিতে বলেছেন। একজন সাংবাদিক হিসেবে তাদের মনের ভাষা বুঝতে আমার কষ্ট হয়নি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ভোটের মাঠে উত্তেজনা ততোই বাড়ছে। বিশেষ করে প্রচার-প্রচারণা কিংবা জনসভায় উত্তাপ ছড়াচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে যুদ্ধবস্থা বিরাজ করছে। কোথাও কোথাও সামাজিক মাধ্যমের যুদ্ধ গড়াচ্ছে মাঠে। মারামারি হচ্ছে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ আসছে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় নির্বাচন এলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ছড়াবে এটাই স্বাভাবিক চিত্র। যা ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে অনুপস্থিত ছিলো।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ভোটের যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে তাকে সুযোগ হিসেবে মনে করছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ চাইছে এই নির্বাচন অতীতের সকল বঞ্চনা দূর করুক। সকল মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করুক। নির্বাচনকে ফিরিয়ে আনুক চিরাচরিত উৎসবের আমেজে। জনগণ তাদের বিবেক-বুদ্ধি খাটিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিক। একটি সত্যিকারের জনগণের সরকার গঠিত হোক। যেই সরকারের ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার সুযোগ থাকবে না। যেই সরকার জনগণের দায়কে তাদের দায়িত্ব মনে করবে। ক্ষমতাকে মনে করবে সেবা। যে কারনে বিএনপি-জামায়াত জোট একটি নতুন বাংলাদেশের কথা বলছে। জনগণকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিনগুলোতে তারা জনগণের সত্যিকারের সেবক হবে বলে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন দল দুটির শীর্ষ নেতৃত্ব।
পঁচিশের ২৫ ডিসেম্বর দেশে আসেন তারেক রহমান। তার আগমনটি নি:সন্দেহে একটি মাইলফলক। একটি নতুন বাংলাদেশে বার্তা এবং পুরণোকে বিদায় করে নতুন বন্দোবস্তের পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘ ১৭ বছরের পর জনতার সামনে দাঁড়ান তিনি। তার মুখ থেকে সেদিন মানুষ যে ভবিষ্যতের বার্তা পেয়েছে তা এক কথায় অসাধারণ। প্রশংসা আর আস্থায় নিয়েছে সাধারণ মানুষ।
সেই থেকে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা ও দলীয় কর্মকান্ডে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তারেক রহমান। সভা-সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন। কখনো প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ছেন। কখনো প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন। আবার কখনো করছেন সমালোচনা। যার সবগুলোই নির্বাচনী প্রচারণায় একেবারেই স্বাভাবিক। একই দিনে একাধিক জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে কোনো কোনো বক্তব্য যে বিতর্ক সৃষ্টি করছে না একথা বলার অবকাশ নেই। কেউ কেউ তার সাম্প্রতিক দুয়েকটি বক্তব্যে হতাশও হয়েছেন হয়তো। কিন্তু দিনশেষে তিনি যে দেশপ্রেম ও দেশ গঠনের পরিকল্পনার কথা বলছেন সেটিও পাচ্ছে গ্রহণযোগ্যতা। সবমিলে তারেক রহমানের কথায় একদিকে যেমন তার দলের মানুষ উজ্জীবীত হচ্ছে। সেই সঙ্গে দেশের মানুষ তাকে নতুন করে আবিস্কারের সুযোগ পাচ্ছে। এই আবিস্কারের পুরস্কার কিংবা তিরস্কার নিশ্চয়ই ভোটের মাঠে তার দল বিএনপি পাবে।
অপরদিকে জামায়াতের আমীর ডাক্তার শফিকুর রহমানও দিনরাত একাকার করে ছুটে বেড়াচ্ছেন। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। মাঠের প্রতিপক্ষের প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ছেন। নতুন নতুন চটকদার বিষয় সামনে তুলে আনছেন। তার কথায়ও দলের কর্মীরা উদ্দীপ্ত হচ্ছে। দেশের মানুষ তার কথাও মনযোগ দিয়ে শুনছেন। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কোনপথে যাবে সে বিষয়ে সম্যক ধারণা পাচ্ছে। তবে তিনিও যে ভুলভাল বলছেন না তাও নয়। অর্থাৎ এই দুই শীর্ষ নেতার অনেক বক্তব্যই কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক গন্ডি পেরিয়ে সামাজিক ও ধর্মীয় অঙ্গণে বিতর্ক ছড়াচ্ছে। নির্বাচনী অতিকথনে এমন কিছু কিছু ভুল নিশ্চয়ই পরিবেশকে জমজমাট করে। সমালোচক থেকে শুরু করে সাধারনের কাছেও হয় মুখরোচক।
এই মুখরোচক বক্তব্য নির্বাচনের মাঠে রাজনৈতিক দল কিংবা প্রার্থীকে প্রাসঙ্গিক রাখে। নেতাকর্মীরা নানারুপ বিশ্লেষণ করে নেতা-নেত্রীর পক্ষে অবস্থান নেন। লড়ে যান ভোটের দিন অব্দি। নেতা যা বলেছেন সেটিই সঠিক এবং শতভাগ যৌক্তিক এটি প্রতিষ্ঠায় কর্মীদের এই লড়ে যাওয়াই রাজনীতিকদের মূল শক্তি। এমন নেতা অন্ত:প্রাণ কর্মী আছে বলেই এদেশে রাজনীতি ধীরে ধীরে পেশায় পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর নেতার কোনো চাকরি, ব্যবসা কিংবা উপার্জনের বৈধ ব্যবস্থা না থাকার পরও তারা ডাটেভাটে চলেন। সন্তানদের বিদেশে পড়ান। আলিশান বাড়িতে থাকেন। ভাঁজ করা সফেদ পোশাকে থাকেন ফিটফাট।
পরিশেষে ফিরে যেতে চাই সেই বগা ফেরি ঘাটের চা দোকানির কথায়। তিনি বলেছিলেন, জনগণের মুখে এক অন্তরে আরেক। তাদের কাছে পুরনো আমলের রাজনীতি পাত্তা পাচ্ছে না। সবার কথা শুনেন। কিন্তু আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে চান না। কেননা বলার চেয়ে করে দেখানো বেশি জরুরি। পুরণো ধ্যান-ধারণা নিয়ে রাজনীতি তারা আর পছন্দ করছেন না। বিশেষ করে যে বৈষম্য আর রাজনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে এদেশে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো যদি ফের সেই পথেই হাঁটে তাহলে তার জবাব জনগণ ব্যালটের মাধ্যমেই দেবে। এর জন্য আগবাড়িয়ে কিছু বলার প্রয়োজন মনে করে না তারা।
নির্বাচনী সংবাদ কাভারেজে ১০ টি জেলার অন্তত ২৫টি সংসদীয় আসনের জনগণের সঙ্গে কথা বলে আমারও এই বিষয়টিই মনে হয়েছে। তাই লোহালিয়ার চরগরবদী ফেরী ঘাটের চা দোকানিকে আমার কোনো ভাবেই কেবল একজন চা-ওয়ালা মনে হয়নি বরং তিনিই প্রকৃত সচেতন নাগরিক। যারা প্রতি পাঁচ বছর পর পর তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পান। অথচ ফ্যাসিস্ট হাসিনা তাদের সেই ছোট্ট অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়েছিলো। আশা করি ভবিষ্যতে আর কেউ তাদের এই অধিকার কেড়ে নেবে না। তাহলেই এইসব চা দোকানিরা প্রজা থেকে নাগরিক হয়ে উঠবেন। বাংলাদেশ হবে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক কল্যান রাষ্ট্র।
লেখক: সাংবাদিক ও কথাশিল্পী