Sunday 08 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

গণভোট: রাষ্ট্র মেরামতে জনগণের ঐতিহাসিক ‘রায়’

মাসুদ রানা
৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:২৯

বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক অনন্য সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপে ‘গণভোট’ বা ‘রেফারেন্ডাম’ আয়োজনের সিদ্ধান্তটি কেবল একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি রাষ্ট্র সংস্কারের এক চূড়ান্ত দলিল। আসন্ন নির্বাচনে জনগণ ঠিক করবে ‘কারা দেশ চালাবে’, আর গণভোটের মাধ্যমে জনগণ ঠিক করবে ‘বাংলাদেশ কীভাবে চলবে’। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে জনমনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—গণভোটে আমাদের অবস্থান কী হওয়া উচিত? ‘হ্যাঁ’ নাকি ‘না’? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আমাদের বুঝতে হবে এই গণভোটের গভীর প্রেক্ষাপট ও জাতীয় প্রয়োজনীয়তা।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এখন এক ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্গঠনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিগত কয়েক দশক সময় ধরে রাষ্ট্রযন্ত্রে যেভাবে দলীয়করণ চালানো হয়েছে, তাতে আমাদের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত্তি আজ নড়বড়ে। একটি জরাজীর্ণ ভবনের কেবল ‘ম্যানেজার’ বদলালে যেমন ভবনটি নিরাপদ হয় না, ঠিক তেমনি কেবল সরকার পরিবর্তন করে রাষ্ট্রকে নিরাপদ করা সম্ভব নয়—যদি না এর নড়বড়ে খুঁটিগুলো মেরামত করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ এবং আসন্ন গণভোট মূলত সেই জরাজীর্ণ রাষ্ট্রকাঠামোকে ভেঙে নতুন করে গড়ার এক অনিবার্য প্রয়াস। আমাদের রাজনীতির ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি হলো, ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও শোষণের কাঠামোর কোনো পরিবর্তন হয় না। সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতার চাবিকাঠি এমনভাবে বিন্যস্ত যে, যিনিই ক্ষমতায় বসেন, তিনিই একসময় অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন। প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতার একচেটিয়া কেন্দ্রীভবন এবং জবাবদিহিতার অভাব অতীতে বারবার স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে। তাই কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কাউকে ক্ষমতায় বসালেই সমস্যার সমাধান হবে না; বরং প্রয়োজন এমন এক ‘সেফটি লক’ বা আইনি রক্ষাকবচ, যা ভবিষ্যতে কোনো শাসককে দানব হয়ে উঠতে বাধা দেবে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রস্তাবিত— দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়া, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা কিংবা বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো সেই রক্ষাকবচেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে, অন্তর্বর্তী সরকার তো চাইলেই অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে কেন এই গণভোটের আয়োজন? এর উত্তর নিহিত রয়েছে ‘বৈধতা’ ও ‘স্থায়িত্বের’ প্রশ্নে। অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো আদেশ বা অধ্যাদেশ সাময়িক; পরবর্তী নির্বাচিত সরকার চাইলেই ‘জনগণের ম্যান্ডেট নেই’—এই অজুহাতে কলমের এক খোঁচায় তা বাতিল করে আবার পুরনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় ফিরে যেতে পারে। কিন্তু সংস্কারের এই এজেন্ডাগুলো যদি সরাসরি জনগণের ভোটে অনুমোদিত হয়, তবে তা এক ভিন্ন মাত্রা পায়। গণভোটের রায় হলো জমির পাকা দলিলের মতো। জনগণ যখন সরাসরি কোনো পরিবর্তনে সিলমোহর দেয়, তখন তা আর কোনো বিশেষ সরকারের সিদ্ধান্ত থাকে না, তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত আদেশ। ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকার চাইলেই জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে পাস হওয়া এই সংস্কারগুলো হুট করে বাতিল করার সাহস পাবে না। তাই আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি এই গণভোট কোনো আনুষ্ঠানিকতা মাত্র নয়; বরং এটি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, গণতান্ত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্র রেখে যাওয়ার চূড়ান্ত আইনি দলিল সম্পাদনের সুযোগ। ব্যালটের এই রায়েই নির্ধারিত হবে—আমরা কি পুরনো বৃত্তেই ঘুরপাক খাব, নাকি প্রকৃত রাষ্ট্র সংস্কারের পথে হাঁটব।

গণভোটের ব্যালটে যখন সংবিধানের অগণতান্ত্রিক ধারা বাতিল, প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতার ভারসাম্য আনয়ন কিংবা বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো রাখা হবে, তখন জনগণের একটি ‘হ্যাঁ’ সূচক রায় কেবল একটি প্রশাসনিক অনুমোদন হবে না; বরং তা হবে আগামীর বাংলাদেশের এক শক্তিশালী রক্ষাকবচ। গণভোটে সংস্কারের পক্ষে রায় দেওয়ার অর্থ হলো— ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা দল যেন ক্ষমতার দম্ভে ‘দানব’ হয়ে উঠতে না পারে, তার পথ আইনিভাবে চিরতরে রুদ্ধ করে দেওয়া। এই ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার নৈতিক দায়বদ্ধতা আরও গভীরতর হয় চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে। সংস্কার প্রস্তাবগুলোতে সায় দেওয়া মানে হলো শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করা এবং তাদের স্বপ্নের রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় অংশীদার হওয়া। জনগণের সমর্থনপুষ্ট এই সংস্কার কেবল বর্তমানের জন্য নয়, বরং একটি শোষণমুক্ত আগামীর ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করবে। অধিকন্তু, কোনো নির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব যদি সরাসরি জনগণের ভোটে অনুমোদিত হয়, তবে তার নৈতিক ও আইনি ভিত্তি এতোটাই সুদৃঢ় হয় যে, পরবর্তী কোনো নির্বাচিত সরকার চাইলেও তা হুট করে পরিবর্তন বা বাতিল করতে পারবে না। তাই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলা মানে কেবল একটি প্রস্তাবকে সমর্থন করা নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিমূলক ভবিষ্যৎকে বরণ করে নেওয়া।

তবে গণতন্ত্রের সৌন্দর্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো দ্বিমত পোষণের স্বাধীনতা। গণভোটে কেবল ‘হ্যাঁ’ বলার সুযোগ থাকাই গণতন্ত্র নয়, বরং কোনো প্রস্তাবনা জনস্বার্থের পরিপন্থী মনে হলে সেখানে সাহসের সাথে ‘না’ বলার অধিকার থাকাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি গণভোটের কোনো প্রস্তাবনা এমন হয় যা দেশের অখণ্ডতা বা সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি স্বরূপ, কিংবা যদি দেখা যায় সংস্কারের নামে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর কায়েমি স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা চলছে—তবে সচেতন নাগরিক হিসেবে সেখানে ‘না’ বলাটাই হবে প্রকৃত দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংস্কারের যে মূল লক্ষ্যগুলো আমাদের সামনে রাখা হয়েছে, সেগুলো মূলত রাষ্ট্রকে একটি আইসিইউ পর্যায় থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা। এই পরিস্থিতিতে যদি আমরা সংস্কারের মূল এজেন্ডাগুলোকে তলিয়ে না দেখে কেবল বিরোধিতা করার খাতিরে বা রাজনৈতিক সংকীর্ণতা থেকে ঢালাওভাবে ‘না’ বলে দিই, তবে তার ফলাফল হবে ভয়াবহ। সংস্কারকে প্রত্যাখ্যান করার অর্থ হবে প্রকারান্তরে সেই পুরনো ও জরাজীর্ণ ব্যবস্থাকেই পুনরায় বৈধতা দেওয়া। তাই অধিকারের ‘না’ এবং বিরোধিতার ‘না’—এই দুইয়ের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্যটি অনুধাবন করা আজ সময়ের দাবি।

সাধারণ নির্বাচনে আমাদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় দলীয় আনুগত্য বা সাময়িক আবেগ বড় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু গণভোটের ব্যালট সাধারণ নির্বাচনের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং গভীরতর তাৎপর্য বহন করে। এখানে আমরা কোনো ব্যক্তি বা দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য ভোট দিচ্ছি না, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করছি। ভোট দেওয়ার আগে প্রতিটি নাগরিকের উচিত প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো গভীরভাবে পাঠ করা এবং অনুধাবন করা। আমাদের দেখতে হবে, এই পরিবর্তনগুলো কি সত্যিই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটাচ্ছে? আমাদের আজকের একটি ছোট সই বা ‘হ্যাঁ’ চিহ্ন আমাদের সন্তানদের জন্য একটি নিরাপদ, মুক্ত এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ নিশ্চিত করবে কি না—সেই বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করাই হবে একজন সচেতন নাগরিকের প্রধান কাজ।

পরিশেষে, রাষ্ট্র সংস্কারের এমন সুবর্ণ সুযোগ একটি জাতির জীবনে বারবার আসে না। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান আমাদের সামনে যে দ্বার উন্মোচন করেছে, গণভোট হলো সেই পথ দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমরা হয়তো আগামী পাঁচ বছরের জন্য আমাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করব, কিন্তু এই গণভোটের মাধ্যমে আমরা কার্যত আগামী কয়েক দশকের জন্য আমাদের জাতীয় ভাগ্য লিখব। যদি অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রস্তাবগুলো ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং একটি মেধাতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের সপক্ষে হয়, তবে দ্বিধাহীনভাবে জনগণের রায় ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষেই যাওয়া উচিত। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই ‘হ্যাঁ’ ভোট কোনো ব্যক্তি বা বর্তমান সরকারের প্রতি সমর্থন নয়; বরং এটি একটি উন্নত, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশের পথচলার স্বীকৃতি। পুরনো সেই জরাজীর্ণ ও শোষণমূলক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ আমাদের হাতে নেই। এখন সময় নতুনের পক্ষে হাত তোলার, আগামীর সুন্দর বাংলাদেশের পক্ষে রায় দেওয়ার। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে আমাদের সঠিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আমরা কি অন্ধকারের গহ্বরেই পড়ে থাকব, নাকি আলোর পথে যাত্রা শুরু করব।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

সারাবাংলা/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর