বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এবারের নির্বাচনটি ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যাতিক্রম। প্রথমেই জনগণের রায়ে বিএনপি সরকার গঠনের সুযোগ পাওয়ায় আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। দীর্ঘ ২০ বছর পর বিএনপি দেশ পরিচালনার সুযোগ পেলো। দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয় পাওয়া বিএনপিকে স্মরণে রাখবে হবে- এটি দেশের মানুষের প্রত্যাশা, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ও অর্পিত দায়িত্বের ভার। রাষ্ট্র পরিচালনায় দলটির পূর্বে পাঁচ বারের অভিজ্ঞতা থাকলেও এবারের বাস্তবতা একদমই ভিন্ন। ফলে জনসাধারনের স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ হলে দেশ গভীর খাদে পড়বে। তাই সরকারি দলের সাথে বিরোধী দলগুলোকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। না হলে জনআকাঙ্খা পূরণ তো হবেই না বরং এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবে দেশ।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সরকারের প্রথম কাজ হবে। মানুষ প্রত্যাশা করে নিত্য পণ্যের দাম কমবে, বেকারত্ব হ্রাস পেয়ে কর্মসংস্থানের পথ তৈরি হবে। কিন্তু দেশের অর্থনীতিতে গত কয়েক বছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নতুন নতুন কর্মসংস্থানের পথ তৈরি না হওয়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি সহ নানা সমস্যা রয়েছে। অন্য দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী গত এক দশকে বাংলাদেশে বেকারত্ব বেড়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধির হার কমেছে ২ শতাংশ। আইএলওর সর্বশেষ তথ্যে বলা হয়েছে বাংলাদেশে বর্তমানে বেকারত্ব বাড়ার হার ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এদিকে প্রতি বছর চাকরি বাজারে প্রবেশ করছে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ কিন্তু চাকরি পাচ্ছে ২ লাখের কাছাকাছি। বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের তথ্যমতে, গত ছয় মাসে শুধু মাত্র শিল্প খাত থেকে ১০ লাখের মতো লোক কাজ হারিয়েছেন। এক গবেষণা দেখা গেছে বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই বেকার।
এদিকে, মব সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বাঁধা সৃষ্টি করছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৭ মাসে সারাদেশে ৪১৩টি গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন অন্তত ২৫৯ জন। এছাড়া, গত ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৫ জন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৯৭০ জন। (মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
এখন, বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে দেশকে মুক্ত করে দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের ভঙ্গুর অবস্থার উত্তোরণ করা।
এইচআরএসএসের তথ্যমতে, ২০২৬ এর নির্বাচনী সহিংসতার মোট ১৬২টি ঘটনার মধ্যে ৪০টিই ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ। এসব ঘটনায় দলটির ৩৩৪ জন নেতাকর্মী ও সমর্থক আহত হয়েছেন। তফসিল ঘোষণার পর থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে মোট ১৬২টি নির্বাচনী সহিংসতা ঘটেছে। তাই বিএনপি সরকারকে নিজের দল ও দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করে বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। এছাড়াও পণ্যের ন্যায্য মূল্য, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। না হলে অর্থনীতিতে গতি ফেরানো যাবে না।
বিএনপিকে এখনই দুর্নীতি মুক্ত দেশ, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে নজর দিতে হবে। এতে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে৷ দেশের সাফল্য, জনগণের কল্যাণ মোটাদাগে নির্ভর করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতার ওপর। দুর্নীতি মুক্ত পরিবেশ ও সকল ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে দেশ পরিচালনায় বিএনপি সফলতা দেখাতে পারবে। ২০২৫ সালের দুর্নীতি ধারণা সূচকে (সিপিআই) বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩ তম (টিআইবি)। ফলে দুর্নীতি যে আমাদের উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার মান পরিবর্তনের পথের প্রধান প্রতিবন্ধকতা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিএনপিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত ভাবে দাঁড়াতে হবে। দেশের প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচারব্যবস্থায় দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে জনগণ সুফল পাবে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ তরুণ প্রজন্ম। প্রতি বছর কয়েক লাখ শিক্ষিত তরুণ তরুণী শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। ফলে তাদের মধ্যে দক্ষতা বৃদ্ধি করে কর্মের ব্যবস্থা করা না গেলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব না। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা বড় চ্যালেজ্ঞ হবে নতুন সরকারের জন্য। বিএনপি সরকার উপজেলা পর্যায়ে স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, স্টার্টআপ সহায়তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রণোদনার মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক মানুষকে বেকারত্বের হাত থেকে মুক্তি দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বিদেশে শ্রমবাজারের সম্প্রসারণ ও রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনার সূচনা করেছিলেন। বিএনপিকেও দেশ বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে নজর দিতে হবে। এছাড়াও জলবায়ু ও কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদেশনীতি, টেকসই অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক কূটনীতি, রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনায়ন, আঞ্চলিক সহযোগিতা সহ সব ক্ষেত্রে নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সম্ভাবনার দিগন্তে বিএনপি…
বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ যতই থাকুক সম্ভাবনাও আছে বিস্তৃত। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বিরোধী দল ও বিশেষজ্ঞদের সাথে সংলাপ এবং সমঝোতার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে বিএনপি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি উন্নত বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে। কারণ দেশে জাতীয় ঐক্যের পরিবেশ সৃষ্টি না করতে পারলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকবে না যা উন্নয়নের পথে অন্তরায়। প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের গতি বাড়বে। বিরোধী দলকে সম্মান করে তাদের মতামতের গুরুত্ব দিতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলে সরকার নানা সমস্যার সমাধান করতে পারবেন। সমালোচনাকে ইতিবাচক ভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে বিএনপিকে। সকল বিষয়ে সহনশীলতা ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ করতে হবে। এতে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে যা বিএনপির সরকার পরিচালনার পথকে মসৃণ করবে। সমস্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে দেশ ও জনগণের উন্নয়নের কথা চিন্তা করে। যা জনসাধারণের মধ্যে বিএনপির প্রতি আস্থা বৃদ্ধি করবে।
বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দুর্নীতি দমন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রাষ্ট্র সংস্কারের। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি স্বাস্থ্য কার্ড, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, বেকার ভাতা, ৫ বছরে ১৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ১০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খনন এবং ডিজিটাল ইকোনমি চালুর কথা বলেছিলেন। এগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে বিএনপি জনগণের স্বপ্ন পূরণে সক্ষম হবে।
তবে মনে রাখতে হবে এবারের নির্বাচনে জনতার রায় বিএনপির জন্য একটি সুযোগ, কিন্তু সময় সীমিত। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিলম্ব, পূর্বের সরকারের মতো একতরফা নির্বাচন, দুর্নীতি ও নেতাকর্মীদের দায়িত্বহীন আচরণ মানুষের মধ্যে আস্থার ক্ষয় তৈরি করবে। তাই বিএনপিকে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন এনে পরিকল্পনামাফিক ন্যায়সংগত পদক্ষেপ নিতে হবে। সমস্ত রাজনৈতিক দল ও মতের সাথে নিয়ে বিএনপির এই নতুন সরকারের পথচলা হোক দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও উন্নয়নমুখী। জনগণের স্বপ্নের ভার কাঁধে নিয়ে বিএনপি হাঁটুক সফলতার পথে। মনে রাখতে হবে সরকার সফল হলেই মানুষের ভগ্যের পরিবর্তন ঘটবে। তাই বিএনপির পথ হারানোর কোনো সুযোগ নেই।
নতুন এই যাত্রায়, নতুন এই অধ্যায়ে — বিএনপির জন্য শুভকামনা থাকবে।
লেখক: অফিসার, ইউএস বাংলা মেডিকেল কলেজ, নারায়ণগঞ্জ