Friday 10 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

আমাদের বঙ্গবীর নবাব আলিবর্দী খান

নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলা
১০ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৫৩

নবাব আলিবর্দী খান ছিলেন নির্ভীক, ধর্মপরায়ণ ও নিরহংকার। নিজেকে আল্লাহর একজন সাধারণ বান্দা মনে করতেন। তিনি ছিলেন বিরল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। একবারের বেশি দু’বার তিনি কোনো কাজের নির্দেশ দিতেন না, এবং সেটাই প্রতিপালিত হত।

তার নওয়াবি আমল ভালো থাকায় জিনিসপত্রের মূল্য সহনিয় পর্যায়ে ছিল এবং প্রজাগণ মোটের উপর বলা যায় সুখে স্বাচ্ছন্দে বসবাস করত। এ কথা সব ঐতিহাসিকই স্বীকার করেন, নবাব আলিবর্দী খান ছিলেন একজন মহৎ হৃদয়ের ব্যক্তি। দুর্বল চারিত্রিক দোষ ও নিষ্ঠুরতা তার মধ্যে বিন্দুমাত্র ছিল না।

আলিবর্দী খানের বিনোদন ছিল তার পরিবার-পরিজন নিয়ে গঠিত অন্দর মহল আর প্রিয়জনদের নিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা। নবাব আলিবর্দী খুব অল্পতেই খুশি থেকে পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার কাছে নামাজ ও কোরআন পাঠ করে শুকরিয়া আদায় করতেন।

বিজ্ঞাপন

আরাম-আয়েশ, কোঠা-বাঈজী, মদ-নেশা এগুলো অসুন্দর জিনিষ থেকে তিনি হর হামেশা দূরেই থাকতেন। তিনি যৌবনকাল হইতে পবিত্র সুনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সফল শাসক এবং নির্ভীক যোদ্ধা। তিনি ছিলেন ধর্মভীরু এবং চরিত্রবান, যা তৎকালীন নবাব-বাদশাহগণের মধ্যে বিরল ছিল।

নবাব আলিবর্দীর দৈনন্দিন কর্মসূচি থেকে তার সুনিয়ন্ত্রিত জীবনের আভাস পাওয়া যায়। তিনি নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করতেন। আলিবর্দীর প্রকৃত নাম মীর্জা মোহাম্মদ আলি। আলিবর্দী খান মুঘল সম্রাট কর্তৃক সুবা বাংলার স্বাধীনতার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। আলিবর্দী খান সাহসী যোদ্ধা ও কূটনীতিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।

বিচক্ষণ ও শক্তিমান নবাব আলিবর্দি খান তার অন্যতম দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলাকে বিশেষ স্নেহের দৃষ্টিতে দেখতেন। সিরাজ সূতিকাগার থেকে নির্গত হলেই মাতামহের অনাবিল স্নেহের পরশ লাভ করেন এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে নিজের সান্নিধ্যে রেখেছিলেন। নবাব আলিবর্দী খান কিশোর বয়সের সিরাজের বুদ্ধিমত্তা ও শৌর্যবীর্যের প্রতি যথেষ্ট দুর্বল ছিলেন। আলিবর্দী তার নিজের নামানুসারে তারই ভালবাসার মানুষ…সিরাজের নাম রাখেন মীর্জা মোহাম্মদ।

গোলাম হোসেন তাবাতাবাই লিখেছেন যে, ‘নবাব আলিবর্দী খান শান্তিপ্রিয় ও প্রজাবৎসল নবাব ছিলেন। প্রজাদের শান্তি ও কল্যাণ নবাব আলিবর্দীর কাম্য ছিল এবং তার নবাবি আমলে প্রজারা এরূপ সুখ শান্তিতে ছিল যে, যেন তারা পিতা বা মাতার কোলেশায়িত আছে। জমিদাররা যাতে প্রজাদের উপর উৎপীড়ন না করতে পারে সেদিকে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছিল’।

নবাব আলিবর্দী খান পশুপাখি ভালবাসতেন। তাই ইউরোপীয়ানরা কেউ তাকে ভালো আরবী ঘোড়া উপহার দিয়েছেন, কেউ কাবলী বিড়াল,কাট বিড়ালী, খরগোস,ময়ূর, টিয়া, ময়না পাখি, বুলবুলি পাখি, কাকাতুয়া আনিয়ে দিচ্ছেন, কেউবা আফ্রিকা থেকে একজোড়া নতুন রকমের হরিণ আনিয়ে রাজধানীতে পাঠাচ্ছেন। নবাব নাকি খোলাখুলিই সকলকে উপদেশ দিতেন, টুপিওয়ালাদের দল ঠিক মৌমাছির মতো। আস্তে আস্তে চাপ দিলে তাদের কাছ থেকে খানিকটা মধু সংগ্রহ করা যায় বটে, কিন্তু খবরদার কেউ যেন তাদের চাকে হাত দিতে না যায়, তা হলেই ওরা হুল ফুটিয়ে দেবে।

বাংলার মসনদে সিংহ পুরুষ নবাব আলিবর্দী খান। বাংলা জুড়ে শুরু হয়েছে মারাঠা সেনা বা বর্গিদের আক্রমণ তাণ্ডব। বর্গীরা লুটপাট করে গ্রাম জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়ে পালাবার সময় নবাব আলিবর্দী খানের প্রতিরোধে নাস্তনাবুদ হয়।

মনে করা করা হয় বাংলার দুশমন বর্গীরা খুব দ্রুত গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে লুঠত সোনার বাংলা, তাই তাদের বর্গী বলা হতো। এই বর্গী দের উপদ্রপ শুরু হয়েছিল শিবাজী এর আমল থেকে।

মারাঠা অশ্বারোহী লুটেরা দল, যারা ‘বর্গী’ নামে পরিচিত ছিল, বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব আলিবর্দী খানের আমলে বাংলায় ধারাবাহিক লুটতরাজ ও আক্রমণ চালায়। নাগপুরের রঘুজী ভোঁসলের নেতৃত্বাধীন এই গোষ্ঠী বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ ও হুগলিসহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ, হত্যা ও ধর্ষণ চালিয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।

নবাব আলিবর্দী খান বীরত্বের সাথে লড়াই করে বর্গীদের দ্রুত গতির অশ্বারোহী বাহিনী-কে অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের শায়েস্তা করে বাংলায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব: এই ভয়াবহতার প্রেক্ষিতেই ‘খোকা ঘুমলো পাড়া জুড়ালো, বর্গী এলো দেশে…’ ছড়াটি জনপ্রিয় হয়। বর্গী আক্রমণ ঠেকাতে কলকাতার মানুষ বাঘবাজার থেকে নাতালি পর্যন্ত ৫ কিমি দীর্ঘ খাদ কেটেছিল, যা ‘মারাঠা ডিচ’ নামে পরিচিত। বর্গী শব্দটি মূলত মারাঠী শব্দ ‘বার্গীর’ (Bargir) থেকে এসেছে, যার অর্থ হালকা অশ্বারোহী সৈন্য।

তীব্র সংঘর্ষের পর বাংলার নবাব আলিবর্দী খান মারাঠাদেরকে বাংলা থেকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হন। বাংলা থেকে বিতাড়িত হয়ে মারাঠারা উড়িষ্যা আক্রমণ করে এবং দখল করে নেয়। কিন্তু নবাব আলিবর্দী ১৭৪২ সালের ডিসেম্বরে তাদেরকে সেখান থেকেও বিতাড়িত করেন।

তাইতো বাংলা জুড়ে তখন বীর দেশপ্রেমী নবাব আলিবর্দী খানের জয় জয় কার।

নবাব সকল ধর্ম বর্ণ গোত্রের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। তাইতো তার নবাবি আমলে সকল ধর্মীয় উৎসব পালন হতো হৃদয়ের বন্ধনে। ১০ এপ্রিল ১৭৫৬ ইং নবাব আলিবর্দী খানের আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমেছিলো সারা বংলা জুড়ে।

নিদারুন গ্রীষ্মের মধ্যেও নবাব মহল থেকে খোশবাগ পর্যন্ত অগণিত জনতা রাস্তার দুপাশে ভিড় করে থাকে,চার পাশের বাড়ি থেকে নবাবের শবাধারের ওপর ফুলের বৃষ্টি হলো। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেলো রাস্তার রাঙা মাটি। ছায়া শীতল খোশবাগে যখন নবাবের মৃত দেহ এসে পৌছালো তখন সূর্য পশ্চিম আকাশে নিরবে ঢলে পড়ছিল। আর ঘন বৃক্ষের অসংখ্য শাখা প্রশাখার আড়ালে সূর্য ঢাকা পড়ে যায় শোকের ছায়ায় চুপি চুপি।

১০ এপ্রিল বাংলার বীর দেশপ্রেমী নবাব আলিবর্দী খানের (জন্ম – ১৯ সেপ্টেম্বর ১৬৭৪ ইং; মৃত্যু – ১০ এপ্রিল ১৭৫৬ ইং) মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক: নবাব সিরাজউদ্দৌলার ৯ম রক্তধারা প্রজন্ম; সম্পাদক- সাপ্তাহিক পলাশী

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

সংসদের অধিবেশন শুরু হয়েছে
১০ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৪৯

নিয়োগ দিচ্ছে ফুডপান্ডা
১০ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২৫

আরো

সম্পর্কিত খবর