Wednesday 26 Feb 2025
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ধর্ষণ বৃদ্ধির কারণ এবং ধর্ষণ বন্ধের উপায়

ইমরান ইমন
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৮:৩৫

বর্তমানে ধর্ষণ দেশের আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। দিনদিন ধর্ষণ প্রবণতা বেড়েই চলছে। চারিদিকে বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়ছে ধর্ষণের মহামারি। পত্রিকার পাতা, টেলিভিশনের পর্দা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই সবার আগে ধর্ষণের খবর আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। বর্তমানে ধর্ষণ আমাদের জাতীয়জীবনে একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এটা বলা যায় যে, ধর্ষণ আমাদের দেশে একটি সর্বগ্রাসী অপরাধে পরিণত হতে চলছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সর্বশেষ (৩১ ডিসেম্বর, ২০২৪) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সারা দেশে ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে মোট ৪০১ জন নারী। এর মধ্যে ধর্ষণ‑পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন ৩৪ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ৭ জন। ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছেন ১০৯ জন। এর মধ্যে ধর্ষণের চেষ্টার পর হত্যা করা হয় ১ জনকে। আসক-এর তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ৪ হাজার ৭৮৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ২০২০ সালে এ পরিসংখ্যান ছিল ১ হাজার ৬২৭ জন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, ধর্ষণের পরিমাণ দিনদিন তুমুল বেগে বেড়েই চলছে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী চলন্ত বাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন দুইজন নারী। রংপুরে ২১শে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য ফুল সংগ্রহ করতে যাওয়া চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। গত দুইদিনে‌ দেশজুড়ে ১৭টি‌ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশে গড়ে প্রতি ৯ ঘণ্টায় একটি করে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত চার বছরে বাংলাদেশে প্রতিদিন অন্তত দুজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

কয়েকমাস আগে ব্যস্ততম নগরী ঢাকার ব্যস্ততম ফুটপাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ধর্ষিত হন, কয়েক সপ্তাহ আগে কুমিল্লার বাসে এক গার্মেন্টস কর্মীকে গণধর্ষণ করা হয়। তখন এদেশের অনেকেই যুক্তি দাঁড় করিয়ে বলেছিলেন- মেয়েটি একা ছিল, মেয়েটির পোশাক, কেন সে একা বের হল—এইসব কুযুক্তিপূর্ণ তকমা লাগিয়ে ধর্ষণের জন্য মেয়েটিকেই দোষী বানিয়েছিল।

তবে আজ মেয়েটি তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত কাছের মানুষ স্বামীর সাথে বেরিয়েও স্বাধীন দেশের বেশ জনবহুল একটি এলাকায় নিরাপদ থাকতে পারলো না। পারলেন না ধর্ষকদের লোলুপ হাত থেকে বাঁচতে। বিশ বছর বয়সী মেয়েটি স্বামীর সঙ্গে থাকা অবস্থাতেও গণধর্ষণের শিকার হলেন। এতক্ষণ যে ঘটনাটির বর্ণনা করা হলো, সেটি ইতোমধ্যে আপনারা বুঝে গেছেন।

কয়েকমাস আগে সিলেটে স্বামীর সাথে ঘুরতে বেরিয়ে গণধর্ষণের শিকার হন এক তরুণী। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে নিজগৃহে মধ্যযুগীয় কায়দায় এক গৃহবধূকে ধর্ষণ ও বিবস্ত্র করে মর্মান্তিকভাবে নির্যাতন করা হয় এবং সেটার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর পরে ঘটনাটি আলোচনায় আসে। জানা যায় ঘটনার সাথে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের “দেলোয়ার বাহীনি” জড়িত। এখন প্রশ্ন হলো- এ দেলোয়ার বাহীনি-ধর্ষকগোষ্ঠী এত সাহস ও শক্তি কোথায় থেকে পায়! এদের পৃষ্ঠপোষক কারা? কোন শক্তিবলে তারা ঘরের ভেতর ঢুকে একজন নারীকে ধর্ষণ ও অমানবিক নির্যাতন করার সাহস পায় এবং সেটার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাড়ে!

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধিত ২০২০) অনুযায়ী, আমাদের দেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড’। এমন কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও রীতিমতো একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেই চলছে। দিনদিন ধর্ষণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, আইনের সঠিক বাস্তবায়ন না হওয়া। এছাড়াও অন্যতম প্রধান কারণটি হলো- রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতার প্রভাব। অপরাধীরা তাদের রাজনৈতিক পরিচয়কে অস্ত্র ও শাস্তি ঠেকানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ পায়। তারা জানে পুলিশ, আইন, বিচার তথা প্রশাসন সবকিছুই তাদের অপরাধের আশ্রয়স্থল। তারা জানে যে এসব প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে দমিয়ে রাখা যাবে। তাই তারা অনায়াসে নির্ভয়ে নানা রকম অপরাধে যুক্ত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ধর্ষণের ঘটনাগুলোতে ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে জড়িত কিংবা ব্যক্তিবর্গ কিংবা ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা জড়িত থাকে।

‘কে আমার কি করতে পারবে, দেখি’, ‘আমি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবো, রাজনৈতিক ক্ষমতাসীন বলয়ের সঙ্গে আমার সংযুক্তি রয়েছে’- যেকোনো ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি কিংবা ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের এমন মনোভাব সম্পর্কে আমাদের কারোরই অজানা নয়। আর এমন আগ্রাসী মনোভাবই অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়া যায়- এমন বাস্তবতা থেকে অপরাধীরা অপরাধকর্মে লিপ্ত হয়। এটা শুধু পেশাদার অপরাধীদের ক্ষেত্রে নয়, যেকোনো সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। কেননা তার শাস্তির ভয় নেই! একটার পর একটা ধর্ষণের খবরের সমান্তরালে যদি একটার পর একটা ধর্ষণেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির খবর শোনা যেত তাহলে দেশে ধর্ষণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমতে থাকত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কোনো আমলেই একটিও ধর্ষণ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয়নি। ধর্ষণের আইনে (সর্বশেষ সংশোধিত) মামলার বিচারকার্য শেষ করতে সর্বোচ্চ ১৮০ দিন বা ছয় মাসের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা কখনো কার্যকর হয়নি।

মানুষের আইন মানার প্রধান কারণ হলো শাস্তির ভয়। আর এর ফলে মানুষ নিজেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে ভয় পায়। কিন্তু মানুষ যখন দেখে সে অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে, তাকে কোনো বিচার বা শাস্তির সম্মুখীন হতে হচ্ছে না, তখন সে আর কোনো আইনকে তোয়াক্কা করে না, তার মাঝে কোনো শাস্তির ভয় থাকে না। আর তখনই অপরাধ দুর্বার বেগে বেড়ে চলে।

দেশে বর্তমানে ধর্ষণ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া এর জ্বলন্ত উদাহরণ। এমনিতে এদেশে বেশিরভাগ ধর্ষণের ঘটনা লোকলজ্জা আর সামাজিকতার ভয়ে আড়ালে থেকে যায়। একটা ধর্ষণেরও যদি দৃষ্টান্তমূলক বিচার হতো তাহলে দেশ থেকে ধর্ষণের ভয়াবহতা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও উল্লেখযোগ্য হারে কমতো।

ধর্ষকের বিশেষ কোনো পরিচয় নেই। ধর্ষক যেই হোক বা যেকোনো রাজনৈতিক দল-মতের হোক না কেন, ধর্ষকের পরিচয় সে ধর্ষক। ধর্ষকের শরীর থেকে প্রথমে রাজনীতির পোশাকটি খুলে ফেলতে হবে। তারপর তার অপরাধের জন্য দীর্ঘসূত্রীতা পরিহার করে অল্প সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তি প্রদান করতে হবে যাতে পরবর্তী কেউ শিক্ষা নিতে পারে এবং অপরাধ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারে।

বাংলাদেশের সংবিধানে কঠোর আইন রয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে। দেখা যায়, আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। তাই আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে রাষ্ট্রযন্ত্রকে তৎপর হতে হবে। আইন প্রয়োগে সব আইনি জটিলতা পরিহার করতে হবে। সাম্প্রতিককালে দেশজুড়ে ধর্ষণের ঘটনায় আমাদের নারীসমাজ একটা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকারকে ধর্ষণের লাগাম টেনে ধরতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি, ধর্ষণ প্রতিরোধে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট

সারাবাংলা/এএসজি

ইমরান ইমন ধর্ষণ বৃদ্ধি মুক্তমত

বিজ্ঞাপন

সাংবাদিক মোস্তফা কাজলের দাফন সম্পন্ন
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ২২:১১

আরো

সম্পর্কিত খবর