রাজধানীজুড়ে জেঁকে বসেছে মশার উপদ্রব। সন্ধ্যা নামার আগেই মশার ঝাঁক হানা দিচ্ছে বাসাবাড়ি, অফিস ও খোলা জায়গাগুলোতে। সকাল হোক বা রাত, মশার কামড় থেকে নিস্তার নেই কারও। ঘরে বাইরে সর্বত্রই মশার দাপট। এমনকি, রাজধানীতে মশার ঘনত্ব এতটাই তীব্র হয়েছে যে একজনকে ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ৮৫০ বার মশা কামড় দিতে উদ্যত হয় বলে সম্প্রতি এক গবেষণায়ও উঠে এসেছে। আর এসংক্রান্ত সামগ্রিক বিষয় নিয়ে সারাবাংলার স্টাফ করেসপন্ডেন্ট মেহেদী হাসানের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগে. জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী। সেই সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো-
সারাবাংলা: মশা নিয়ন্ত্রণে ফগার মেশিন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা আছে যে, এতে মশা মরে না?
ইমরুল কায়েস চৌধুরী: এটা সত্য কথা ফগার মেশিনে মশা মরে না। খোলা জায়গায় ফগার মেশিন ব্যবহার করা হয় তখন মশা উড়ে যায়। তখন ৫০ শতাংশ মশা মারা যায় না। এটা আসলে খুব কার্যকর না। ধোঁয়া না উড়লে মানুষ মনে করে, আমরা কাজ করছি না বা আমাদের কাজ দেখা যাচ্ছে না। এ জন্য আমরা ফগার মেশিন ব্যবহার করি। কোথাও কোথাও ফগার মেশিন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু সত্য ও কিছু মিথ্যা; বড় হল রুম, ড্রেন বা আবদ্ধ কোনো জায়গায় ফগার মেশিন ব্যবহার করা হলে সেটাতে মশা মরে। সবচেয়ে ইফেক্টিভ হলো লার্ভিসাইড। এটা সকালবেলা স্প্রে করে, নীরবে স্প্রে করা হয়। আবারও বলছি ফগার মেশিন খুব একটা ইফেক্টিভ না। আবার প্রতিদিন কিছু মশা প্রাপ্ত বয়স্ক হচ্ছে সেটা আবার লার্ভিসাইড দিয়ে মারা যাবে না। কম্বিনেশনটা দরকার।
সারাবাংলা: যেসব ওষুধ মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হয় সেগুলো ইফেক্টিভ কিনা?
ইমরুল কায়েস চৌধুরী: মশা নিয়ন্ত্রণে যতরকমের পদ্ধতি আছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন সব প্রয়োগ করছে। আমরা যে ওষুধ দিই, সেটা তিনটা প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরীক্ষা করা। বছরে দুই থেকে তিনবার পরীক্ষা করা হয়। এখন পর্যন্ত কোনো পরীক্ষাতেই বলেনি যে, ওই ওষুধটি কার্যকর না। কোনোটায় ৯৮ বা ৯৯ ভাগ ইফেক্টিভ থাকে। তাহলে আমরা কেন বলব, ওষুধ নিয়ে সন্ধেহ আছে। ওষুধে কোনো সমস্যা নাই। সমস্যা হলো একটাই, এত বড় শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যদি ঠিক করা না যায় তাহলে বাস্তবতা হলো আসলেই মশার সমস্যা সমাধান করা কঠিন। যে পয়জনটা সারা দুনিয়াতে ব্যবহার হয় মশা মারার জন্য, আমরাও সেটাই ব্যবহার করছি। এটা যদি মশার গায়ে না লাগে তাহলে কিন্তু মশা মরবে না। এটাকে গায়ে লাগাতেই হবে। এত বড় বড় যে ড্রেন, তাতে মশার গায়ে লাগানো সম্ভব না।
সারাবাংলা: মশা একেবারে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কিনা?
ইমরুল কায়েস চৌধুরী: মশা একেবারে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এই শহরের যদি একটা সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাপনা থাকতো, এই শহরে জলবদ্ধতা যদি নিরসন করা যেত, এই শহরের নাগরিক সবাই মিলে যদি সচেতন হতাম, আমাদের নিজের নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে জানতাম তাহলে সম্ভব হতো। অন্যথায় কখনওই সম্ভব না।
সারাবাংলা: মাঠ পর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের লোকজনকে কাজ করতে দেখা যায় না- এই অভিযোগের বিষয়ে আপনি কী বলবেন?
ইমরুল কায়েস চৌধুরী: আমার ১১০০ জন মানুষ মাঠে কাজ করে। এখন দেখা যাবে কাদের- যারা প্রমিনেন্ট, বিশাল বড় কোনো একটা ইভেন্ট করেন, তাহলে দেখা যাবে। কিন্তু আমার যে মশক কর্মীটা একটি গলি বা রাস্তায় বা একটি মহল্লায় সেখানে তারা দু’জন মাত্র যাবে। কারণ, হচ্ছে প্রত্যেকটা ওয়ার্ডকে আমরা অনেকগুলো ব্লকে ভাগ করি। প্রত্যেকটা ব্লকের দু’জন করে কাজ করবে। কোনো সাউন্ড ছাড়া তারা নীরবে-নিভৃতে মশার ওষুধ স্প্রে করে যাচ্ছে। আপনি কখনোই টের পাবেন না, দেখবেন না। যদি ধোঁয়া হতো, তাহলে সবার চোখে পড়ত। ওই এলাকায় সে কিন্তু প্রতিদিন যাবে না, তারা সপ্তাহে দু’দিন যাবে। কারণ, মশার যে লাইফ সাইকেল সেটা দেখেই কিন্তু সাইন্টিফিক্যালি দু’বার স্প্রে করা হয়। কারণ, মশাটা লার্ভা থেকে এডাল্ট হতে মাঝখানে তিন চার দিনের একটা গ্যাপ থাকে।
সারাবাংলা: প্রতিনিয়ত ডোবা ও খাল পরিষ্কার করতে হচ্ছে। এত ময়লা কোথা থেকে আসে?
ইমরুল কায়েস চৌধুরী: ডিএনসিসিতে প্রায় নয় হাজার বিঘা জলাশয় আছে। বিমানবন্দরের আশেপাশে শত শত বিঘা জলাশয় আছে। সেই জলাশয়গুলো আপনি পরিষ্কার করে আরেকটা জায়গায় যান, দেখবেন ২০ থেকে ২৫ দিন পর সেটি ফের ভর্তি হয়ে গেছে। একটি নালা পরিষ্কার করে তিনদিন হতে না হতে আবার ভরে যায়। আমরা ন্যামঝিল পরিষ্কার করেছি একদম ঝকঝকে করা আছে এখন, ২০ থেকে ২৫ দিন পর দেখবেন ন্যাজিলের কি অবস্থা। টিএনটি বস্তির টিএনটি ঝিলের অবস্থা এরকম যে ময়লা জমতে জমতে যে কি অবস্থা হয়েছে। এই টিএনটি ঝিলের মশাটাই বনানী গুলশানে আসতেছে। পুরো খালে যদি কীটনাশক ঢেলে দিতে পারেন তাহলে হয়তো কাজ হবে। কিউলেক্স মশাটা মূলত এসব খাল বিলে জন্মে। কিউলেক্স মশাটা কামড়ায়, যন্ত্রণা বাড়ায়, কিন্তু রোগ ছড়ায় না তেমন। আমাদের হিসাবে ৩০ ভাগ মানুষ বস্তি বা ইনফরমাল সেটেলমেন্ট থাকে। তারা ঘর থেকে বের হলেই ডোবা, ওই ডোবার মধ্যে এসে ময়লাটা ফেলে। আর আবাসিক এলাকাগুলোতেও এমন অবস্থা।
সারাবাংলা: বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আপনারা কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা পেয়েছেন বা পাচ্ছেন?
ইমরুল কায়েস চৌধুরী: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সিটি করপোরেশন ওইভাবে নাগরিকদের নিয়ে করতে পারছে না। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে স্টিলের স্ট্রাকচারের মধ্যে রাস্তার পাশে যেখানে ময়লা রাখার কথা, সেখান থেকে আমিন বাজারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সিটি করপোরেশনের কাজ। কিন্তু বাসা থেকে রাস্তার পাশে স্টিলের স্ট্রাকচার পর্যন্ত ময়লা আনা বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক লিজ দেওয়া হয়। এটা এলাকাভিত্তিক মাস্তানরা বা পলিটিক্যাল লিডাররা করে। ওটা যদি আমরা করতে পারতাম দায়িত্ব নিয়ে। চেষ্টা করা হয়েছিল ৫ আগস্টের পরে, কিন্তু সম্ভব হয়নি।
সারাবাংলা: স্বেচ্ছাসেবকদের কাজে লাগিয়ে কোনোভাবে মশা নির্মূলে ভূমিকা রাখা যায় কিনা?
ইমরুল কায়েস চৌধুরী: ডেঙ্গুর সময় আমরা ব্র্যাক বা অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যারা আছে, তাদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে পারছিলাম। লিফলেট বিতরণ, বাড়ির প্লাস্টিকের জিনিস সরানো, ফুলের টপ সরানো, যেখানে গাড়ি ধোয়া হয় বেজমেন্টে, পানির মিটার যেখানে থাকে সেখানে ট্যাবলেট দেওয়া এগুলো আমরা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দ্বারা করাই। কিন্তু এখন যে কিউলেক্স মশাটা, সেটা কিন্তু বাচ্চাদেরকে নিয়ে বা কলেজ ইউনিভার্সিটির তরুণ যারা আছে তাদের নিয়ে করা যায় না। কারণ, এটায় প্রফেশনাল লোক লাগবে। আপনি একটা ময়লার গাদা মানে, একদম থকথকে ময়লা, মানুষের মলমূত্র, পচা জিনিস, দুর্গন্ধযুক্ত জিনিস- এতে আপনি তাদের নামাতে পারবেন না। সেফটি সিকিউরিটি হেলথ কনসার্নের বিষয় আছে।
সারাবাংলা: বাংলাদেশের মানুষ হলো তাদের জরিমানা না করলে কখনও সচেতন হয় না, এটি কীভাবে দেখছেন?
ইমরুল কায়েস চৌধুরী: এটা একদম ঠিক বলছেন। জরিমানা করার ব্যাপারে ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত ছয়জন ম্যাজিস্ট্রেট ছিল আমাদের। ৫ আগস্টের পর আমরা বহুবার চিঠি লিখেছি, বহু কেস টেক আপ হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মিটিংয়ে আমি এই পয়েন্টটা তুলছি ম্যাজিস্ট্রেট দেওয়ার জন্য। কিন্তু তখন প্রশাসন থেকে ম্যাজিস্ট্রেট দেওয়ার মতো ছিল না। আমরা এরপরে চেষ্টা করছি পুলিশ দিতে, কিন্তু গত ডিসেম্বর পর্যন্ত পুলিশও দিতে পারেনি। আনসার দিয়ে চালানোর চেষ্টা করেছি, তাদের আসলে সেই অথরিটি ছিল না।