ঢাকা: একজন সরকারি কর্মকতা সংবিধানের দোহাই দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে জিয়াউর রহমানের নাম বলতে অস্বীকার করে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছেন। তার এই ধরনের আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যেখানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীতার ঘোষক বলা হচ্ছে এবং এটা অনেকটাই সেটেল্ড ইস্যু। সেক্ষেত্রে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা আক্তারের আচরণ রাষ্ট্রের জন্য হুমকি স্বরূপ। একজন সরকারি কর্মকর্তার এই ধরনের আচরণ বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।
গত ১৬ বছর দেশে যতধরনের অগণতান্ত্রিক কাজ হয়েছে তার সঙ্গে একশ্রেণির অতিউৎসাহী আমলা তথা সরকারি কর্মকর্তারাই সবচেয়ে বেশি জড়িত ছিলেন । বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আমলাদের কাঁধে বন্দুক রেখে বহু অগণতান্ত্রিক কাজ করা হয়েছে। আমলারা সে সময় সংবিধানের বিষয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেননি। বরং, কীভাবে অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতায় থাকা যায় তার অন্যতম কুশীলব ছিলেন এই আমলারা। যাদের একটা বড় অংশ এখনও প্রশাসন চালাচ্ছেন। বিগত সময়ে দিনের ভোট রাতে করার মূল কারিগর ছিলেন প্রশাসন তথা সরকারি কর্মকর্তারাই। প্রশাসনের কাঁধে ভর দিয়েই গত ফ্যাসিস্ট সরকার মিথ্যা ও গায়েবি মামলা, গুম, খুন, নির্বিচারে আটক, সভা-সমাবেশে বাধা প্রদানসহ সবধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন তৎকালীন প্রশাসন।
বর্তমানে সেই আমলাদের বড় অংশই প্রশাসনে রয়েছেন এবং বোল পালটিয়েছেন। অথচ জাতির দুর্ভাগ্য, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে কোনো আমলাকে বলতে দেখা যায়নি যে, দিনের ভোট রাতে আয়োজন সংবিধানে নেই। অথবা কোনো নাগরিককে যখন কেবলমাত্র ভিন্ন দল ও ভিন্ন মতের কারণে গুম করা হয় কিংবা আটক করে আয়না ঘরে রাখা হয়, তখন কোনো কর্মকর্তা বলেননি এটা সংবিধান পরিপন্থী, আমরা এটা করতে পারি না। কিংবা লাখ লাখ বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীর নামে যখন মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দেওয়া হয়, আটক করে আয়না ঘরে রাখা হয়, তখন প্রশাসনের কেউ বলেননি, আমরা এই অন্যায় তথা সংবিধানবিরোধী কাজ করব না।
বিগত আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে ২০১৪ সালে বিনা ভোটে সরকার গঠন, ২০১৮ সালের রাতের ভোট ও ২০২৪ সালে ডামি ভোটের অন্যতম কুশীলব ছিলেন এই সরকারি কর্মকর্তারা। তখন প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেননি, সংবিধান বিরোধী এসব অপকর্মের দায় আমরা নেব না। বরং, তারা হাততালি দিয়ে এসব অপকর্মের সহযোগী হয়েছেন। সেইসঙ্গে কীভাবে অপকর্মগুলো নির্বিঘ্নে করা যায় তা গত ১৫ বছর সাপোর্ট দিয়ে গেছেন। আওয়ামী লীগ সরকার প্রশাসনের জোরে ক্ষমতা দখল করেছিল, সে সময় কোনো আমলা সংবিধান নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেননি। কিংবা ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে নিরীহ আলেম-ওলামাকে বিদ্যুৎ বন্ধ করে গণহত্যা চালিয়েছে, শত শত যুবককে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করেছে, তখনও এই আমলারা কোন প্রশ্ন তোলেননি।
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে যখন জোর করে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়, তখনও সহযোগী ছিল প্রশাসনের কর্মকর্তারা। শুধু তাই নয়, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কিংবা জুলাই গণঅভ্যুথানে যখন হাজার হাজার ছাত্র জনতাকে হত্যা করা হয়, তখনো এই প্রশাসন সংবিধানের কথা ভুলে গিয়েছিল। এখন যখন ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা আক্তার জিয়াউর রহমানকে সংবিধানের কথা বলে স্বাধীনতার ঘোষক বলতে অস্বীকার করেন, তখন এটা আর সংবিধানের বিষয় থাকে না। এটা তার বিগত সরকারের প্রতি আনুগত্য ছাড়া আর কিছু না। তিনি এই প্রশ্ন তুলে বিগত সরকারের ইচ্ছামাফিক সংবিধান পরিবর্তনকে সমর্থন করছেন। এটা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। সুতরাং, বিগত দিনে তার কর্মকাণ্ডকে খতিয়ে দেখা উচিত।
আমরা দেখেছি, বিগত সরকার ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত সত্যগুলোকে বারবার টেনে এনে জনগণকে বিতর্কের মধ্যে আটকে রাখতে চেয়েছিল মূলত নিজেদের অপকর্ম আড়াল করতে। আমাদের সমস্যা অনেক, গণতন্ত্রের নতুন অগ্রযাত্রায় সেই পুরানো বিতর্কে আটকে থাকার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের সামনের দিকে তাকাতে হবে। সামনে যাওয়ার জন্য ইতিহাসের বিকৃতি যাতে কেউ করতে না পারে সেদিকেও সজাগ থাকতে হবে।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী, গণহত্যার সহযোগী কারা ছিল- এইসব বিষয়গুলো ঐতিহাসিকভাবে সেটেল্ড। কিন্তু বিষয়গুলো নিয়ে বারে বারে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে মূলত রাজনৈতিক কারণে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা, গবেষণা করা এককথা আর উল্লিখিত সেটেল্ড বিষয় নিয়ে উদ্দেশ্যমূলক বিতর্ক সৃষ্টি করা এক নয়। এই বিতর্ক থেকে কোনোভাবেই যেন আমরা বের হতে পারছি না। রাজনীতিকদের পাশাপাশি দেশের বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশ এবং শিক্ষিত সচেতন অংশও ইস্যুগুলোতে বিভক্ত। বিশেষ করে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে সবচেযে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে আওয়ামী লীগ। শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ইতিহাস বিকৃতি করতেও তারা ছাড়েনি। শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে টনকে টন বই লেখা হয়েছে ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে, পাঠ্যপুস্তক বার বার পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলাফল হচ্ছে, তাদের ওই বয়ান নতুন প্রজন্ম গ্রহণ করেনি। এর প্রমাণ ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান। মাঝখান দিযে ভাড়াটে বুদ্ধিজীবীরা নিন্দিত হয়ে আছেন।
এবার মাঠে আওয়ামী লীগ নেই, কিন্তু বিতর্ক থেমে নেই। এবারের বিতর্ক উসকে দিতে ভূমিকা রেখেছেন ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা আক্তারের এ সংক্রান্ত একটি বক্তব্য। স্বাধীনতা দিবসের আলোচনায় খাদিজা আক্তার স্বাধীনতার ঘোষকের নাম তিনি উল্লেখ করেননি। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন,‘আমরা প্রজাতন্ত্রের দায়িত্ব পালন করি। সরকার ও আইন যেভাবে বলবে, সেভাবেই আমরা দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করি। স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে সংবিধানে অন্য একজনের নাম রয়েছে, সেটা আগে পরিবর্তন করতে হবে।’
আমরা যদি একটু পেছনে ফিরে তাকাই তাহলে দেখব, ১৯৪৭ সাল থেকে পরবর্তী ২৪ বছরের ধারাবহিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অনেকে থাকলেও নেতৃত্ব দানকারী ভূমিকায় ছিল দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও দলটির নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। এটা ঐতিহাসিক সত্য। এটাও সত্য যে, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান অখণ্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছেন; এতে ভুল কিছু নেই। কিন্তু জনআকাঙ্ক্ষা এরই মধ্যে অনেক অনেক দূর এগিয়ে যায়, সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার জন্য টগবগিয়ে ফুটতে থাকে। আর সেটা অনিবার্য করে তোলে ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যার কারণে।
২৫ মার্চ পাকস্তানি আর্মির হাতে বন্দি হওয়ার আগে শেখ মুজিবুর রহমান কোন বিবেচনায় স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি, বা দিয়ে যেতে পারেননি তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু এটাও সত্য যে, ২৫ মার্চ গণহত্যার চাপিয়ে দেওয়ার পর পুরো জনগণ যখন দিশাহীন তখন কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা সাধারণ জনগণ একটা নির্দেশনা পায় এবং তারা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রকৃত পক্ষে জিয়াউর রহমানের ঘোষণার পর সাধারণ মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। জিয়াউর রহমানের ওই ঘোষণা অস্বীকার করার অর্থ হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা।
আওয়ামী লীগ ইতিহাসের এই সত্যকে মুছে দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘোষক বানাতে গিয়ে হাস্যকর সব যুক্তি ও গালগল্পের জন্ম দিয়েছে। এতে করে শেখ মুজিবুর রহমানকে বড় করতে গিয়ে প্রকারন্তরে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের নেতারা জিয়াউর রহমানকে নিয়ে নানা ধরনের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু জনগণ সেসব বক্তব্য গ্রহণ করেনি।