কথায় আছে বাঙ্গালী সর্বভুক জাতি। যা পায় তাই খায়। মাগনা পেলে আলকাতরাও খায়। পরের ধনে পোদ্দারি করে। পরের চড়কায় তেল দেয়। চান্স পেলেই ওয়াজ-নসীহত করে। আরো কত কি করে! মল-মূত্র ত্যাগ ছাড়া বাঙ্গালী স্বেচ্ছায় কোন ত্যাগ করতে জানে না। উচ্ছন্নে গেছে যে সন্তান তাকেও ত্যাজ্য করতে এখন আর সাহস পায় না। আগে পেত। মোটকথা ত্যাগের বিষয়টা বাঙ্গালীর ধাতে নেই। বিত্তবানরা আগে দান খয়রাত করত। এখনও করে, তবে অন্যের গলা টিপে, বুকে ছুরি মেরে, রাহাজানি করে, ছলে-বলে-কৌশলে প্যাঁচে ফেলে। এভাবে যা কামাই-রোজগার করে তা থেকে সামান্য কিছু দান করে বাকি প্রায় পুরোটাই লকারে ভরে রাখে, বিদেশে স্থানান্তর করে।
ধর্মে-কর্মে বাঙ্গালী যতটা না শুদ্ধ তার চেয়ে বেশি পরিশুদ্ধ লোক দেখানো কর্মে। তাই আমাদের ব্যাক্তিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে না আছে ধর্ম না আছে কর্ম। সবাই ভাসা ভাসা জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। দেশের বেশিরভাগ লোক হতাশাগ্রস্ত। কিছু লোক উদ্ভ্রান্ত। কিছু লোক নেশাগ্রস্ত। কিছু প্রজাপতির মত উড়ন্ত। প্রজাপতি শ্রেণির এই কিছু সংখ্যক লোকই নিয়ন্ত্রণ করছে জীবনোপকরণের সকল খাত। অধিকারে নিয়ে নিচ্ছে সরকারি-বেসরকারি-ব্যাক্তি খাতের সহায়-সম্পত্তি।
গত তেপ্পান্ন বছরে অনেক কিছু বেড়েছে আবার অনেক কিছুই কমেছে। যা বেড়েছে তা ক্রমান্বয়েই বাড়ছে। আর যা কমেছে তা বাড়তে পারত। পাহাড় কাটা নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে, পাহাড় ও এর উপরস্থ সম্পদের আকার উত্তরোত্তর কেবলই কমছে। প্রশাসন কি অসহায়, নাকি জিম্মি কোন বিশেষ গোষ্ঠীর কাছে? নাকি রাজনীতি তাদের নিয়ন্ত্রিত বালকের মত আচরণ করতে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে। নাকি তারাও গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে তাল মিলিয়েছে আর সুখ পেয়েছে এই ভেবে যে, জো আপসে আতা হায় ও হালাল হায়। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অজস্র কথা হয়। মিডিয়া রিপোর্ট করে, ছবি দেয়, তফশীল দেয় তারপরেও পাহাড় কাটা বন্ধ হয় না। বরং তা কাটার বেগ আরো বাড়ে। প্রশাসন বলে কেউ লিখিত দেয় নি, পুলিশ বলে তাদের কাছে কোন অভিযোগ বা নির্দেশ নেই। বন বিভাগ বা পরিবেশ অধিদপ্তর হয়ত দায়ছাড়া গোছের চিঠি চালাচালি করে। কার্যত কিছুই হয় না। পাহাড় ও তার সম্পদ লুটেরাদের দাপটে দিনে দিনে হতশ্রী হচ্ছে প্রকৃৃতি।
পাহাড়, বন গেছে যেপথে নদী-নালা-খাল-বিল-জলাশয়ও গেছে সেই পথে। কত লেখালেখি, কত টক শো, কত বাহাস, কত রিপোর্টিং, কত কত প্রকল্প, তার কত হাজার – লক্ষ- কোটি বাজেট কিছুই কাজে লাগে নি। নদী বাঁচাতে নদী রক্ষা কমিশন হলো, দিস্তা দিস্তা কাগজে অসম্ভব সব ভালো ভালো কথা লেখা হলো। সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, মাঠ পর্যায়ে স্টেক হোল্ডার মিটিং কত কি হলো। নদী কিন্তু আরো সরু হলো, খাল গুলো ভরাট হলো, নালা গুলো কারা যেন বুঁজে দিলো? যা কিছু হলো তা চোখের সামনেই হলো, ঢাক ঢোল পিটিয়েই হলো। প্রশাসন বলে পুলিশকে বলা আছে। পুলিশ বলে পরিবেশের লোকদের কথা আর কাজের ঠিক নেই। পরিবেশের লোকেরা বলে ভূমির লোকেরা চাহিদা মত কাগজ, নকশা, রেকর্ড দেয় না। ভূমির লোকেরা বলে কেউ তাদের কাছে কিছু চায় নি। চাইলে তারা প্রস্তুত চাহিবা মাত্র সরবরাহ করতে। গোলক ধাঁধাঁয় নদীর মেদ কমে, স্লিম হয়ে অপরূপা হয়। সরকারি লোকদের আরো বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজন হয়। বাজেট আসে বাজেট যায়, জীবনানন্দের রূপসী বাংলার নদীর কটিদেশ আরো প্রায় জিরো ফিগারে পরিণত হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোটি টাকার নতুন প্রকল্প হচ্ছে, পাশ হলেই নদী আবার আগের শরীর কাঠামো ফিরে পাবে। সেটা কবে? উত্তর সবার জানা: একদিন নিশ্চয়ই হবে।
একই প্রক্রিয়ায় সরকারি ভূমির অনেকখানি ভাগেযোগে ভূঁইফোড়দের রেকর্ডে। ভূমি অফিস এসএ, সিএস, আরএস ইত্যাদি কঠিন সব অস্পষ্ট কাগজ পত্র, আর ততোধিক জটিল আইন কানুন তুলে ধরে ম্যাগনিফাইং গ্লাসের নিচে ফেলে কিসব অবোধ্য ভাষায় মতামত দেয় কেউ তা বুঝে না। এতসব সরকারি রক্ষক-সংস্থা থাকতেও পাহাড়-বন উজাড় হচ্ছে, নদী-নালা-খাল-বিল স্লিম হচ্ছে আর কামেলিয়েরা কোরবাণীর পশুর মত মোটা তাজা হচ্ছে। অবশিষ্ট ছিলো পাথর। সেটাও এখন কারা যেন প্রকাশ্য দিবালোকে খেয়ে ফেলেছে।
মান্না দে’র কালজয়ী একটা গানের কথা মনে পড়ে গেলো: ‘যদি কাগজে লেখো নাম, কাগজ ছিঁড়ে যাবে। পাথরে লেখো নাম, পাথর ক্ষয়ে যাবে। হৃদয়ে লিখো নাম, সে নাম রয়ে যাবে’। মান্না দে বেঁচে থাকলে গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারকে হয়ত বলতেন এর লেটেস্ট ভার্সন লিখতে। সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশে জগদ্দল পাথরও হাওয়া গেছে। আগে সাগর চুরি, পুকুর চুরির কথা শুনেছি। কিন্তু পাথর চুরির কথা শুনিনি। এটাও দেখার ও শোনার বাকি ছিলো। এক জনমে আর কত কি দেখবো? অথচ সেখানে প্রশাসন ছিলো, পরিবেশের বিভাগীয় অফিস ছিলো, থানা-পুলিশ ছিলো, আইন-আদালত ছিলো। শুধু কারো প্রচেষ্টা ছিলো না। প্রশাসন বলে তারা হেনতেন করেছে। পুলিশ যা বলে তা কেউ বিশ্বাস করে না বরং তা নিয়ে হাসাহাসি করে। পরিবেশের লোকদেরকে পাবলিক খুঁজেও পায় না। এ হেন সময়ে পরিবেশ উপদেষ্টা বোমা ফাটালেন। তিনি নাকি শত চেষ্টা করেও পাথর রক্ষা করতে পারলেন না। মিডিয়া তার বক্তব্য সচিত্র হাইলাইট করলো। নেটিজেনরা তাকে তুলোধুনো করে ছাড়লো। অনেকেই মুখরোচক ট্রল করলো, রীল বানালো। কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা নানারূপ কন্টেন্ট বানিয়ে ফেললো, টক শো তার নজরকাড়া টপিক পেয়ে গেলো। এরূপ গেলো গেলো অবস্থায় প্রশাসনের বৈঠক বসলো। গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত হলো, যেমনটা হয়ে আসছে আবহমান কাল থেকে। এর মধ্যে আদালত থেকে চমৎকার এক সৃজনশীল সিদ্ধান্ত এলো: চুরি যাওয়া পাথর এক সপ্তাহের মধ্যে ফেরত দিতে হবে। আদালতের আদেশ শিরোধার্য। তাই যৌথবাহিনি নামলো। সেই রাতেই চল্লিশ হাজার ঘনফুট উদ্ধার করা হলো। আরো উদ্ধার করা হচ্ছে বিভিন্ন স্থান থেকে। শেষতক কত লক্ষ কোটি ঘনফুট ফেরত জমা হবে তা দেখার অপেক্ষায় সবাই। পাথর শূণ্য জলাভূমি নিয়ে ইদানীং খুব লেখালেখি হচ্ছে। এটা পজিটিভ দিক। কতদিন চালু থাকবে কে জানে?
পরিবেশ উপদেষ্টার হতাশা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু পাবলিকলি তার এ জাতীয় হতাশার কথা মোটেই স্বাভাবিক না। এটা ঠিক যে, পাথর খোয়ার মত এত বিস্ময়কর ব্যাপারে তার নাম অনাগতকালের জন্য জড়িয়ে গেছে। যদিও তিনি বলেছেন পাথর তার মন্ত্রণালয়ের বিষয় না। মনে পড়ছে, দায়িত্ব নেওয়ার পরেই তিনি গত বছরের ১ লা অক্টোবর থেকে পলিথিন নিষিদ্ধ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। কিছু কিছু বিক্ষিপ্ত অভিযানও দেখা গিয়েছিলো। তারপর তার কথা বিশাল শূণ্যতারই প্রতিধ্বনি করেছে বারবার। এরপর তিনি গাছের দেহে ঠুকা পেড়েক উৎপাটনে বদ্ধপরিকর হয়ে কিছু দৌড়ঝাঁপ করলেন। গাছের প্রাণ আছে। তার দেহে পেড়েক ঠুকলে তার ব্যাথা হবে এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সত্য। তার এই উদ্যোগে আমরাও বৃক্ষকূলের সাথে আশান্বিত ছিলাম। কিন্তু সেটাও আজ স্থবির। গাছের প্রাণ আছে, ভাষা নেই। তাই তার প্রতিবাদ আমাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। কিন্তু উপদেষ্টার এই উদ্যোগ, অন্তর্বতীকালীন অস্থির সময়ে, কতটা সময়োপযোগী ছিলো বা তা বাস্তবায়নে জনগণকে সম্পৃক্ত করায় তার কতটা আন্তরিকতা ছিলো তা নিয়ে পাবলিকের মনে প্রশ্ন থাকার যথেষ্ট কারণ আছে। সব কিছু ছাপিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে দস্যুদের দ্বারা ছড়া থেকে পাথর গায়েব হয়ে যাওয়ার বিষয়টি কোন মতেই আগামীর হাসাহাসি, ট্রল, কন্টেন্ট থেকে সরানো যাবে বলে মনে হচ্ছে না। মান্না দে’র গানের মতই লোপাট হয়ে যাওয়া সব গুলো সাদা পাথরের গায়ে তিনি যতই দায় নিতে অস্বীকার করেন, তার নামই ইত্যবসরে উৎকীর্ণ হয়ে গেছে, কাগজেও লেখা হয়ে গেছে ঘন কালো অক্ষরে আর ব্যাতিক্রমী অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসেও লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে। অনাগতকালে এসব বিস্ময়কর অদ্ভুতুড়ে কথা কোনভাবেই মুছে দেওয়া যাবে না। এ অভিজ্ঞতা উপদেষ্টার জন্য তো অবশ্যই আমাদের জন্যও বেদনার, অপমানের আর সম্মিলিত ব্যার্থতার।
এখান থেকে আমাদের শিক্ষণীয় কি? আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষণীয় হলো: আমাদের কোন শিক্ষণীয় নেই এতে। এরকম যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে। আমরা কেউই গা করিনি। মাঝেমধ্যে দৌড়ঝাঁপ যতটুকু হয়েছে তা লোক দেখানো, প্রশাসন যে আছে তা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য। গা বাঁচানোর জন্য। এরূপ পাহাড়-বন-নদী-ভূমি-পাথর খেকোদের মুখ দু’টি। একটি হলো যারা মাঠ পর্যায়ে গায়ে গতরে খেটে, তদারকি করে, ঠিকাদারের মত এই লোপাট কার্য সম্পাদন করে থাকে। আরেক মুখ হলো সিনেমার গড ফাদারের মত আধো আলো-আধো আঁধারে ছায়ার মত নড়াচড়া করা গম্ভীর গলার নির্ভীক ও প্রশান্ত আত্মা। এখানে প্রশাসনের এক চিমটি সম্মতি আছে, পুলিশের এক চিমটি সহায়তা আছে, পরিবেশের গ্রীণ সিগন্যাল আছে, স্থানীয় টাউট বাটপার মাস্তানদের এক মুঠো প্রটেকশন আছে আর সবার উপরে রাজনীতির ষোলকলা আশীর্বাদ আছে। চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ফিক্সড ইনকামের জন্য এর চেয়ে ভালো সোর্স অফ ইনকাম আর নেই। কত কিছুই তো হচ্ছে আজকাল প্রকাশ্যে। নাহয় কিছু পাহাড় আর বন কেটার পিলারের কোপানলে পড়লো, নাহয় কিছু নদী আর ভূমি হাত-বেহাত হয়ে গেলো, নাহয় উজান থেকে আসা মফতে পাওয়া পাথর কিছু জায়গায় স্থানান্তরিত হয়ে গেলো? দেশের বাইরে তো আর যায় নি। ভাবি, আর কি কি লেখা আছে আমাদের ভবিতব্যে? আর কি কি দেখার আছে এখনো অভাবিত। আর কি কি শোনার আছে বিচিত্র?
এ হেন পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কি আমরা খুব ভালো করেই জানি। শুধু করি না। করতে চাই না। করতে পারি না। করার মত পরিবেশ সৃষ্টি করতে দেওয়া হয় না। তাই, বলির পাঠা না হয়ে সবাই ভাগেযোগে মিলে মিশে চেটেপুটে খেলে মন্দ কি? সর্বভুক বাঙ্গালির অনন্ত এ ক্ষুধার শেষ হবে কবে?
লেখক: কলামিস্ট