Wednesday 07 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

নরিয়েগা থেকে মাদুরো
মার্কিন আগ্রাসনের শেষ কোথায়?

গোলাম সামদানী হেড অব নিউজ
৫ জানুয়ারি ২০২৬ ২২:২৬ | আপডেট: ৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৩৬

প্রথমে মিত্র, এরপর শত্রু। এই নিয়মেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী শোষণ করে চলেছে শতাব্দী ধরে। বিশ্বের প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আমেরিকা যে কৌশলটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছে, তা হলো ‘শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন’ অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘পুতুল সরকার’ বসানো। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ডাউন্সের ‘ক্যাটাস্ট্রফিক সাকসেস: হোয়াই ফরেন-ইমপোজড রেজিম চেঞ্জ গোজ রং’ গ্রন্থে দেখা যায়, ১৮১৬ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ১২০ বার বিভিন্ন দেশে বিদেশি হস্তক্ষেপে সরকার পতন হয়েছে। এর মধ্যে ১৯০৫ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এক-তৃতীয়াংশই করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এর মধ্যে তারা তিনটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে সরাসরি আটক করেছে।

বিজ্ঞাপন

১৯৮৯ সালে পানামার শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগা, ২০০৩ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস আদ্রে মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। সেইসঙ্গে তুলে নিয়ে গেছে তার স্ত্রী ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসকেও। মাদুরোর চোখ বাধা ছবি এরই মধ্যে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। ৩ জানুয়ারি সকালে হামলার পর মাদুরো ও তার স্ত্রীকে তুলে নেওয়ার পর তাদের যুক্তরাষ্ট্রের ব্রকলিনের বন্দি শিবিরে পাঠানো হয়েছে।

মাদুরোকে আটকের আগে দেশটির রাজধানী কারাকাস ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হামলা চালায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিমান ঘাঁটি, সামরিক স্থাপনা, বিমানবন্দর ও টেলিকম টাওয়ারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপানায় হামলা চালানো হয়েছে। এতে সারাদেশে ৫০ জনের মতো নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৩২ জন কিউবার নাগরিক রয়েছেন। এ জন্য কিউবায় ৫ ও ৬ জানুয়ারি শোক ঘোষণা করা হয়েছে।

মার্কিন হামলার পর রাজধানীর কারাকাসের রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও প্রেসিডেন্ট মাদুরোর অনুসারীরা বিক্ষোভ করে। এদিকে মাদুরো সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভেলসি রদ্রিগেজকে দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছে সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট। প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে একটি তাঁবেদার সরকার বসানোর ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ রদবদল না হওয়া পর্যন্ত আমরাই দেশটি চালাব। তিনি আরও বলেন, ভেনেজুয়েলার জনগণ। এখন তারা স্বাধীন এবং দেশটি পরিচালনায় উপযুক্ত মানুষ বাছাইয়ের কাজ চলছে।’

স্বাধীন দেশের ওপর হামলা আমেরিকার কাছে নতুন নয়

কোন স্বাধীন সার্বভৌম দেশের ওপর নানা ছুতায় হামলা বা সে দেশের প্রেসিডেন্টকে তুলে আনার ঘটনা আমেরিকার কাছে নতুন নয়। নরিয়েগা, সাদ্দাম ও মাদুরো ছিলেন ক্ষমতাসীন অবস্থায়। তারপরও তাদের তুলে আনে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়াও, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আর আসাদ এবং লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ গাদ্দাফী সরকারকে উৎখাত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। ফলে লিবিয়া এবং সিরিয়ার জনগণ আজ চরম অরাজকতায় দিন কাটাচ্ছে।

১৯৮৯ সালে পানামায় আগ্রাসন চালায় যুক্তরাষ্ট্র। উদ্দেশ্য ছিল দেশটির সামরিক শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করা। অভিযানে চালিয়ে তাকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে মিয়ামিতে দায়ের করা মামলায় তার বিচার হয়। তিনি সেখানে ২০১০ সাল পর্যন্ত কারাবন্দি ছিলেন। পরে তাকে আরেকটি মামলার বিচারের জন্য ফ্রান্সে প্রত্যর্পণ করা হয়। একবছর পর ফ্রান্স তাকে পানামায় পাঠিয়ে দেয়। পানামার কারাগারেই ২০১৭ সালে নরিয়েগার মৃত্যু হয়। যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযানের পক্ষে যুক্তি হিসেবে দেখায় যে, পানামায় বসবাসরত মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা, অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, দুর্নীতি ও অবৈধ মাদক ব্যবসা থেকে মুক্ত করা হবে।

গণবিরোধী অস্ত্র আছে এমন অভিযোগ এনে ২০০৩ সালের ২০ মার্চ ইরাকে অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা সামরিক জোট। যুক্তরাষ্ট্র আরও দাবি করে, সাদ্দাম আল-কায়েদার মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিতেন। যদিও এই অভিযোগেরও কোনো ভিত্তি ছিল না। ২০০৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর সাদ্দাম হোসেনকে গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। পরবর্তী সময়ে দেখা যায় সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী কোনো অস্ত্র ছিল না।

আর ২০২৬ সালে মাদুরো সরকারকে উৎখাতে ট্রাম্প তার বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ আনে। অথচ মাদকবিরোধী বিশেষজ্ঞদের মতামত হচ্ছে, বৈশ্বিক মাদক পাচারে ভেনেজুয়েলার ভূমিকা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে দেশটির মধ্য দিয়ে অন্যত্র উৎপাদিত মাদক চোরাকারবার হয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন কোনো দেশকে টার্গেট করে তখন সে দেশের অভ্যন্তরে দালাল গোষ্ঠী তৈরি করে। ভেনেজুয়েলায়ও তার ব্যতীক্রম ঘটেনি। এমন একসময় দেশটির ওপর হামলা করেছে যখন অর্থনৈতিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ বিরোধে এমনিতেই তারা বিপর্যস্থ।

ট্রাম্পের পরিকল্পনা ও হামলা

গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মাদুরো সরকারকে উৎখাতে পরিকল্পনা করতে থাকে। গত সেপ্টেম্বর থেকে মার্কিন নৌবাহিনী ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছাকাছি নৌবহর মোতায়েন করতে থাকে। মাদক পাচারের অভিযোগে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে নৌযানে হামলা চালানো হয়। এ সময় তারা ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজও আটক করে নিয়ে যায়। মূলত ওইসব হামলার লক্ষ্য ছিল ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজ জব্দ করা। জাহাজের তেল কী করা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সরাসরি বলেছেন, ‘জব্দ করা তেল নিয়ে যাওয়া হবে।’ মাদুরো সরকারকে উৎখাতে কেন ট্রাম্প মরিয়া তা গোপন করা হয়নি। মাদুরোকে তুলে আনার পর পরই ট্রাম্প মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার অবকাঠামো মেরামত করতে এবং দেশের জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করতে সাফ জানিয়ে দেন।

তেলের জন্যই কি এই হামলা?

বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুদ রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের অন্যতম প্রভাবশালী সাময়িকী ‘অয়েল অ্যান্ড গ্যাস জার্নাল’ বলছে, ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী ভেনেজুয়েলার মজুত তেলের পরিমাণ ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল। মজুতের দিক থেকে সৌদি আরবের অবস্থান দ্বিতীয়। দেশটিতে মজুত তেলের পরিমাণ ২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেল। তৃতীয় অবস্থানে ইরানের মজুত ২০৮ বিলিয়ন ব্যারেল। যদিও ভেনেজুয়েলার তেল অনেক ভারী হওয়ায় তা শোধন অনেক কষ্টসাধ্য। দেশটির অর্থনীতি পুরোপুরি তেল নির্ভর। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব, রাজনৈতিক বিরোধ, তেলের মূল্য হ্রাস, তেল বিক্রিতে অবেরোধ প্রভৃতি কারণে দেশটির অর্থনীতি অত্যন্ত নাজুক। ধারণা করা হচ্ছে, ভেনেজুয়েলার তেলের জন্যই দেশটিতে হামলা চালিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।

বিশ্বব্যাপী নিন্দা

ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর রাশিয়া, চীন, ইরানসহ বিভিন্ন দেশ তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। দেশটির দীর্ঘ দিনের মিত্র রাশিয়া এ ঘটনাকে সশস্ত্র আগ্রাসন বলে অভিহিত করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে জাতীয় সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট সুপ্তাভো পেট্রো এ হামলাকে লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত বলে অভিহিত করেছেন। কিউবার পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে ক্রিমিনাল অ্যাটাক বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এদিকে হামলার তীব্র সমালোচানা করেছে মালয়েশিয়া। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সবধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপের পাশাপাশি হুমকি বা বল প্রয়োগের বিরোধিতা করে। তবে এই হামলার সরাসরি সমর্থন করেছে জাপান ও যুক্তরাজ্য। শুধু তাই নয়, স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও আইন প্রণেতারাও এই হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ করেছেন।

জাতিসংঘের মহাসচিবের উদ্বেগ

একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্টকে এইভাবে উঠিয়ে নেওয়ার দৃশ্য উদ্বেগের। মাদুরোর চোখ বাঁধা যে ছবিটা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে তা দেখে যেকোনো গণতন্ত্রকামী মানুষের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ তৈরি করবে- এটাই স্বাভাবিক। মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ায় ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কলম্বিয়া সোমবার (৫ জানুয়ারি) জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে। আর এই বৈঠকে সমর্থন পেয়েছে রাশিয়া ও চীনের।

বিজ্ঞাপন

বাবল বাথ ডে: ফেনার রাজ্যে একদিন!
৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:২৬

আরো

গোলাম সামদানী - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর