রবিবার ২০ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ৪ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

বিদ্যালয়ে নিপীড়ন : বয়ে বেড়াতে হয় সারাজীবন

জুলাই ২৯, ২০১৮ | ৮:৩৪ পূর্বাহ্ণ

।। জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা: শিক্ষিকাকে মানসিক চিকিৎসা ও মানসিক হাসপাতালে পাঠানোর সুইসাইড নোট লিখে আত্মহত্যা করে শহীদ ফারুক ইকবাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার মালিহা। তার স্বজনদের অভিযোগ, স্কুলের শিক্ষিকা রিমি শুধু মালিহার সঙ্গেই না, আরও অনেক ছাত্রীর সঙ্গেই খারাপ ব্যবহার করেছেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। তার কাছে কোচিং না করলে আচরণ খারাপ করেন— এমন অভিযোগও তাদের জানা রয়েছে।

গতকাল ২৪ জুলাই একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে উত্তরা রাজউক মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে। সেখানে দশম শ্রেণির এক ছাত্রীরও রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। তবে বিশ্বস্ত এক সূত্র সারাবাংলা’কে জানায়, ছাত্রীটি পরীক্ষায় খারাপ করায় তাকে ডেকে পাঠায় স্কুল কর্তৃপক্ষ, আর তখনই সে সিঁড়ি থেকে লাফ দেয়। মারাত্মক আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন হয়ে মারা যায় ওই শিক্ষার্থী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই স্কুলের এক শিক্ষার্থীর একজন অভিভাবক সারাবাংলা’কে বলেন, যারা এই স্কুলের শিক্ষকদের কাছে কোচিং করে তারা শিক্ষকদের সুনজরে থাকে; যারা করে না, তারাই শিক্ষকদের রোষানলে পরে। যে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে তাকে মাত্র ১ নম্বর দিলেই পাস করে যেত, প্রি-টেস্টে বসতে পারত। অথচ শিক্ষকদের পছন্দের শিক্ষার্থীদের ৮ থেকে ১০ নম্বর করে দিয়েও পাস করিয়ে দিতে দেখেছি। রাজউকের শিক্ষার্থীরা মেয়েটি মারা যাবার প্রতিবাদে ফেসবুকে ইভেন্ট খুললে সেটিও স্কুল কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বন্ধ করতে বাধ্য হয় শিক্ষার্থীরা।

বিজ্ঞাপন

এদিকে, বারিধারায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠিত ও স্বনামধন্য একটি স্কুলের দুয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ এনেছেন দুই শিক্ষার্থীর মা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই মা সারাবাংলা’কে বলেন, শিক্ষকরা প্রকাশ্যে আস্তিক-নাস্তিক নিয়ে কথা বলেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, তার ছেলেদের পরীক্ষার খাতাও নিয়ে নেয় আগে আগে, শিক্ষার্থীদের বকাঝকা করে। শিক্ষার্থীরা স্কুল নিয়ে ভীতিতে থাকে, মন খারাপ করে থাকে।

স্কুলগুলোতে এ ধরনের কাজ হরহামেশাই হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের এই বয়সটাকে ‘আর্লি লার্নিং স্টেজ’ অভিহিত করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক এবং শিক্ষকরা বলছেন, শিশু বয়সে বিদ্যালয়ের এ ধরনের নিপীড়ন সারাজীবনকে প্রভাবিত করে। শিশুরা এতে করে আত্মবিশ্বাসী হতে পারে না, তারা সারাজীবন এর দায় বহন করে বেড়ায়। তাদের ব্যক্তিত্বে এতে মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

বিশেষজ্ঞদের একথার প্রমাণ মেলে গণমাধ্যমকর্মী শামীমা দোলার বক্তব্যে। ছোটবেলায় স্কুল অভিজ্ঞতার কথা মনে হলে তিনি এখনও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন জানিয়ে শামীমা বলেন, স্কুলে শিক্ষিকাদের বুলিংয়ের শিকার হওয়া আমি এখনও ভুলতে পারি না। এখনও ওইসব দিনের কথা মনে হলেই শিউরে উঠি।

শামীমা বলেন, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস স্কুলে মীরা রায় নামের একজন প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন যিনি কেবল শিক্ষার্থী না, তাদের অভিভাবকদেরও অপমান করতেন। শিক্ষার্থীদের কান ধরে মাঠে বের করে দিতেন, সেখানে সারাদিন কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। স্কুলে কোচিং বাণিজ্য ছিল প্রচণ্ড, কোচিং না করলে সে শিক্ষার্থীর ওপর খড়গ নেমে আসত। এখনও ওই আতঙ্ক মাঝেমধ্যেই ভর করে।

স্কুল-কলেজগুলোতে শিক্ষকদের হাতে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের নিপীড়ন, নির্যাতন কেন হচ্ছে— জানতে চাইলে ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আফসান চৌধুরী সারাবাংলা’কে বলেন, বুলিং-আসলে গোটা সমাজেই এখন বিদ্যমান। তবে এর একটি আত্মরক্ষামূলক অন্যটি আক্রমানাত্মক।

যারা নিজেকে নিয়ে ভয় পায়, নিজেকে নিয়ে যার আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে তারাই অন্যকে আঘাত করে, কিন্তু যিনি আত্মবিশ্বাসী সে এমনটা করে না। আবার কেউ অন্যকে আঘাত করে নিজের ক্ষমতার পরিসর বাড়াতে চেষ্টা করে।

আমরা কাঠামোগতভাবেই একটি বুলিং সমাজে বাস করছি মন্তব্য করে গবেষক অধ্যাপক আফসান চৌধুরী বলেন, কারও সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করলেই সাংঘাতিকভাবে বুলিংয়ের শিকার হতে হয়— এ চিত্র ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

আমাদের দেশে পরীক্ষা ভীতির মাত্রা অকল্পনীয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, এর কারণ হচ্ছে, বাবা-মা মনে করে পরীক্ষায় সন্তান ভালো না করতে পারলে সে জীবনে কিছু করতে পারবে না। আর এই ভয় থেকেই বাবা-মায়ের উদ্বেগ সংক্রমিত হয় সন্তানের মাঝে। আর এই ভয়েই ছেলেমেয়েরা এসব আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটায়।

নিজের জীবনে তিনিও বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন জানিয়ে আফসান চৌধুরী বলেন, আমি ছোটবেলায় মোটা ছিলাম এবং সারাজীবন এর জন্য বুলিং সহ্য করতে হয়েছে। ছোটবেলায় স্কুল ভীষণভাবে ভয় পেতাম এবং স্কুলে যেতে চাইতাম না। সে সময় আমার কাছে লেখাপড়ার চেয়ে ভয়ের আর কিছু ছিল না। একইসঙ্গে স্কুলে শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকারও হয়, সেটা তারা বলতেও পারে না। বাচ্চাদের ওপর এ ধরনের বিষয়গুলো ভয়ংকর চাপ তৈরি করে। তাই প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বুলিং-বিরোধী কার্যক্রম থাকা প্রয়োজন। একইসঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বুলিং-বিরোধী মনোভাবের জন্য প্রশিক্ষণ দরকার বলেও মন্তব্য করেন আফসান চৌধুরী।

স্কুল-কলেজ কীভাবে সামাজিক অনাচার তৈরি করে, মালিহার আত্মহত্যা তার জ্বলজ্ব্যান্ত উদাহরণ মন্তব্য করে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম সারাবাংলা’কে বলেন, ‘শৈশবে চাপ বা ভয়ের মধ্যে থাকলে শিশুরা দমিত হয়ে যায়। অনেক শিশুই শিক্ষকদের অবহেলা, ভৎর্সনা, অপমান সহ্য করতে পারে না।’

এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘কিছু কিছু মানুষ জন্মগতভাবেই নিষ্ঠুর প্রকৃতি, অন্যকে আঘাত করে বা আহত করে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পায়। এরকম কিছু শিক্ষকও সমাজে রয়েছেন, যারা শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে নিপীড়ন করে থাকেন। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থীই একইসঙ্গে আতঙ্ক বা ভয় ও অপমানিত বোধ করে। আর এমন ঘটনা ক্রমাগত ঘটতে থাকলে তা শিক্ষার্থীদের সহ্যসীমার বাইরে চলে যায়। আবার এসব ঘটনা তারা পরিবারের কাছেও বলতে পারে না, স্কুলেও এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। তাই প্রতিটি স্কুল-কলেজে নিঃসঙ্কোচে অভিযোগ করার মতো ব্যবস্থা করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বলতে পারবে।’

বিদ্যালয়গুলোতে কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা রাখার কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন জানিয়ে অধ্যাপক তাজুল ইসলাম বলেন, স্কুল নিজেই যদি মানসিক সমস্যা তৈরি করার মতো পরিবেশ তৈরি করে, তাহলে এসব বিষয় কে দেখবে? তাই বিদ্যালয় ও পরিবারে সেই কাঠামো রাখতে হবে, যেন করে মানসিক নিপীড়ন এবং নির্যাতনের কথা শিক্ষার্থীরা বলতে পারবে। তাতে করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এদিকে নজর দেবে এবং পরিবারও সচেতন হবে।

অধ্যাপক তাজুল ইসলাম আরও বলেন, এখনও আমাদের সমাজে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কিছু বলাকে বেয়াদবি মনে করা হয়। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কিছু বললে অনেক পরিবার উল্টো সন্তানকেই দায়ী করে থাকেন। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, শিক্ষকরাও আমাদের মতো মানুষ, তাদেরও ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে। কিন্তু বাবা-মায়ের কাছে নিগৃহীত হওয়ার ভয়ে সন্তান পরিবারের কাছেও কিছু বলে না। যে কারণে শিশু মনে সাংঘাতিক ধরনের পরিবর্তন যে হয়ে যাচ্ছে, সেটা আমরা টের পাচ্ছি না। তাই এসব বিষয়ে উন্মুক্ত হতে হবে।

কেবল শিক্ষার্থীদের নয়, শিক্ষকদেরও নিরীক্ষণ করার সময় এসেছে এবং শিক্ষার্থীদের মাধ্যমেই শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে হবে— এমন মতও দেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা কোন শিক্ষককে কেন পছন্দ করছেন, কেন পছন্দ করছেন না, কার ব্যবহার ক্লাসরুমে কেমন হচ্ছে— এসব ফিডব্যাক নিয়ে শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে হবে।

এদিকে, স্কুলে বুলিংয়ের শিকার হওয়া অবশ্যই নিন্দনীয় এবং নিন্দা দিয়েই এর প্রতিবাদ করতে হবে মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ও সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক সারাবাংলা’কে বলেন, সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলোকে আমলে নেয় না, কারণ এ দেশে সামাজিক বিষয় সবসময়ই উপেক্ষিত।

তিনি আরও বলেন, অনেক শিক্ষকই তার পছন্দের শিক্ষার্থীদের বাইরে খুব সাবলীল বা সর্বজনীন হতে পারেন না। তখন অন্যরা তাদের রোষানলে পরেন। কিন্তু এই বয়সে কোনো শিক্ষার্থীকে এ ধরনের আচরণের মুখে পড়তে হলে তা তার জীবনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমরা বিদ্যালয়গুলোতে কাউন্সিলর নিয়োগের কথা সবসময় বলি, কিন্তু তা করা হচ্ছে না।

‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষকদের আচরণ-মনোভাব— এই বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করার সময় এসেছে। কারণ এসব বুলিংয়ের ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষার পরিবেশ ক্রমান্বয়ে বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে বলেই মনে হয় আমার’,— বলেন তৌহিদুল হক।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের শিশু-কিশোর ও পারিবারিক সম্পর্ক বিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ সারাবাংলা’কে বলেন, আমরা এমনও রোগী পাই যে সে স্কুলে গায়ের রঙ কালো অথবা মোটা বলে শিক্ষকদের বুলিংয়ের শিকার হয়। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মানসিক নিপীড়নের শিকার অনেক রোগী পেয়ে থাকি আমরা। পরীক্ষায় কেউ নম্বর কম পেলে অভিযোগ করলে পরের পরীক্ষায় আরও কম নম্বর দেওয়া হয়েছে— এমন অভিযোগও আমরা পাই।

তবে এসব ঘটনার কারণে যে চাপে পড়ে আত্মহত্যা করতে হবে— বিষয়টা একদমই তেমন না মন্তব্য করে ডা. হেলাল বলেন, আমরা যেন বিষয়গুলোকে ‘গ্লোরিফাই’ করে না ফেলি। এমন আত্মহত্যার ঘটনাগুলো নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে যেন অন্য শিক্ষার্থীরা এমন ঘটনাকে অনুকরণীয় না মনে করে। বিদ্যালয়গুলোর নিপীড়ন-নিগৃহ বন্ধের পক্ষে কথা বলতে হবে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু তা করতে গিয়ে আত্মহত্যার শিকার শিক্ষার্থীর প্রতিও সহমর্মিতা না দেখানো হয়—   একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে এমন অনুরোধ করছেন বলে জানান ডা. হেলাল।

সারাবাংলা/জেএ/টিআর

আরও পড়ুন,

সুইসাইড নোটে শিক্ষিকার মানসিক চিকিৎসা চেয়েছে মেয়েটি
বিজ্ঞাপন

Tags: ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন