বৃহস্পতিবার ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৪ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৯ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

শীতার্ত মানুষ, একটু উষ্ণতার খোঁজে

জানুয়ারি ১, ২০১৮ | ৯:৪২ পূর্বাহ্ণ

স্রষ্টা প্রকৃতিকে সাজিয়েছেন নানা রূপ আর রঙে। প্রকৃতির সুনিপুণ শিল্পকলার অচিন্তনীয় শিল্পকৌশলেই যেন স্রষ্টার অনিন্দ্য সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ।

বিজ্ঞাপন

পৃথিবী সুন্দর প্রকৃতির গুণে। আর প্রকৃতি সুন্দর, কারণ সে বৈচিত্র্যে ঠাসা। প্রকৃতির পরতে রং আছে। আর পরিবর্তনে আছে ঢং। প্রকৃতির রূপ, রং ও ঢঙের চাতুর্যতা আমাদের মোহগ্রস্ত করে, কেননা সে যে অলীক অনুপম সৌন্দর্য! বহির্বিশ্বের প্রকৃতির চেয়ে আমাদের ব-দ্বীপ তথা বাংলার প্রকৃতি ঢের সুন্দর ও মোহনীয়। এটা ঐতিহাসিক বিজ্ঞজনে স্বীকৃত সত্য এবং আমাদের স্রষ্টাপ্রদত্ত ঐতিহ্যিক আভিজাত্য।

‘বহির্বিশ্বের প্রকৃতির চেয়ে বাংলার প্রকৃতি সুন্দর’ —এই সরল সত্যের দাবি আমরা এ কারণে করতে পারি যে, এখানে ঋতুর ঘূর্ণায়নে তৈরি হয় এক চমকপ্রদ প্রকৃতির আবহ। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত। ষড়ঋতুর পালাবদল। এটাই আমার বাংলা, আমাদের বাংলাদেশ। দ্বিজেন্দ্র লাল রায়ের ভাষায়—
“এমন দেশটি কোথাও খোঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি”

এই হলো আমাদের বঙ্গ প্রকৃতি! অবশ্য আমাদের এই বঙ্গ প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় আচরণ ও দুর্বলের বেঁচে থাকার লড়াই এবং আমাদের দায়বদ্ধতা প্রসঙ্গে বলবার অনেক বিষয় রয়েছে—

প্রকৃতির সার্বিক পরিবর্তন তার স্বাভাবিক নিয়মেরই পুনরাবৃত্তি। সহজভাবে বললে, প্রকৃতি তার স্বাভাবিকতাকে ধারণ করে এগিয়ে চলে। এই স্বাভাবিকতার নিয়মে কখনো আসে গ্রীষ্ম, কখনো বর্ষা, কখনো শীত, কখনো ঝড় কিংবা কখনো তুফান। প্রকৃতির স্বাভাবিকতা মানুষকে স্বর্গসুখে নিমজ্জিত করে। এটি যেমন সত্য, ঠিক সমান বিপরীত আরেকটি সত্য হচ্ছে— এই প্রকৃতির স্বাভাবিকতাই আবার কখনো কখনো অস্বাভাবিক ভয়ংকর, কাল হয়ে দাঁড়ায় মানুষের জন্য! ওই মানুষগুলো তাঁরাই, যাঁরা পেরে ওঠে না প্রকৃতির চিরাচরিত স্বাভাবিকতার সাথে। যাঁরা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে না প্রকৃতির পরিবর্তনজনিত আচরণের সাথে। ফলে— গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত, জলোচ্ছ্বাস আর ঘূর্ণিঝড়; প্রকৃতির প্রভৃত্তি আচরণই যেন তাদের জন্য অভিশাপ! কারণ তাঁরা প্রকৃতির স্বাভাবিকতার কাছে আর্থিক কারণে বড় দুর্বল!

বিজ্ঞাপন

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত শীতকাল। বাংলা মাসের হিসেবে এটি হয় পৌষ-মাঘ দুই মাস। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে গড় তাপমাত্রা দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে শুরু করে উপকূলীয় অঞ্চলে ২০ থেকে ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বজায় থাকে। আর এই সময়টাই শুরু হয় কিছু মানুষের বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াই। কিছু মানুষ ছুটে চলে একটু ওম তথা উষ্ণতার খোঁজে! এই মানুষগুলোর অর্থনৈতিক দীনতার কারণে শীতার্ত, দুর্বল! ফলে তাদের বেঁচে থাকার আকুতি আর মিনতি আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না, কেননা তা আমাদের দায়বদ্ধতা। তাই যেন মানবতা চিৎকার করে বলে—
“মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য
একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না ও বন্ধু?”

দেশে শীত এখনো জেঁকে বসেনি। অল্প কিছু দিন পর শুরু হবে টানা শৈত্যপ্রবাহ। শৈত্যপ্রবাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ, অসহায়, দরিদ্র, ছিন্নমূল মানুষের ঘাড়ে ভর করবে এই যন্ত্রণার খড়গ। তাই শীত বরাবরের মতোই দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা এ দেশের বড় একটি অংশের জন্য আতঙ্ক।

অতিমাত্রার শীতের প্রকোপে খেটে খাওয়া গরিব মানুষের পোহাতে হবে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। নানা রোগ-বালাই, অসুখ-বিসুখ। ছিন্নমূল, সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোর জন্য যা প্রতিবারের মতোই এক ভয়াবহ ঠাণ্ডা যুদ্ধ! ফুটপাত বা খোলা আকাশের নিচে দিনাতিপাত করা মানুষগুলোর মাথা গোঁজার জন্য নেই একটু আশ্রয়। নেই শীত নিবারণের জন্য নেই এক টুকরো গরম কাপড়। শীতজনিত রোগ প্রতিরোধে নেই ওষুধপথ্য সেবনের উপযুক্ত সামর্থ্য।

এ সমস্ত সুবিধাবঞ্চিত শীতার্ত মানুষগুলোর কী পরিমাণ নিদারুণ কষ্ট ও দুঃসহ যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় তা বুঝা যায় গভীর রাতে শহরের অলিগলিগুলি পরিদর্শন করলে। যেমন— ঢাকা-চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন জায়গা সরেজমিন পরিদর্শন করলে তা দেখা যাবে, দেখা যাবে অন্য কোথায় গভীর রাতে গেলেও। সেখানে দেখবেন শীতার্তদের কেউ কেউ হাড়কাঁপানো শীতে প্লাস্টিকের বস্তা গায়ে দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে রাত পার করছে। কেউ ছেড়া কাঁথা কিংবা স্তূপ থেকে কুড়িয়ে পাওয়া ছেড়া কাপড় গায়ে জড়িয়ে রাত পার করার চেষ্টা চালাচ্ছে। আবার অনেকে একেবারে বস্ত্রহীন বলা চলে...!

অথচ সে সময় বিত্তশালী সমাজে দেখা যায় তাঁর উল্টো চিত্র! শীত এলে ধুম পড়ে টাকা খরচের প্রতিযোগিতার। চলে নিত্যদিন কেনাকাটার ব্যস্ততা। হরেক রকম শীত প্রতিরোধী বস্ত্র আর শীত উপভোগের কৃত্রিম ব্যবস্থার সমাহার। কেউ দামি সুইটার, কেউ তোষক, কেউ লেপ, কেউ মোটা কম্বল কিংবা ঠাণ্ডানিরোধক পাখা!

প্রতি বছর শীত মৌসুমে দেখা যায় সারাদেশে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সুবিধাবঞ্চিত মানুষজনের পোহাতে হয় শীতজনিত নানা রোগ-বালায় ও জটিলতা। বিশেষ করে দেশের উত্তর-দক্ষিণাঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ তীব্র শীতের প্রকোপে কাবু হয়ে পড়ে। পত্র-পত্রিকায় উঠে আসা সংবাদে আমরা এ-ও জানি, শীতজনিত রোগে মারা যায় অনেক শিশু-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ।ৎ

অথচ আমাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর মনভরা আগ্রহই পারে এ সমস্ত মানবেতর পরিস্থিতি সামাল দিতে! যেমন— সমাজের বিত্তশালী শ্রেণী, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দাতা সংস্থা, ধর্মীয় সংগঠন, সেচ্ছাসেবী সংগঠন, ব্যক্তি আগ্রহ ইত্যাদি কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে যদি সুবিধাবঞ্চিত ছিন্নমূল শীতার্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ায়, তবেই পরিস্থিতি উত্তরণ ঘটবে।

আমাদের দুটো কান যদি পেতে রাখি, আর এতে যদি শোনতে পাই একজন শীতার্তের কাঁপনের শব্দ, তাহলে এটাই ভাবুন স্রষ্টার আদেশ পালনের সুন্দর উপায়। আমাদের একটি অব্যবহৃত শীতবস্ত্র যদি একজন দুস্থ শীতার্তের গায়ে জড়িয়ে দেই, তাহলে এটাই হবে স্রষ্টার উদ্দেশ্যে দেওয়া আমার উত্তম উপহারের একটি। কারণ স্রষ্টা যে প্রতিটি বঞ্চিত মানুষের অন্তরেও বিরাজমান।

ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাসস্টপ, সদরঘাট, হাসপাতালের সামনে, মার্কেটের গলি, রাস্তার পাশে যেখানে যে অবস্থায় শীতার্ত মানুষের খোঁজ মেলে, সেখানেই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র নিয়ে ছুটে যাওয়া প্রয়োজন। সৃষ্টির সেবাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম। প্রতিটি মহৎ কাজে সমাজে বসবাসরত প্রত্যেক শ্রেণী, পেশা ও ধর্মের মানুষ আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে এলেই পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে বাধ্য। কারণ, আমার দেওয়া একটি গরম কাপড় কারো জন্য একরাশ উষ্ণতা। আমার একটু সুদৃষ্টি কারো জন্য বেঁচে থাকার অবলম্বন।

যে সমাজে এলিট বহুতল ভবনের প্রাচীর বস্তিবাড়ির টিনফুটো ঘরের কান্নার রোল আটকে দেয়, সে সমাজ বড়জোর বস্তুগত উন্নয়নে এগিয়ে যেতে পারে; কখনো মানবিক উন্নয়নে নয়। আর এমন একটি অধঃপতিত সমাজের পক্ষে সভ্যতার দাবি তোলা অবান্তর।

আমি, আপনি সর্বোপরি আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাগুলোই হবে বৃহত্তর শক্তির ফসল। আর এখানেই বিদ্যমান একটি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সার্বিক উপাদান। তাই আসুন, আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য ছিন্নমূল শীতার্ত এবং নানান শ্রেণীর সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সাহায্যার্থে নিজ নিজ অবস্থান থেকে মানবতার হাত সম্প্রসারিত করি। এবং দল-মত, শ্রেণী, ধর্ম, সম্প্রদায় নির্বিশেষ গড়ে তুলি একটি সমতাভিত্তিক মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন বাসযোগ্য সমাজ। যে সমাজে ওম আর উষ্ণতা পাবে প্রতিটি শীতার্ত মানুষ।

লেখক: প্রাবন্ধিক

Advertisement
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন