বিজ্ঞাপন

আপনি একা ‘প্রধানমন্ত্রীর লোক’ নন

September 26, 2018 | 9:52 pm

।। কবির য়াহমদ ।।

বিজ্ঞাপন

‘আমার বাবা এমপি, জাতীয় কমিটির সদস্য, আমরা প্রধানমন্ত্রীর লোক’— এমন পরিচয় উল্লেখ করে হুমকিসহ এক নারীর ট্রাফিক আইন ভঙ্গের যে ঘটনা ঘটেছে সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। একইসঙ্গে এ ঘটনায় কিছু ক্ষমতাবানের আইন ভাঙার সর্বাত্মক প্রবণতার প্রমাণ ও ইঙ্গিতও মেলে।

এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ফলে আমরা জানতে পারলাম কী ঘটেছিল। তবে প্রকৃতপক্ষে কিয়দংশেই আমরা জানতে পেরেছি। এর বাইরে এমন ঘটনা নিয়মিত ঘটে চলেছে এবং যারা এসব করছে, তারা নিশ্চিতভাবেই ক্ষমতাবান কিংবা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা কেউ। সাধারণ জনগণ এসব করার সাহস করে না। অজান্তে কিংবা চুপিসারে হয়তো আইন ভাঙে, কিন্তু আইন ভাঙতে গিয়ে কারও প্রতি জবরদস্তি চালানোর চেষ্টা করে না।

বিজ্ঞাপন

ঘটনাটি ঘটেছে মঙ্গলবার (২৫ সেপ্টেম্বরে), মিরপুরে স্কলাস্টিকা স্কুলের সামনে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, স্কুলের সামনে ডাবল লেনে পার্কিং করে রাখা ছিল একটি প্রাইভেট কার। সেটি সরিয়ে দিতে অনুরোধ করতে করতে এগোচ্ছিলেন ট্রাফিক পুলিশের এক সার্জেন্ট। কিন্তু এতে ক্ষেপে যান গাড়ির ভেতরে থাকা নারী যাত্রী। উচ্চকণ্ঠে তিনি নিজের ক্ষমতা প্রকাশ করে ওই ট্রাফিক সার্জেন্টকে তাচ্ছিল্য করতে থাকেন।

গাড়ি আটকানো ট্রাফিক সার্জেন্ট ঝোটন সিকদার তার ফেসবুক টাইমলাইনে এ বিষয়ে ভিডিও শেয়ার করে লিখেন, ‘এই ভদ্রম‌হিলা মিরপুর ১৩ নম্বর স্কলা‌স্টিকা স্কু‌লের সাম‌নে তার প্রাই‌ভেট কার ডাবল লে‌নে পা‌র্কিং ক‌রে রে‌খে‌ছেন। তার গা‌ড়ির জন্য পেছ‌নের গা‌ড়িগু‌লো আস‌তে পার‌ছে না। প্রচণ্ড জ্যাম লে‌গে আছে। তা‌কে অনেকবার স‌বিনয় অনু‌রোধ করলাম, আপু আপনার গা‌ড়ির ড্রাইভা‌র‌কে ডে‌কে দ্রুত গা‌ড়ি‌টি স‌রি‌য়ে পেছ‌নের গা‌ড়িগু‌লো আসার সু‌যোগ দিন এবং জ্যামমুক্ত ক‌রুন। ‌কিন্তু না, তি‌নি আমার কোনো কথা তো শুন‌লেনই না, বরং আমা‌কে খারাপ ভাষায় গালাগা‌লি ক‌রলেন এবং ব‌লেন, তু‌মি সরকা‌রের ২ টাকার চাকর, আমা‌কে চেনো তু‌মি? কার গা‌ড়ি জা‌নো এটা?...’

বিজ্ঞাপন

নিজেকে একজন সংসদ সদস্যের কন্যা পরিচয় দেওয়া সেই নারীকে প্রচারিত ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, ‘এই কার গাড়ির ছবি তোলো? এটা সরকারি দলের লোকের গাড়ি। কার গাড়ির ছবি তোলো? বেশি...কইরো না! তোমার মতো সার্জেন্ট কয় টাকা বেতনে চাকরি করে; কয় টাকা বেতনে চাকরি করে তোমার মতো সার্জেন্ট... আমরা প্রধানমন্ত্রীর লোক, ঠিক আছে! যদি সাহস থাকে... আমার বাবা জাতীয় কমিটির সদস্য, আমার বাবা এমপি, ঠিক আছে? তোমার মতো হাজারটা সার্জেন্ট... ঠিক আছে? কয় টাকা বেতনে চাকরি করো? হ্যাঁ, চাকরই তো... চাকরই তো!’

এ ঘটনা ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেলে অনেকেই ওই নারীর সমালোচনা করছেন। এই সমালোচনায় আবার অপ্রাসঙ্গিকভাবে উঠে এসেছে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়কার ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ দাবিযুক্ত ফ্রেম। এই ফ্রেমকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণির ফেসবুকার পু্রো নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে বিতর্কিত করার মানসে বলতে চাইছেন, আন্দোলনকারীরাও সড়ক আইন মানে না এবং সে আইন আমান্য করতে জবরদস্তিও করছে। অথচ ব্যক্তিবিশেষের কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা যেকোনো আন্দোলন কিংবা দাবিকে কোনোভাবেই বিতর্কিত করতে পারে না, করার কথাও নয়।

বিজ্ঞাপন

এটাকে উল্লেখযোগ্য হিসেবে দাবি করা যেত যদি ওই নারী নিজে সেই আন্দোলনের নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ের কেউ হতেন। কিন্তু সেটা তিনি নন, হওয়ার কথাও নয়। কারণ নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের শুরুটা হয়েছিল তাৎক্ষণিকভাবে এবং সেটা অনতিতরুণ স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের দ্বারাই। ফলে বিশেষ উদ্দেশ্য পূরণে ফেসবুকে সক্রিয় থাকা গোষ্ঠীর এমন উল্টো প্রচারকে কোনোভাবেই প্রাসঙ্গিক বলা যায় না।

যাই হোক, আলোচ্য লেখার উদ্দেশ্য ফেসবুকের সেই শ্রেণিভুক্তদের গণউদ্দেশ্য নিয়ে নয়। উদ্দেশ্য সড়ক আইনকে অমান্য করার যে মানসিকতা, সেটা নিয়েই। এ ধরনের আইন ভাঙার ঘটনা যারা ঘটাচ্ছেন, তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচিতির প্রসঙ্গটা প্রাসঙ্গিক। নিশ্চিতভাবেই তারা ক্ষমতাবান এবং এই ক্ষমতার অপপ্রয়োগ কিংবা অপপ্রয়োগের চেষ্টা থাকে তাদের নিরন্তর। এই নারীর ক্ষেত্রেও সেটা ঘটেছে।

বিজ্ঞাপন

আইন ভাঙতে মরিয়া ওই নারী নিজের ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশে নিজেকে সংসদ সদস্যের কন্যা, জাতীয় কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর লোক বলে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি এমপি-কন্যা কিনা এটার সত্যাসত্য নিরূপণের দরকার নেই। কারণ এমপি-কন্যা হলেও আইন ভাঙার কোনো অধিকার তার থাকার কথা নয়। আর এমপি-কন্যা না হলেও নাম উল্লেখ না করা এমপির নাম ভাঙিয়ে আইন ভাঙার যে অপচেষ্টা করেছেন, সেটাও অপরাধ। জাতীয় কমিটির সদস্য বলে তার দেওয়া যে পরিচয়, সেটা কিসের জাতীয় কমিটি? আর তেমন হলেও বাংলাদেশে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো কমিটিরই আইন ভাঙার অধিকার নেই। এর বাইরে তাদের অন্য পরিচয়টা হচ্ছে ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর লোক’। এই পরিচয়টা স্পর্শকাতর। দেশে ‘প্রধানমন্ত্রীর লোক’ পরিচয় দিয়ে আইন ভাঙার যে প্রবণতা, সেটা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। এ ব্যাপারে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ জরুরি।

‘প্রধানমন্ত্রীর লোক’— এমন পরিচয় দেওয়ার হক কারও নেই। প্রধানমন্ত্রী একজন ব্যক্তি হলেও সাংবিধানিকভাবে তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তিনি সরকারপ্রধান এবং তার অধীনে গোটা মন্ত্রিসভার সদস্যরা যাবতীয় কাজ করে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী যেকোনো নির্দিষ্ট দলের হলেও তার পরিচিতি সার্বজনীন। তাই কেউ নিজেকে একা ‘প্রধানমন্ত্রীর লোক’ পরিচয় নিয়ে অন্যায় কিছু করতে পারেন না।

আইন ভাঙতে মরিয়া মরিয়া যে নারী নিজেকে ‘প্রধানমন্ত্রীর লোক’ পরিচয় দিয়েছেন, তিনি অন্যায় করেছেন; প্রধানমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে অপরাধ করেছেন। তিনি একজন সরকারি কর্মচারীকে তাচ্ছিল্য ও দুর্ব্যবহার করতে গিয়ে এমন দাবি করে নিজের অন্যায়কে জায়েজ করতে চেষ্টা করেছেন। অথচ এটা করতে পারেন না তিনি। দেশের একজন নাগরিক হিসেবে তিনি যেমন ‘প্রধানমন্ত্রীর লোক’, ঠিক একইভাবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যে ট্রাফিক সার্জেন্ট দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন, তিনিও ‘প্রধানমন্ত্রীর লোক’। আর তার সেই গাড়ির কারণে ভোগান্তির শিকার হওয়া অগনিত মানুষগুলোও ‘প্রধানমন্ত্রীর লোক’।

ক্ষমতা প্রকাশে উন্মত্ত কিছু লোক সারাদেশে এমন ঘটনা প্রতিদিন যে ঘটাচ্ছে না, তা কেউ বলতে পারবে না। এজন্যে দরকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ, প্রতিটি ক্ষেত্রে। ক্ষমতাবান ও ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিদের এমন অন্যায় ধমকে যদি প্রশাসন তটস্থ থাকে, তাহলে একে একে আমাদের বিভিন্ন সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়বে। সারাদেশে ঘটা সবগুলো ঘটনার সমাধান সহসা যে হয়ে যাবে, তা নয়। তবে যে ঘটনাগুলো প্রকাশ কিংবা আলোচিত হচ্ছে বা হবে, সেসব বিষয়ে আগ্রাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

এই আলোচনা চলমান থাকতে যদি যথাযথ তদন্তপূর্বক দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তবে আগামীর অন্য অপরাধীরাও সতর্ক হবে। সরকার ও প্রশাসনের কাছে এটাই আমাদের এ মুহূর্তের চাওয়া।

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন