রবিবার ১৮ আগস্ট, ২০১৯ ইং , ৩ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

হৃদরোগ: ‘ফার্স্ট কিলার ডিজিজ’

সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৮ | ৮:৫৭ পূর্বাহ্ণ

।। জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।

ঢাকা: জাংকফুড, চর্বিযুক্ত খাবার, পর্যাপ্ত কায়িক পরিশ্রমের অভাব, ধূমপান ও অ্যালকোহল পান, ভৌগোলিক অবস্থান এবং সর্বোপরি মানুষের জীবনযাপনের পরিবর্তন দেশে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেশে দিন দিন বাড়ছে হৃদরোগে আক্রান্তদের সংখ্যা। বয়স্কদের পাশাপাশি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন তরুণরাও। চিকিৎসকরা বলছেন, বর্তমান বিশ্বে হৃদরোগকে বলা হচ্ছে ‘ফার্স্ট কিলার ডিজিজ’।

আজ ২৯ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব হার্ট দিবস। বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালন করা হচ্ছে ‘আমার হার্ট, তোমার হার্ট’ প্রতিপাদ্য ধারণ করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৭০ সালের পর উন্নত বিশ্বে মৃত্যুহার কমে গেলেও বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম কারণ হৃদরোগ। একইসঙ্গে মধ্য ও স্বল্প আয়ের দেশগুলোতেও হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী এবং এর কারণে মৃত্যুর হার বাড়ছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষ (৩১ শতাংশ) মারা যাচ্ছেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। আর নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে শতকরা ৮০ শতাংশ মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ। আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ মানুষ হৃদরোগে মারা যাবে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

বিজ্ঞাপন

চিকিৎসকরা বলছেন, কিছুদিন আগ পর্যন্তও দেশে বয়স্কদের মধ্যেই হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা ছিল বেশি। তবে গত কয়েকবছরে তরুণ, এমনকি শিশুদের মধ্যেও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা ক্রমবর্ধমান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হৃদরোগীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তেমনি বেড়ে চলেছে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে শতকরা প্রায় ৫৩ ভাগ মৃত্যুর কারণ অসংক্রামক রোগ। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে হৃদরোগ। বাংলাদেশে শতকরা ২৭ ভাগ মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ।

দেশে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে

যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, আইসিডিডিআরবি ও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট পরিচালিত ব্রেভ স্টাডি (বাংলাদেশ রিস্ক অব অ্যাকিউট ভাসকুলার ইভেন্টস) নামের এক জরিপ থেকে জানা যায়, দক্ষিণ এশিয়াতে ২০১০ সাল নাগাদ হৃদরোগের আক্রমণ হবে দ্বিগুণ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বাংলাদেশে হৃদরোগের প্রকোপ বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। বিশ্বে বর্তমানে প্রতিবছর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে এক কোটি ৭৩ লাখ মানুষ, যার মধ্যে অপরিণত বয়স এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মারা যাচ্ছে শতকরা ৮০ শতাংশ।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ২০১৭ সালের বার্ষিক হেলথ বুলেটিনে বলা হয়েছে, রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে (এনআইসিভিডি) প্রতিবছরই হৃদরোগ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিষ্ঠানটির বহির্বিভাগে ২০১৬ সালে দুই লাখ ২৬ হাজার ১৩৮ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন এবং ৬৪ হাজার ৯০৬ জন ভর্তি হয়েছেন। আর ২০১৫ সালে বহির্বিভাগে দিয়ে দুই লাখ ২২ হাজার ১৮৬ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন এবং ৬৩ হাজার ৩৯০ জন ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে।

এর আগের বছর ২০১৪ সালে দুই লাখ ৫৫৩ জন আউটডোরে এবং ৪৯ হাজার ২৮৩ রোগী ভর্তি হয়েছেন। তার আগের বছর এক লাখ ৭২ হাজার ২৬৯ রোগী আউটডোরে এবং ৪৩ হাজার ৩৪১ জন ভর্তি হয়েছেন।

পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছরই হৃদরোগীর সংখ্যা বাড়ছে। দেশে অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি যেসব হাসপাতাল রয়েছে, সেখানকার হিসাবেও হৃদরোগে আক্রান্ত চিকিৎসা গ্রহণকারী লোকের সংখ্যা বাড়ছে।

এদিকে, অতি সম্প্রতি রাজধানীর হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালটির ওয়ার্ড ও কেবিন ছাপিয়ে তার মতো আরও অনেক রোগীরই স্থান হয়েছে হাসপাতালের মেঝেতে, বারান্দায়, সিঁড়ির মুখে, এমনকি বাথরুমের সামনেও।

চিকিৎসকরা বলছেন, গত কয়েকবছর ধরেই দেশে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। আর সে কারণেই এ রোগের জন্য বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালটিতেও বেড়েছে রোগীর সংখ্যা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ২০১৭ সালের হেলথ বুলেটিনে উঠে এসেছে, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে পরের বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের সরকারি হাসপাতালের ভর্তি হওয়া রোগীর মৃত্যু নিয়ে বিশ্লেষণ। এতে বলা হয়েছে, দেশের ৫১৪টি সরকারি হাসপাতালের মধ্যে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ৩৭ দশমিক ৭৩, জেলা হাসপাতালে ৩৩ দশমিক ৫৮ ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ৩৩ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ রোগীর মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ।

এদিকে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ৫ বছরের বেশি রোগীদের মধ্যে হৃদরোগ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার ৩৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

এই জরিপ অনুযায়ী শ্বসনতন্ত্রের রোগে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, মস্তিষ্কের রক্তনালীর রোগে ৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ, সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে ৫ দশমিক ২৭ শতাংশ, বিষক্রিয়ায় ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ, গর্ভধারণ ও এ সংক্রান্ত জটিলতায় ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং দুর্ঘটনাজনিত আঘাতে ১ দশমিক ১৩ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হয়।

রোগীর চাপ বাড়ছে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। বেড ছাড়িয়ে তাদের স্থান দিতে হচ্ছে বারান্দাসহ বিভিন্ন স্থানে

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী সারাবাংলাাকে জানান, উচ্চ রক্তচাপ, কায়িক পরিশ্রম না করা, ধুমপান, অতিরিক্ত ওজন, সুষম খাদ্যের অভাব, মাত্রাতিরিক্ত কোলেস্টরেল হৃদরোগের অন্যতম কারণ।

তিনি বলেন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে এসব রোগীদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ মৃত্যুর কারণ হলো হৃদরোগ।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, সামান্য কিছু অভ্যাস যদি পরিবর্তন করা সম্ভব হয়, তাহলে হৃদরোগ, স্ট্রোকের মত বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।

তিনি বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান বন্ধ করা, ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা, ওজন, খাদ্যাভাস পরিবর্তন, শাকসবজি এবং কাঁচা ফলমূল খাওয়া হৃদরোগীদের জন্য অবশ্য কর্তব্য। সতর্ক হলে কিন্তু এসব থেকে দূরে থাকা সম্ভব। কেবল হৃদরোগ নয়, অনেক বড় বড় রোগের সম্ভাবনা অনেক কমে যায় এসব পরিবর্তনে।

দেশে বর্তমানে হৃদরোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের খাদ্যাভাসে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেড়েছে। আবার মানুষের হাঁটাচলাও কমে গেছে। আর প্রক্রিয়াজাত যেকোনো খাবারে লবণের পরিমাণ বেশি। এটি হৃদরোগের অন্যতম একটি কারণ।

হৃদরোগকে ‘ফার্স্ট কিলার ডিজিজ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশসহ পৃথিবীজুড়েই এখন হৃদরোগের কারণে মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ। রক্তে চর্বি বা কোলেস্টরলের আধিক্য, ‍দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপ, নিয়ন্ত্রণহীন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কায়িক পরিশ্রম না করা হৃদরোগের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত।

তিনি আরও বলেন, ‘বাঁচতে হলে নিয়মিত কায়িক শ্রম হয়— এমন কাজ করতে হবে। খাবার তালিকার বাইরে রাখতে হবে প্রক্রিয়াজাত খাবার, প্রাণিজ আমিষ ও লবণ। একইসঙ্গে জীবনকে ইতিবাচক হিসেবে নিতে হবে।’

‘জীবনে যেমন ভালো দিক রয়েছে, তেমনি খারাপ দিকও থাকবে— এটা আমাদের মনে নিতে হবে এবং মেনে নিতে হবে। জীবনকে সুন্দর করে দেখতে হবে। তাহলে দুশ্চিন্তা থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। মানসিক চাপ কমাতে হবে, হতাশাগ্রস্ত হওয়া যাবে না কোনোভাবেই, তাহলেই হৃদরোগ থেকে দূরে থাকা যাবে,’ — বলেন ডা. লেলিন চৌধুরী।

সারাবাংলা/জেএ/একে/টিআর

Advertisement
বিজ্ঞাপন

Tags: , ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন