রবিবার ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৩১ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

নতুন দেশে, প্রথম ঘরে. . .

অক্টোবর ১, ২০১৮ | ৭:০৩ অপরাহ্ণ

তানভীর নাওয়াজ ।। পর্ব-২ ।।

বিজ্ঞাপন

টরোন্টা আসার পর দেড় মাসের মতো আমি এয়ারবিএনবি’তে রুম ভাড়া নিয়ে ছিলাম। খুবই মজার অভিজ্ঞতা। এই দেড় মাসে আমি তিন দেশের তিন বাড়িওয়ালা, আর পাঁচ দেশের হাউসমেট দেখার সুযোগ পেয়ে গেলাম। আসার পর প্রথম এক সপ্তাহ ছিলাম এক ইন্ডিয়ান মহিলার বাসায়। ভদ্রমহিলার নাম ‘গীতা’। আমি প্রথম দিন গিয়ে যখন উঠলাম তখন দুপুর। উনি কাজে ছিলেন। আমার সাথে ম্যাসেজে কথা হলো। বললেন বিকেলে ফিরে দেখা করবেন। আমার রুম বেসমেন্টে। আধুনিক দেশের দরজার আধুনিক লক। উনি আমাকে টেক্সট করে দরজা আনলক করার কোড পাঠালেন। সেই কোড টিপাটিপি করে আমি টুস করে দরজা খুলে ফেললাম। লাল, কমলা আর সোনালী তিনটা লাগেজ ঠেলে ঠেলে নিচে নামছি, কমন লিভিং থেকে কয়েকটা ছেলে-মেয়ের কিচির মিচির শোনা যাচ্ছে। আমাকে দেখেই সবাই একসাথে ‘হাই’ বলে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, শুধু একটা মেয়ে ফিক করে হেসে দিলো। সম্ভবত আমার ব্যাগের রং দেখে। আমি হাই বলতেই একটা ছেলে আমার দিকে এগিয়ে এলো।
লেট মি হেল্প ইউ। বলেই একটা লাগেজ আমার হাত থেকে নিয়ে নিলো।
আমি ওদের ‘হাই’ এর উত্তরে ‘হ্যালো’ বলবো নাকি আগে ছেলেটাকে ‘থ্যাংক ইউ’ বলবো এই নিয়ে কনফিউজড হয়ে গেলাম। হাসি হাসি মুখ করে সবার দিকে তাকিয়ে আছি এর মধ্যে হেসে দেয়া মেয়েটা আমার সামনে এসে বললো-
ওয়েলকাম স্যার। ইওর রুম নাম্বার?
আমি মেয়েটার মুখে স্যার শুনে হেসে দিলাম।
ফাইভ সি ইজ মাই রুম।
হোয়াই আর ইউ কলিং হিম স্যার? লুক হি ইজ ব্লাশিং। পাশ থেকে আরেকটা মেয়ে বলে উঠলো। সবাই এক সাথে হেসে দিলাম। কি সুন্দর আর সাবলীল অভ্যর্থনা!
আই এ্যাম ‘পাটেল’, ব্যাগ নেয়া ছেলেটা আমাকে বললো।
হাই পাটেল, নাইস টু মিট ইউ, আই এ্যাম তানভীর।
প্লিজ কাম দিস ওয়ে তানভীর।
অন্যদের দিকে তাকিয়ে একটা হালকা হাসি দিয়ে আমি পাটেলের পিছে পিছে আমার রুমের দিকে হাঁটা দিলাম।
রুমের দরজা খোলাই ছিলো। ছোট্ট কিন্তু সুন্দর ছিমছাম একটা রুম।
সো ইউ আর ফ্রম বাংলাদেশ, রাইট?
ইয়েস, হাউ ডু ইউ ইভেন নো দ্যাট?
গীতাদি ইনফরমড মি দ্যাট ইউ আর কামিং। সি টোল্ড মি টু লুক আফটার ইউ আনটিল সি ইজ ব্যাক।
ওহ ওকে।
এ্যান্ড আই এ্যাম সরি ফর নেহা’স বিহেভিয়র। সি ইজ এ কিড।
বুঝলাম হেসে দেয়া পাকুনটার নাম নেহা। দেখে বাচ্চা মেয়েইতো মনে হলো, বড়জোর ১৯ কি ২০ হবে। অলমোস্ট আমার মেয়ের বয়সী।
ইটস অল রাইট। নো প্রবলেম। আমি হেসে দিয়ে বললাম।
প্যাটেল এর কাছ থেকে শুনলাম ওরা সবাই ইন্ডিয়ান। সেন্টিনিয়াল কলেজের স্টুডেন্ট। বেসমেন্টের একপাশে ছেলেরা থাকে অন্যপাশে মেয়েরা। কিচেন আর লিভিং স্পেসটা কমন। নিচে দুটো রুম এয়ারবিনবিতে দেয়া। ওপরে আর চারটা রুম আছে এয়ারবিনবি।
ইউ চেঞ্জ এ্যান্ড ফ্রেশেন আপ, দেন জয়েন আস ফর কফি ইফ ইউ আর নট টায়ার্ড।
ইয়া শিওর। আই এ্যাম কামিং। আমি বললাম।
প্যাটেল দরজা টেনে দিয়ে চলে গেলো।
আমি স্যুট খুলে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। প্রায় তিরিশ ঘন্টা পর বিছানায় শুয়ে আমার শরীর ছেড়ে দিয়েছে। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি টেরও পাইনি।
দরজা নক করার শব্দে ঘুম ভাঙলো।
তানভীর, আর ইউ স্লিপিং? ইওর কফি ইজ গেটিং কোল্ড। পাটেলের গলার আওয়াজ।
আমি লাফ দিয়ে উঠলাম। ওহ আই এ্যাম কামিং, জাস্ট গিভ মি টু মিনিটস।
তাড়াতাড়ি কাপড় চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে কমন রুমে গেলাম।
ওরা সবাই মিলে বসে গল্প করছে। চমৎকার বিকেলের নাস্তার আয়োজন! পাকোড়া, চানার ডাল, আচার, রুটি, সাথে শশা, টমেটো আর লেটুস দিয়ে বানানো সালাদ। আমার জন্য সুন্দর করে একটা প্লেট সাজানো।
ওয়াও! আমি মুগ্ধ হয়ে বললাম।
প্লিজ হ্যাভ এ সিট। পাটেল একটু সরে গিয়ে আমাকে বসার জায়গা করে দিলো।
ওদের সবার সাথে পরিচিত হলাম। পাটেল, নিরাজ আর এ্যালেন এক রুমে থাকে। নেহা, মালতি আর জানভী থাকে আরেক রুমে। পাটেল ওদের সবার বড়ো আর নেহা সবার ছোট। কেউ বিজনেস পড়ছে তো কেউ হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট। ওদের খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারটা বেশ মজার লাগলো। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে মিলে একটা টিম। এক টিম পুরো সপ্তাহ বাজার করে, গ্রোসারি গুছানো, স্টোর করা এগুলো সব ওদের কাজ, অন্য এক টিম কাটাকুটি রান্না-বান্না আর নেক্সট টিম খাবার সার্ভ করা, খাওয়ার পর সব ক্লিন করে কিচেন গুছিয়ে রাখে। এভরি উইক টিম ডিউটি চেঞ্জ হয়। রাতের খাওয়াটা ওরা সবাই একসাথে খায়, আইডিয়াল টাইম রাত ১০ টা। কেউ চাইলে আগে খেয়ে নিতে পারে বা বাসায় না থাকলে পরে এসে খেতে পারে, বাসায় থাকলে সবাই এক সাথেই খেতে বসে।

২০-২৫ বছর বয়সের কতোগুলো ছেলেমেয়ের ডিসিপ্লিন আর লাইফ স্টাইল আমার কাছে চমৎকার লাগলো। এদের মধ্যে নেহা ছাড়া বাকি পাঁচজনই লেখাপড়ার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজও করে।
পাকোড়া খেয়ে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। চানার ডালটাও অসাধারণ। ডালে টালা জিরা গুড়ো করে দেওয়াতে অসাধারণ একটা স্বাদ হয়েছে। আহ্। আমার ‘মা’ এমন করে বুট ডাল রান্না করতেন!
খেতে খেতে আমরা গল্প করছি, আমি কি করতাম, এখানে আমার প্ল্যান কি... এরমধ্যে গীতা’দি চলে আসলেন। আমাকে দেখেই একগাল হাসি দিলেন।
কেমন আছো তানভীর? কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো এখানে?
আমি ওনার মুখে বাংলা শুনে অবাক হলাম। পরে উনি বললেন, ওনার জন্ম বেড়ে ওঠা সব কলকাতায়। স্টুডেন্ট হয়ে এসেছেন ৩১ বছর আগে। এখন এখানেই সেটেল্ড। একটা ব্যাংকে কাজ করেন। ওনার হাজব্যান্ডও ব্যাংকে কাজ করেন। একটাই মেয়ে, ইউনিভার্সিটি অফ টরেন্টোতে পড়ছে।
এ্যাই, তুমি বাঙালি, তোমাকে চা করে দেই, চা খাবে?
চা এর কথা শুনেই আমার চোখ চকচক করে উঠলো!
জ্বি, দুধ চা হলে খেতে পারি, আমি আস্তে করে বললাম।
নেহা মেইকস্ এ্যামেইজিং মিল্ক টি! নেহা, ক্যান ইউ মেইক টি ফর তানভীর এ্যান্ড মি এ্যান্ড ইফ সামওয়ান এলস্ ওয়ান্ট টু হ্যাভ? ইউ মেইক ইট গুড ডার্লিং, গীতাদি হাসতে হাসতে নেহাকে বললো।
ইউ মিন ফর আঙ্কেল? নেহা আমাকে দেখিয়ে মুখ বাকিয়ে বললো!
হাউ কাম হি বিকেইম ইউর আঙ্কেল? গীতাদি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
ওহ্ বিকজ হি ইজ বেয়ারড লাইক মাই ফাদার।
আমি এতোক্ষণ ধরে ওদের আলাপ শুনছিলাম। পাশ থেকে এ্যালেন বলে উঠলো, সো ইউ ফার্স্ট কল হিম স্যার দেন আঙ্কেল, আই ওয়ান্ডার হোয়াট ইজ নেক্সট!
নো প্রবলেম, সি ইজ অলমোস্ট অফ মাই ডটার’স এইজ, নেহা কল মি আঙ্কেল, আমি বললাম।
আমার কথা শুনে সবাই হো হো করে হেসে দিলো।
নেহা ইউ আর ক্রেজি, গীতাদি হাসতে হাসতে ওকে বললেন, ওকে ডোন্ট ওয়ারি, আই এ্যাম মেকিং টি।
নো নো, লেট মি মেইক ইট, বলে নেহা উঠে চা বানাতে চলে গেলো।
গীতাদি আমাকে হাসতে হাসতে বললেন, এরা সারাক্ষণ এই বাসাটা মাতিয়ে রাখে বুঝলে!
আমরা গল্প করতে করতে নেহা চা নিয়ে আসলো। মগ ভর্তি গরম ধোয়া ওঠা চা! আমি হাত বাড়িয়ে মগটা নিয়ে চুমুক দিলাম। চমৎকার হয়েছে। চায়ে এলাচির গন্ধটা আরও ভালো লাগছে। নেহা আমার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে।
ওয়ান্ডারফুল। ভেরি টেস্টি। থ্যাংকস নেহা! আমি বললাম।
আই হোপ ইওর ডটার মেইকস্ ইট ইভেন বেটার ফর ইউ। এনিওয়ে ইনজয় দিস টি ফ্রম এনাদার ডটার। নেহা হেসে দিয়ে বললো।
আমি ওর কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ‘রাবেয়া’, আমার মেয়ের কথা মনে পড়ে গেলো। একটা মিশ্র অনুভূতিতে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গেলো।
নতুন দেশ। নতুন ঘর। মানুষগুলোও নতুন। কিন্তু কি অসাধারণ ক্ষমতায় এরা সবাই আমাকে আপন করে নিলো। একটু পর আমি চায়ের মগ নিয়ে বাইরে আসলাম। ঝকঝকে বিকেল। চায়ে চুমুক দিতে দিতে গুন গুন করে গাইতে থাকলাম-
‘আমার রাখতে যদি আপন ঘরে, বিশ্ব ঘরে পেতাম না ঠাই. . .’

সারাবাংলা/পিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন