রবিবার ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৩১ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

গান

অক্টোবর ৪, ২০১৮ | ১২:১২ অপরাহ্ণ

ওয়াহিদ ইবনে রেজা ।।

বিজ্ঞাপন

অমিতের মাথার ভিতর একটা গান ঘুরছে, ইংরেজি, বাংলা বা হিন্দি ইত্যাদি চেনা কোন ভাষায় নয়। খুব সরু গলায়, অচেনা ভাষায় এক তরুণী গান করে যাচ্ছে। এখনো যে ব্যাপারটা খুব খারাপ লাগছে, তা না। মনে হচ্ছে দূরে কোথাও থেকে গানটা ভেসে আসছে। তবে এমন যদি চলতে থাকে তাহলে মাথা ধরে যাবে। অমিতের মাথা ব্যাথার সমস্যা আছে। একবার মাথা ব্যাথা শুরু হলে মাইগ্রেন-সাইনাস মিলে একেবারে লেজে-গোবরে অবস্থা হয়ে যায়। অমিতের ধারণা মাথা ব্যাথার অলিম্পিক প্রতিযোগিতা হলে সে দেশের জন্য সোনা নিয়ে আসতো। অবশ্য কেন জানি মনে হয় সেটাও হত না। মানে সত্যি সত্যি যদি মাথা ব্যাথার অলিম্পিক হতো, আমাদের দেশে সেই অলিম্পিকে যাবার জন্য একটা কমিটি থাকতো। যারা নিজেদের নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকতো, ফলে প্রতিযোগীদের মধ্যে মাথাব্যাথার ঠিকমত চর্চা হতো না। গুণগুণ করে কেউ মগজের ভিতর গানও গাইতো না, অলিম্পিকে সোনা জেতাও হতো না।

অমিত তার মন অন্যদিকে ঘুরাতে চাইলে। আচ্ছা সেকি কাউকে ফোন দেবে? ইদানিং কাউকে ফোন দেয়া হয় না। ফোন দেয়ার আগে টেক্সট করতে হয়। টেক্সট ম্যাসেজের উত্তর আদান-প্রদান করতে করতে ফোন করার সময় চলে যায়। আচ্ছা মইনুলকে ফোন দিবে? মইনুল অমিতের স্কুল ফ্রেন্ড, বেস্ট ফ্রেন্ডও বলা যায়। একমাত্র ওর সাথেই যা একটু ফোনে কথা হত অমিতের। এখন অবশ্য তাও হয় না। চাকরি পেয়ে গেছে মইনুল। দেখতে দেখতে ওদের বন্ধুদের ব্যাচে এখন একমাত্র অমিতই বেকার। বেকার মানুষদের চাকুরিজীবি মানুষ অসহ্য লাগে, বিশেষ করে যারা নতুন চাকরি পায় তাদের কে আরো বেশি। নতুন চাকরি পাওয়া আর নতুন বিয়ে করার মধ্যে একটা মিল আছে। প্রতি দুইটা বাক্য পরপর আমার তো অফিস আছে বা আমার বউ কথাটা বলতে হয়। অমিতের ধারণা মানুষ মনে করে যে যত বেশি বার অফিসের বা বৌয়ের নাম নেবে, তার চাকরি বা বিয়ে ততো বেশি টেকসই হবে। খুবই হাস্যকর একটা কথা, কিন্তু এটাই মনে হয় ঠিক। নাহলে সবাই বারবার বলতে থাকে কেন?

অমিতের মাথায় গানটার ভলিউম বেড়ে গেছে। মনে হচ্ছে শিল্পী এতক্ষন গলা ছেড়ে গাচ্ছিলেন না, এখন গাচ্ছেন। প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে গাচ্ছেন। এত আত্মবিশ্বাস অবশ্য কোথা থেকে আসছে তা বোঝা যাচ্ছে না। অমিতের প্রিয় কমিক্স ছিল টিনটিন। টিনটিনে বিয়াঙ্কা কাস্তাফিয়োরে নামের এক অপেরা সিঙ্গার ছিল, যাকে বলা হতো মিলানের নাইটেংগেল। ভদ্রমহিলা এতই উঁচু স্বরে গান করতেন যে, কাচের সব জিনিস ভেঙে যেত। অমিতের মনে হচ্ছে মাথায় বিয়াঙ্কা কাস্তাফিয়োরে গান বাজছে। সে যদি তার মাথা একটু জানালার দিকে ধরে, জানালার কাচ ভাঙতে শুরু করবে। বিয়াঙ্কার গানের সাথে যুক্ত হবে কাচের ঝনঝন করে ভেঙে পড়ার শব্দ। অমিত এরচেয়ে কল্পনায় মইনুলের সাথে ফোনে কথা বলার চেষ্টা করলো। তাতে যদি ঝনঝন কমে। কল্পনার ফোনে রিং বাজছে। মইনুল ফোন ধরেই বললো, মামা কথা বলতে পারবোনা, অফিস। প্রচন্ড চাপ। আমাদের অফিসে বুচ্ছিস, ...অফিসে তারপর...অফিস মানে একটা পেইন...ইন্টার্নটা যা পইড়া আসছে না অফিসে মামা। দুই মিনিটের মধ্যে মইনুল অফিস বলবে সাড়ে ১৭বার। হারামজাদা এত ব্যস্ততার মধ্যে ফোন ধরে কেন তা বোঝে না অমিত।

অমিত গালি দিয়ে উঠে, খ, ম, চ শ্রেণীর গালি। গালি দিয়ে কাল্পনিক ফোন শব্দ করে রেখে দেয়। আধুনিক মোবাইল ফোন মানুষকে অনেক কিছু দিয়েছে, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে ফোন শব্দ করে রেখে দেবার মত মৌলিক কিছু অধিকার। অবশ্য মোবাইল ফোন আছাড় দেয়া যায়, ছুড়েও মারা যায় দূরে। স্মার্ট ফোনে সেই সুবিধাও নেই। এত হাজার টাকা দিয়ে কেনা ফোন, ছিনতাইকারী বা পকেটমারের হাতে যাওয়ার আগে পর্যন্ত পারলে বুকের মধ্যেখানে রাখতে ইচ্ছা হয়। অমিত আবার গালি দেয়, শুধুশুধু জোরে জোরে বলে, খ, ম, চ। খালি ঘরে গালি দিতে বেশ ভাল লাগে অমিতের। মাথার গানের সুরে একটু পরিবর্তন হয়। গায়িকা মনে হয় মনে করছে গালি তাকে দেয়া হচ্ছে। তার গলায় এখন করুন সুর, ইংরেজিতে যাকে বলে প্যাথোজ। বিয়াঙ্কার বদলে মনে হচ্ছে এক চীনা তরুণী তার এক জীবনের সব দুঃখের কথা গানে গানে বলে ফেলছে! চীনা কমিক্সও খুব পছন্দ করতো অমিত। আসলে ছোটবেলা থেকে তার শখই ছিল কমিক্স পড়া। নিজে নিজে কমিক্স বানাতেও পারতো। আঁকার হাত ছিল ভাল, স্কুলে, কলেজে, জেলা লেভেলে পুরস্কার পাওয়া। কিন্তু যেটা হয় আরকি, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-বিবিএ হবার জীবন দৌড়ে আর্টিস্ট বেচারি মার খায়। অন্য সবার দেখাদেখি অমিতও ওই তিনটার একটা হয়ে বসে আছে। কোনটা? সেটা এই মুহূর্তে জানা অর্থহীন। কারন উত্তর যাই হোক না কেন, ফলাফল শূন্য।

বিজ্ঞাপন

অমিতের মাথায় গানটা বেড়ে গেছে। গানের সাথে যুক্ত হয়েছে গিটারের ঝনঝন শব্দ। মনে হচ্ছে রাগ করে কেউ গিটার বাজাচ্ছে। সুরটা অবশ্য অমিতের চেনা। এই সুরে সে সানজিদাকে একটা গান গেয়ে শুনিয়েছিল। সেই কত বছর আগে, অথচ মনে হয় সেদিনের ঘটনা। ভার্সিটির অডিটোরিয়ামে অমিত মাইকে বলে উঠলো, দিস সং ইজ ফর ইউ, অনেকটা হিন্দি সিনেমার মত। জীবনটা হিন্দি সিনেমা হলে বেশ হতো, কাঁপা কাঁপা গলায় নায়িকার নাম নিতে পারলেই খেলা শেষ! কিন্তু জীবনটা সাদাকালো বাংলা সিনেমা দেখেই বোধহয় সানজিদার এখন দুই মেয়ে। আচ্ছা, ও না সব সময় পুলিশ হতে চাইতো? বিসিএস ক্যাডার হতে চাইতো? হাউজ ওয়াইফ ব্যাপারটাকে ছোট করে দেখার জন্য নয়, অমিত জানে সানজিদার মনে আরো কিছু করার ইচ্ছা ছিল। অমিত ওকে বলেছিল, তুমি যা চাও সেটাই হবে। অমিত মনে প্রাণে সানজিদাকেই চাইতো। অমিত জানতো না সানজিদা মনে প্রাণে কি চায়। এই যে আজকে ও, কি সুখে সুখে বাচ্চাদের ছবি ভিডিও শেয়ার দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। বড়ো মেয়েটা স্কুলে পড়ে, কম্পিটিশনে রবীন্দ্রসংগীত গায়। গুণগুণ করতে করতে গায়, ‘আয় তবে সহচরী হাতে হাতে ধরি ধরি...’। আচ্ছা এই গানটাই কি অমিতের মাথায় কুরে কুরে খাচ্ছে। এই গানটির যন্ত্রনায় কি অমিতের ইচ্ছে করছে একটি পিস্তল দিয়ে নিজের খুলি উড়িয়ে দিতে? তার কি মনে হচ্ছে এই গানটা সে নিজে হয়তো পোস্ট করতে পারতো। সানজিদা আহ্লাদী করে বলতো, তুমি মেয়েকে নিয়ে বেশি বেশি করো। অমিতের চোখ ভিজে যাচ্ছে, কি হাস্যকর একটা ব্যাপার। মগজের গানটা মায়া নিয়ে জড়িয়ে ধরে অমিতকে। এই মুহূর্তে এই গানটি ছাড়া তার আর কেউ নেই।

সারাবাংলা/পিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন