বিজ্ঞাপন

ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার- মা ও শিশুর অধিকার নাকি বিড়ম্বনা?

October 8, 2018 | 10:26 am

তিথি চক্রবর্তী।।

বিজ্ঞাপন

বড় মেয়েকে স্কুলে নিয়ে এসেছেন আয়েশা আমিন, কোলে চারমাসের ছোট ছেলে। মেয়েকে পরীক্ষার হলে পাঠিয়ে ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে আছেন স্কুলের গেটের সামনে। একটু পর ছেলে ক্ষুধায় কাঁদতে শুরু করলো। কিন্তু কোথায় ব্রেস্ট ফিড করাবেন এ নিয়ে ভাবনায় পড়ে গেলেন আয়েশা। আশেপাশে কোথাও একটু নিরিবিলি জায়গা খুঁজে পেলেন না যেখানে তিনি খাওয়াতে পারেন। আয়েশা বলেন, সবার তো প্রাইভেট গাড়ি থাকে না। যাদের নেই তারা বাইরে গেলে কীভাবে বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়াবে?

আয়েশার এই প্রশ্নটি অনেকের মধ্যেই জাগে। এদেশে স্কুল, কলেজ, শপিং মল, হাসপাতাল, রেল স্টেশন ও বাস স্টেশনসহ পাবলিক প্লেসে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার নেই। কেবলমাত্র বড় দু-একটি হাসপাতালে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার থাকলেও সাধারণ মানুষ যেসব জায়গায় চলাফেরা করে সেখানে এই সুবিধা নেই। বেশিরভাগ মেয়ে বাইরে গেলে নিজের উদ্যোগে একটি কোণ খুঁজে নিয়ে বাচ্চাকে দুধ খাওয়ায়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক কোন উদ্যোগ নেই বললেই চলে।  তাছাড়া জনবহুল জায়গাগুলোতে বাচ্চার ডায়াপার পরিবর্তনের জন্যও আলাদা ব্যবস্থা নেই।

বিজ্ঞাপন

২০১০ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাংলাদেশে প্রতিবছর মাতৃদুগ্ধ দিবস পালিত হচ্ছে। সেই সাথে আরেকটি নির্দেশনা ছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা, সরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রেলওয়ে ও বাস টার্মিনাল, শপিংমলসহ প্রত্যেকটি জনবহুল জায়গায় ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করা। এই নির্দেশনার অনেক বছর পেরিয়ে গেলেও কিছু হাসপাতাল বা অফিস ছাড়া অন্য কোথাও ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপন করা হয়নি। এ সম্পর্কে  ইনফ্যান্ট অ্যান্ড ইয়াং চাইল্ড ফিডিং (আইওয়াইসিএফ) নীতিমালা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে চাইল্ড ব্রেস্ট ফিডিং আইন আছে। ওই দুটি দেশে শৌচাগারের সাথে স্বল্প পরিসরে ডায়াপার পরিবর্তনের জায়গা ও বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি সেসব দেশে দুই ঘন্টা পর পর গণপরিবহনে যাত্রাবিরতির ব্যবস্থা আছে, ওই সময়ে মায়েরা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারে। সম্প্রতি পাশ্ববর্তী দেশ ভারতেও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ২০১৭ সালে ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রত্যেক রেলস্টেশনে ১০০টি কক্ষ রাখা হবে সন্তানকে দুধ খাওয়ানোর জন্য।

পাবলিক প্লেসে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারটি সামাজিক ও আইনগত দিক থেকে পৃথিবীর একেক দেশ একেকরকম। আগে যুক্তরাজ্যের মেয়েরা প্রকাশ্যে সন্তানকে দুধ খাওয়াতে পারত না। কিন্তু চলতি বছরে যুক্তরাজ্যের ৫০টি প্রদেশে একটি আইন পাশ করেছে দেশটির সরকার। এই আইন অনুযায়ী পাবলিক প্লেসে মেয়েরা অ্যাপ্রোন পড়ে বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে পারবে।

অষ্ট্রেলিয়া, এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশে এখনও পাবলিক প্লেসে ও কর্মক্ষেত্রে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার নেই। সৌদি আরবে এই বিষয়টি আরও কঠোরভাবে মেনে চলা হয়। সৌদি নারীরা সন্তানকে ঘরের বাইরে বুকের দুধ খাওয়াতে পারে না।

একটি নামকরা অনলাইন পত্রিকায় সাংবাদিকতা করছেন শেখ সিরাজুম মুনিরা নীরা। তার ছেলে যখন বুকের দুধ খেত তখন ছেলেকে নিয়ে বাইরে গেলেই সমস্যায় পড়তেন তিনি। বাচ্চাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময়ও তিনি বুকের দুধ খাওয়াতে পারতেন না। তিনি বলেন, আমাদের দেশে ছোট বাচ্চাকে নিয়ে বাইরে যাওয়াই সমস্যা। বাচ্চা দুধ খাওয়ার জন্য কাঁদে। কিন্তু মায়ের কিছু করার থাকে না। তাছাড়া বাচ্চাকে কোথাও শুইয়ে দিয়ে ডায়াপার পরিবর্তন করারও কোন ব্যবস্থা নেই।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ প্ল্যানার্স এর সহ সভাপতি আকতার মাহমুদ বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশের নগরায়ন হয়নি। ফলে সামঞ্জস্যহীনতা রয়েছে। তাছাড়া দেশের মানুষের মধ্যে জেন্ডার সংবেদনশীলতার ধারণাও গড়ে ওঠেনি। সন্তানের মায়ের কিছু বিশেষায়িত প্রয়োজন বা চাহিদা আছে। সেগুলো নিয়ে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তবে আস্তে আস্তে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের কিছু কিছু কর্পোরেট অফিসে এখন মায়েদের ব্রেস্ট ফিডিং এর জন্য আলাদা ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তবে তা এখনও অনেক সীমিত। কারণ আমাদের দেশে দ্রুত কোনকিছুর পরিবর্তন হয় না।

দেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু কর্মজীবী মায়েদের জন্য বেশিরভাগ কর্মস্থলেই ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার নেই। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অভিছন্দা রিতু মা হয়েছেন ছয় মাস আগে। রিতু বলেন, আমি অফিসের কাজে মনোযোগ দিতে পারিনা। বাচ্চাকে রেখে অফিসে আসতে হয়। সন্ধ্যার আগে বাসায় যেতে পারিনা। বাচ্চা দুধ খাওয়ার জন্য কাঁদে। ফোনে ওর কান্না শুনলে আমি অফিসে আর কাজ করতে পারিনা। অফিসে ডে কেয়ার সেন্টার, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার কিছুই নেই। কীভাবে একজন মা এসব মেনে নিয়ে কাজ করবেন!

রিতুর মতো অসংখ্য মা তার সন্তানকে রেখে কর্মক্ষেত্রে যায়। অথচ অনেক অফিসে ডে কেয়ার সেন্টারও নেই। একজন মা যখন আট ঘন্টা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারে না তখন এর প্রভাব পড়ে শিশুর ওপর। শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য তা ক্ষতিকর হয়। কষ্ট হয় মায়েরও, শারীরিক ও মানসিক উভয়দিকে।

বড় কিছু হাসপাতালে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার থাকলেও অধিকাংশগুলোতেই নেই। এজন্য অসুবিধায় পড়ছেন অনেক মা। ঢাকা মেডিকেল কলেজে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার থাকলেও বেশিরভাগ সময় সেটি বন্ধ থাকে বলে জানা গেছে।

দুধের শিশুকে নিয়ে পাবলিক যানবাহনে উঠলে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয় মাকে। যথেষ্ট আড়াল করে বুকের দুধ খাওয়ালেও কিছু মানুষের দৃষ্টি আটকে যায় এর মধ্যে। একজন মা তার সন্তানকে দুধ খাওয়াচ্ছে, একে স্বাভাবিকভাবে নেবার মত চোখও নেই তাদের। দীপা ইসলাম (ছদ্মনাম) তার জীবনে ঘটে যাওয়া এমন একটি অভিজ্ঞতার কথা জানালেন।

তিনি জানান, চলতি বছরে রোজার ঈদে চার মাসের ছেলেকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিলেন দীপা। ট্রেনে অনেক ভিড় ছিল। কোনরকম ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে ছিলেন। এর মধ্যে ছেলেকে কয়েকবার ব্রেস্ট ফিড করাতে হয়েছে। আলাদা একটা ওড়না দিয়ে ঢাকলেও সামনে বসে থাকা কয়েকজন পুরুষের দৃষ্টি কোনভাবেই এড়ানো যাচ্ছিল না। দীপা বলেন, আমি হতবাক হয়ে গেছি। এরকম লোলুপ দৃষ্টি দেখলে মনে হয়, এরা কোনদিন মায়ের দুধ খায়নি।

 

 

ছোট বাচ্চাকে নিয়ে রাস্তায় বের হলেই নানা সমস্যায় পড়তে হয় মাকে। এজন্য অনেক মা বাচ্চা হওয়ার পর ঘুরতে যাওয়া প্রায় বন্ধ করে দেন। চাকরি করলে কোনরকম অফিস শেষ করে বাসায় ফিরে যান।

আমাদের দেশে অনেক প্রতিষ্ঠানে ধুমপান জোন আছে, নামাজ ঘর আছে। অথচ কোন ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার নেই। নিরাপদে ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য ব্রেস্ট ফিডিং কর্নারের কোন বিকল্প নেই। অথচ এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ খুবই সামান্য।

বেশিরভাগ শপিং মলে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার নেই। নিউমার্কেট, গাউছিয়া, আজিজ সুপার মার্কেট, ইষ্টার্ণ প্লাজা, আড়ং-এ এই সুবিধা নেই। বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সে বাচ্চার ডায়াপার পরিবর্তনের জন্য ছোট্ট একটি জায়গা থাকলেও ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার নেই। সেখানে ডায়াপার পরিবর্তনের পর বুকের দুধ খাওয়াতে চাইলেও সম্ভব না। কারণ মায়ের বসার কোন ব্যবস্থা নেই। এজন্য অনেক মা চাইলেও সেখানে তার বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে পারেনা।

আকতার মাহমুদ বলেন, একজন মা বাইরে গেলে তার সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য কেন দুশ্চিন্তা করবে? এই সুবিধা পাওয়া প্রত্যেক মা ও সন্তানের অধিকার। তিনি বলেন,  সিদ্ধান্ত নেবার জায়গায় মেয়েরা যত বেশি আসবে এই অবস্থার তত দ্রুত পরিবর্তন হবে। অনেক সময় ছেলেরা তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে পারে না মায়ের জন্য কী কী দরকার।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের সিভিল সোসাইটি নাগরিক চাহিদা নিয়ে সঠিকভাবে অ্যাডভোকেসি করতে পারছে না। তাই নাগরিক সুবিধাগুলো পেতে আমাদের অনেক সময় লাগে।

আরও পড়ুন,
মা হওয়া মানে কি স্বপ্ন বিসর্জন দেয়া?
সন্তানের জন্য কেন মাকেই চাকরি ছাড়তে হয়?
নতুন মায়ের বিষন্নতা- অবহেলা মানেই বিপদ!
সন্তানহীন নারীর মর্যাদা এই সমাজের চোখে কোথায়?
গর্ভ মায়ের, পদবী কেন বাবার?

ফিচার ফটো অলঙ্করণ- আবু হাসান

 

 

সারাবাংলা/টিসি/ এসএস

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন