শনিবার ২৫ মে, ২০১৯ ইং , ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৯ রমজান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

জজ মিয়া নয়— ‘জালাল’, দুর্ধর্ষ নামের আড়ালে হারায় যে নাম

অক্টোবর ৯, ২০১৮ | ৭:৩৫ অপরাহ্ণ

||বিশেষ সংবাদদাতা||

ঢাকা: ‘বাপ মায়ের দেওয়া নাম – মোহাম্মদ জালাল। সিআইডি কর্মকর্তারা নামের সঙ্গে জজ মিয়া নামটি যুক্ত করে দিয়ে সে সময় আমাকে বলে, নৃশংস ঘটনার আসামিদের নাম দুর্ধর্ষ হতে হয়। আর সে কারণেই বিনা অপরাধে আমাকে ওই নামে আসামি সাজানো হয়। বিনাবিচারে ৫ বছর জেল খাটলাম। যারা আমাকে এই অমানবিক শাস্তি দিল তাদেরও শাস্তি চাই। এখনও নিরাপত্তাহীনতায় ঘুরে বেড়াচ্ছি।’

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার সাজানো আসামি জজ মিয়া (জালাল) সারাবাংলার কাছে এভাবেই নিজের কথা তুলে ধরেন।

জীবনের পাঁচটি বছর হারানো আর নির্মম নির্যাতনের শিকার জজ মিয়া (জালাল) বলেন, ‘আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাই, হারানো পাঁচবছরের ক্ষতিপূরণ আর নিরাপত্তা চাই রাষ্ট্রের কাছে। ’

জজ মিয়া জানান, টানা এক মাস সিআইডি অফিসে রেখে তাকে কীভাবে নির্যাতন করা হয়। পরে জীবন বাঁচাতেই তিনি আদালতে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।

জজের শর্ত অনুযায়ী তার মাকে নিয়মিত টাকা দিতেন সিআইডি’র কর্মকর্তা এসপি রুহুল আমিন।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘কোর্টে সাক্ষী দিয়ে আইছি, সাক্ষী দেওয়ার সময় নিজের নিরাপত্তার কথা জানাইছি। এই নিয়ে কোনো ব্যবস্থা হয় নাই। কোর্ট এটা বিবেচনায় রাখছে।’

তিনি বলেন, ‘আমার নিরাপত্তায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর মধ্যে আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা কইরা আইছি, মন্ত্রী বলেছেন, তুমি পরে আইস, তোমার সাথে কথা হইব। ওনার সঙ্গে ওইভাবে কোনো কথা হয় নাই।’

রায়ের দিন কোর্টে যাবেন কি না জানতে চাইলে জজ মিয়া বলেন, ‘না। আমি যাব না।’

রাষ্ট্র যেভাবে প্রটেকশন দেওয়ার কথা ছিল, সেভাবে কি দিয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র ওইভাবে আমাকে দেখেনি। রাষ্ট্র যদি ওইভাবে আমাকে দেখত তাহলে সেইভাবে আমাকে সেভ এ রাখত। কিন্তু কিছুই ঠিক নাই। এই মামলার পর আমার ঘরবাড়ি বিক্রি করে দেওয়া হইছে। আমার তো কিছুই নাই। ওটা আমি পুণর্বাসনের আবেদন জানাইছি।’

আপনি তো সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, সরকারের কাছেই তো চাইছি। বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে সরকারের কাছে আবেদন করেছি।’

‘পাঁচবছর জেল খাটছি। জেল থেকে বের হওয়ার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে সরকারের কাছে তুলে ধরছি, জানাইছি। আমাকে পুণর্বাসন করা হোক, আমাকে একটা চাকরি দেওয়া হোক, যেন আমি স্বাভাবিকভাবে চলতে পারি। ওইগুলোর কিছুই হয়নি। সামনে মামলার রায়, এখন আমি আবার সরকারের কাছে তুলে ধরতেছি। আমি যে পাঁচটা বছর জেল খাটছি বিনা বিচারে, আমি অপরাধী না হইয়াও আমাকে অপরাধী সাজাইছে, এটার যেন ক্ষতিপূরণ আমি পাই। আর আমাকে সরকার যেন স্বাভাবিক জীবনযাপন করার জন্য পুণর্বাসনের ব্যবস্থা করে দেয়, চাকরি দিয়ে দেয়। এটাই সরকারের কাছে আমার চাওয়া।’

আপনাকে নিয়ে মানুষজন প্রশ্ন তোলে না? জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, নানানজনে নানান কথা বলে যে, বিএনপি সরকার তাকে এক রকম রেখেছিল। আবার আওয়ামী লীগ সরকার অন্যভাবে রাখছে। আসলে সত্য কোনটা?’

আপনার সাথেই কেন এমন হলো? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ আমি তো পুলিশের সোর্স ছিলাম। ঘটনার সময় গুলিস্তানে আমার দোকান ছিল। যারা আমাকে গ্রেফতার করেছিল তারা সবাই সিআইডির ছিল। কিছুদিন আগে তারা তেজগাঁও থানা থেকে বদলি হয়ে সিআইডিতে আসে।’

কেউ না কেউ তথ্য না দিলে তো হুট করে আপনাকে ধরবে না? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাকে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করেছে। আশেপাশে কেউ হয়ত দেখায় দিয়েছে। জয়নাল আবেদীন ফারুকের বাংলোতে তারা থাইকা পরে আমার গ্রামে আইসা রেড দিছে। ওয়ার্ড কমিশারসহ যাদেরকে ধরেছিল তাদের প্রথম আমি সিআইডিতে দেখেছি। আমাকে তো চোখ বেঁধে নিয়ে এসেছে।

রিমান্ডের জন্য আপনাকে আদালতে তোলেনি পুলিশ জানতে চাইলে জজ মিয়া বলেন, ‘পুলিশ কোর্টে যাচ্ছে পিটিশন লইয়া, কোর্ট থেকে রিমান্ড লইয়া আইতাছে। হেগোর আসামি না নিলেও চলে। মুন্সি আতিক ও পুলিশ সুপার রুহুল আমিনকেও দেখেছি।’

আপনার নামে মামলা দিয়ে লাভ কি বলে মনে করেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে সাজায়ে মামলাটা ভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়া মামলাটার রায় দেরি করেছে। তা না হলে আরও আগে বিচার হইত।’

সিআইডিতে আর কার কার সঙ্গে দেখা হয়েছে জানতে চাইলে জজ মিয়া বলেন, ‘সিআইডিতে অনেকেই এসেছে। আইসা রুহুল আমিন স্যারের সাথে কথাবার্তা বলে তারা চলে যাইত। যখন বড় অফিসার আসত, তখন আমারে হাজির করত। খালি ইন্টারপোলের কাছে আমাকে ফেস করছে এভাবে যে, ইন্টারপোল আইতাছে, আমি তোর দিকে আঙ্গুল উঠাইলে, তুই তাদের দিকে হাত জোর করে হু বা হ্যাঁ করবি। এরপর যে রিপোর্ট দিছে, ইন্টারপোল তা গ্রহণ করেনি বলে শুনেছি। কারণ তারা তো আমার সাথে কথাই বলতে পারে নাই। ’

ওরা কারা ছিল জানতে পেরেছেন? জবাবে জজ মিয়া বলেন, ‘ওরা বিদেশি ছিল। এসে আমার সঙ্গে দেখা করে। এফবিআই ছিল নাকি অন্য কেউ ছিল তা জানি না। তবে ওদের বিদেশিদের মতোই মনে হইছে আমার।’

আপনাকে কে ধরে এনেছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাকে ধরে এনেছিলেন পুলিশের মুন্সি আতিক, রশিদ আর রুহুল আমিন।’

সারাবাংলা/ইউজে/জেডএফ

Advertisement
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন