সোমবার ২৫ মার্চ, ২০১৯ ইং , ১১ চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৬ রজব, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

চীনকে চিনতে চিনতে…

অক্টোবর ১০, ২০১৮ | ৭:৪৮ অপরাহ্ণ

পলাশ মাহবুব ।।

চীনের দুঃখ যদি হোয়াংহো হয় তাহলে যারা ঘোরার জন্য চীন যায় তাদের দুঃখ ফেসবুক। চীনে ফেসবুক নেই। নেই গুগল, ইউটিউবও। সদ্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠা নেটফ্লিক্সও এখানে অচল। ফলে আমরা যারা বিশেষ করে ফেসবুক নামক ‘বিশ্ব মুখশ্রী’র বাসিন্দা, ফেসবুক ছাড়া যাদের চলেই না, তাদের জন্য এটা একটা দুঃসংবাদই বটে।

অভাগা যেদিকে যায় ‘ফেসবুক’ও ফুরায়ে যায়- এই আপ্তবাক্যকে মাথায় নিয়ে চীনে নামলাম। নেমেই একেবারে দিনে দুপুরে পড়লাম অন্ধকারের মধ্যে। চীনে ফেসবুক যেমন নেই তেমনি আরও অনেক বিষয়ের প্রতি সাধারন চীনাদের (অনেক ক্ষেত্রে অসাধারন চীনাদেরও) কোনও আগ্রহ নেই। যেমন অন্য ভাষা। চীনা ভাষার বাইরে অধিকাংশ চীনারা আর কোনও ভাষা জানে না। চীনারা কখনো ইংরেজ শাসনের অধীনে ছিল না, এই কারণেই কিনা জানি না তবে ইংরেজি ভাষার প্রতি তাদের কোনও আগ্রহ মাত্র নেই।

ভাষার এই সীমাবদ্ধতা কখনো কখনো সংকট আর শংকার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বেইজিং এয়ারপোর্টে নেমে যখন গাইডকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না তখন বিষয়টা হাঁড়ে হাঁড়ে টের পেলাম। ভয়ে দীর্ঘ যাত্রাক্লান্ত শুকনো মুখ আরও শুকিয়ে গেলো। প্রায় মিনিট পনের ধরে ইংরেজি আর বাংলায় ওহ গড! আর হায় আল্লাহ! বলছিলাম বারবার। কিন্তু আমার সে ভাষা বোঝার মতো কাউকে আশেপাশে পেলাম না। শেষ পর্যন্ত ‘উই চ্যাটে’ রক্ষা। তাও কথা দিয়ে না। উইচ্যাটে আমি আমার অবস্থানের জায়গার ছবি তুলে পাঠানোর পর তারা সেখানে এসে আমাকে উদ্ধার করে। সাংবাদিকতার কর্মী হিসেবে আবারও টের পেলাম ছবি হাজার শব্দের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। ভাগ্যিস, ক্যামেরাওয়ালা মোবাইল ফোন আবিস্কৃত হয়েছিল!

চীনে ফেসবুকসহ অন্যান্য জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া কেন নিষিদ্ধ? কথা প্রসঙ্গে এই কথাটি জানতে চেয়েছিলাম চায়না কমিউনিকেশন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. পেইজিন চাও-এর কাছে। উত্তর দিতে গিয়ে তরুণ অধ্যাপক ড. চাও আশ্রয় নিলেন ইতিহাসের। ইতিহাস ঘেঁটে তিনি যুক্তিসহ বুঝিয়ে দিলেন দীর্ঘ দিন ধরে নানা বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে চীন। নানান আঙ্গিকে এখনো তা অব্যাহত আছে। ফলে নিজেদের রক্ষা করার জন্য এক সময় তাদের যেমন গ্রেটওয়াল বানাতে হয়েছে তেমনি দিনে দিনে তৈরি করতে হয়েছে আরও কিছু অদৃশ্য দেয়াল। বিষয়টি আর কিছুই না নিজেদের রক্ষা করার এক ধরণের কৌশল, এমনটাই বললেন তিনি। চীনারা বিশ্বাস করে গুগল আর ফেসবুকের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য অন্যদের হাতে চলে যায়। অন্যদের বলতে তিনি কাদের প্রতি ইংগিত করেছেন তা ফেসবুক গুগলের নিয়ন্ত্রক দেশ কারা সেটি একবার মনে করলেই বোঝা যায়। ড. চাও যখন কথাগুলো বলছিলেন তখন ব্যাপারটিকে যুক্তিযুক্তই মনে হচ্ছিল। চীনের মতো একটি পরাশক্তি দেশতো তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার কথা ভাববেই।

বিজ্ঞাপন

ভাষা আর যোগাযোগজনিত কিছু সীমাব্ধতা বাদ দিলে চীনের বাকি সবকিছু অসাধারন। বিশেষ করে চীনাদের আতিথেয়তা বেশ উপভোগ্য। অনেকটা আমাদের দেশের মতো। অতিথিকে তারা বেশ সমাদর করে। আমরা এসেছি একটি আন্তর্জাতিক ওয়ার্কশপে অংশ নিতে। যার আয়োজক চীনের সরকারি টেলিভিশন সিসিটিভি (চায়না গ্লোবাল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক) এবং এশিয়া-প্যাসিফিক ইন্সটিটিউট অব ব্রডকাস্টিং ডেভেলপমেন্ট (এআইবিডি)। আয়োজদের আন্তরিকতা মুগ্ধ করার মতো। এবং আমরা যারা পৃথিবীর অন্য দশটি দেশ থেকে এখানে একত্রিত হয়েছি তারা মুগ্ধ।

দিনে দিনে চীনের এই এগিয়ে যাবার একটি কারণ নিজে নিজে আবিষ্কার করেছি। চীনে দিন এবং রাত দুটোই আগে শুরু হয়। এবং নিয়ম মানার ব্যাপারে চাইনিজরা খুব সচেতন। এখানে আমাদের সকালের নাস্তা করতে হচ্ছে ঠিক সকাল সাতটায় আর রাতের ডিনার সন্ধ্যা ছয়টায় (যদিও তখন আশেপাশে অন্ধকার নেমে আসে না)। হিসেব করে দেখলাম চীনে যখন সন্ধ্যা ছয়টা তখন আমাদের দেশের বিকেল চারটা। অধিকাংশ দিন বিকেল চায়টায় লাঞ্চও করা হয় না। হা হা হা।

আর চীনের খাবার? চীনের খাবার নিয়ে নানা কথা শুনেছি। খাবার নিয়ে যে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে না তা বলা যাবেনা। তবে একেবারেই যে খাওয়া যাচ্ছে না তা নয়। চীনাদের রন্ধন প্রক্রিয়া বেশ ইন্টারেস্টিং। ঝাল-মসলার কোনও বালাই নেই। খাদ্যের আসল স্বাদ তারা ধরে রাখতে চায়। ফলে সবজি হয় কাঁচা-কাঁচা আর স্টিম করা মাছে শুধুমাত্র মাছের স্বাদই পাওয়া যায়। আমাদের দেশের মতো হলুদ-মরিচ-ধনিয়ার স্বাদ তাতে যোগ হয় না।

চীনের খাবার নিয়ে এখানে আসার আগে অনেকে অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ‘সাথে কইরা চিড়া-মুড়ি নিয়া যাও মিয়া। নাইলে না খাইয়া থাকন লাগবো।’ এখানে এসে খাবারের ব্যাপারটা এতোটা কঠিন মনে হচ্ছে না। দুপুরে লাঞ্চে যে আইটেমা খেতে কষ্ট হয়েছে ডিনারে গিয়ে সেটি খেতে পেরেছি। মনে হচ্ছে ধীওে ধীরে বিষয়টি রপ্ত হয়ে যাবে। তবে ধারণা করছি যখন আমি চীনা খাবার পছন্ করতে শুরু করবো তখন আমার ফিরে আসার সময় হয়ে যাবে। তারপরও চীনকে চিনতে হবে, এই মনোবাঞ্ছা নিয়েই এগুচ্ছি।

চীনকে একদিনে কিংবা এক মাসে চেনা সম্ভব না, তা জানি। চীন হচ্ছে জ্ঞানার্জনের জন্য উপযুক্ত জায়গা। যে কারণে জ্ঞান লাভের জন্য চীনে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। আমি অবশ্য সেজন্যই এসেছি। দেখা যাক দশ দিনের এই সফরে আমার সে ইচ্ছে কতটুকু পূরণ হয়।

পলাশ মাহবুব: কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার। ডেপুটি এডিটর, সারাবাংলা।
সারাবাংলা/এমএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন