সোমবার ২৭ জানুয়ারি, ২০২০ ইং

‘না হয় যাচ্ছি ফিরে, সব পাখি ফেরে নীড়ে’

অক্টোবর ১৮, ২০১৮ | ৭:০৫ অপরাহ্ণ

।। স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।

বিজ্ঞাপন

না হয় যাচ্ছি ফিরে
সব পাখি ফেরে নিড়ে
ফিরবো বলেই একদিন
নির্জনতার কাছে যাচ্ছি দিয়ে শোধ
তোমাদের সবটুকু ঋণ.........
গান শেষে বন্ধু যেন চোখে না আসে জল
মৌনতাকে ভালোবেসে বন্ধু এখন
চল বাড়ি চল......

আইয়ুব বাচ্চুর সুরে এটাই ছিল লতিফুল ইসলাম শিবলীর লেখা শেষ গান। গানটি প্রকাশিতও হয়নি এখনও। আর এই গান করতে গিয়েই দুজনে বলছিলেন, ‘এতো মরার গান করছি’। হাসতে হাসতে বলা সেই কথা যে এমন নিষ্ঠুর হয়ে বাস্তবে রূপ নেবে সেটা বোধহয় দুজনের কেউ ভাবেননি। যদি ভাবতেন তাহলে হয়তো এমন কথার এই গান হতো না। আর সেটাই বারবার বলছিলেন গানটির গীতিকার লতিফুল ইসলাম শিবলী।

বিজ্ঞাপন

স্কয়ার হাসপাতালের লবিতে দাঁড়িয়ে লতিফুল ইসলাম শিবলী যখন কথাগুলো বলছিলেন, তার দুচোখ ভিজে যাচ্ছিলো। তিনি বারবার হাত দিয়ে চোখ মুছছিলেন, কথা বলতে বলতে খেই হারাচ্ছিলেন।

লতিফুল ইসলাম শিবলী আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া অনেক গান লিখেছেন, যেগুলো এখনো ফিরছে মানুষের মুখে মুখে। পাশ থেকে কেউ একজন বললেন, এইগানগুলোইতো আমাদের শৈশব-কৈশোর রঙিন করেছে।

শিবলী কথা বলেন, থামেন, হয়তো স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান। তেমনি এক স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বলেন, সন্ধ্যার পর একদিন তার মগবাজারের বাসার ছাদে বসেছিলাম। উনি গিটারে এমনিতেই টুংটাং করছিলেন। সেই শব্দ শুনে তাকে বললাম, বস- আবার বাজানতো। আবার বাজান, আবার আবার-তারপরই তৈরি হয় ‘সুখের এ পৃথিবী, সুখের এ অভিনয়-যতোই আড়ালে রাখো, আসলে কেউ সুখী নয়’।....তারপরতো এই গান ইতিহাস...বলেন লতিফুল ইসলাম শিবলী।

https://www.youtube.com/watch?v=6qsPju0oN8k

শিবলী যখন একথাগুলো বলছিলেন, তখন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ঘুমিয়ে ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। তার আগে সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে স্কয়ার হাসপাতালের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেছেন। এ খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পরতেই আইয়ুব বাচ্চুর ব্যান্ড মেম্বার,সংগীতাঙ্গনের অসংখ্য মুখ এবং ভক্তরা জড়ো হন হাসপাতালে।

তাদের সরিয়ে হাসপাতালের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে বেগ পেতে হয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।

তাই একপাশে দাঁড়িয়ে কথা হয় আইয়ুব বাচ্চুর সুর করা এবং গাওয়া অসংখ্য কালজয়ী গানের গীতিকার শিবলীর সঙ্গে। শিবলী বলেন, এভাবেই তৈরি হয়েছে আমাদের অসংখ্য গান। মগবাজারের বাসায় সন্ধ্যার সময় গিটার আর হ্যাজাক লাইট নিয়ে ছাদে উঠতেন, যেন হ্যাজাকের আলোতে আমি লিখতে পারি। এমন অনেক বিকাল-অনেক সন্ধ্যা আমাদের কেটেছে।

শিবলী বলেন, আমরা প্রেম শেয়ার করতাম, কষ্ট-দুঃখ সব শেয়ার করতাম। অনেক রাত কেটেছে একসঙ্গে। ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’ এমনি এমনি তৈরি হয়নি, ‘আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি-তাই তোমার কাছে ছুটে আসি’-এগুলো এমনি এমনি তৈরি হয়নি। বিষয়টা এমন না যে, আমি গান লিখে দিলাম, উনি গেয়ে ফেললেন। এগুলো ছিল আমাদের প্রতিদিনের আড্ডা, সবকিছু শেয়ার করার ফলশ্রুতি।

https://www.youtube.com/watch?v=YzhcEBGClpg

আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে কবে কীভাবে পরিচয় জানতে চাইলে শিবলী বলেন, বাচ্চু ভাইর সাথে প্রথম পরিচয় ছিল অন্য আরেকটি ব্যান্ডের কাজে। কষ্ট পেতে ভালবাসি, কষ্ট কাকে বলে, কী যে কষ্ট আমার –কষ্ট নিয়েই সবগুলো গান ছিল। তারপর নীল বেদনা, হাসতে দেখো-গাইতে দেখো, কেউ সুখী নয়, মানুষ বড় একা, রাজকুমারী, আহা জীবনসহ আরও অনেক গান আছে বাচ্চু ভাইর গাওয়া আর আমার লেখা। তিনি নিজের জন্য গেয়েছেন, মানুষের জন্যও করে দিয়েছেন।

তার কাছে অনেক গান দেওয়া থাকতো, তিনি অনেকের জন্য সুর করে সেগুলো দিতেন।

শিবলী চারপাশে তাকান, তারই মতো ছুটে আসা মানুষদের দেখেন। তারপর আবার বলেন, আমি, বাচ্চু ভাই, জেমসভাই খুব ক্লোজ ছিলাম। প্রায় একটা দশক আমরা একসঙ্গে থেকেছি, একসঙ্গে খেয়েছি, আড্ডা দিয়েছি। সেসময়ই দেশের আইকনিক অ্যালবামগুলো তৈরি হয়েছে।

শেষ কবে দেখা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শেষের সময়ে একটা মান অভিমান চলছিল। কিন্তু আজ তার সঙ্গে আমার এভাবে দেখা করতে আসতে হবে.....। দেখা হলে সব ঠিক হয়ে যেত, কিন্তু সে সুযোগ আর পেলাম না।

দেখা হলে কী বলতেন? জানতে চাইলে বলেন-বলতাম, বস-মাফ করে দেন। এছাড়া আর কোনও কথা বলার নাই।

সারাবাংলা/জেএ/পিএ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন