মঙ্গলবার ২৬ মার্চ, ২০১৯ ইং , ১২ চৈত্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১৮ রজব, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

অসংক্রামক রোগের জন্য ‘বড় রিস্ক ফ্যাক্টর’ অ্যালকোহল

নভেম্বর ৬, ২০১৮ | ৮:৪৬ পূর্বাহ্ণ

।। জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট ।।

ঢাকা: মদ অসংক্রামক রোগের জন্য একটি বড় রিস্ক ফ্যাক্টর। মদ পানের কারণে বিশ্বজুড়ে লিভার সিরোসিস রোগে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনক। সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে বিশ্বে প্রতি তিনজন মানুষের মধ্যে একজন মদ পান করে এবং প্রতিবছর ২৮ লাখ মানুষ মদ পানের কারণে মারা যান। অপরিণত বয়সে মৃত্যু ও নানা ধরনের প্রতিবন্ধিতার জন্য মদ পানের অভ্যাসকে সপ্তম ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সাময়িকী দ্যা ল্যানসেট তাদের সাম্প্রতিক প্রবন্ধে এসব তথ্য প্রকাশ করে।

মোট ১৯৫টি দেশের ১৯৯০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মদের ব্যবহার, মদের কারণে অসুস্থতা ও মৃত্যুর তথ্য নিয়ে ল্যানসেট তাদের প্রবন্ধ তৈরি করে। গবেষকরা বলেছেন, মদের কোনও গ্রহণযোগ্য মাত্রা নেই। বিশ্বজুড়ে মানুষ কী পরিমাণ মদ পান করেন, সেই হিসাব বের করতে গবেষকরা এ সংক্রান্ত ৬৯৪টি গবেষণা পর্যালোচনা করেন। একইসঙ্গে তারা আরও ৫৯২টি গবেষণা প্রবন্ধ বিশ্লেষণ করেন। সেসব পর্যালোচনা থেকে গবেষকরা জানিয়েছেন, ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্যান্সারে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ মদ্যপান।

প্রবন্ধে বলা হয়, বিশ্বে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর ১০টি কারণের মধ্যে একটি হলো মদ পান। তারা বলছেন, নিয়মিত মদ পান শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও টিস্যুতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এতে মানুষ সহিংস হয় এবং নিজের ক্ষতি করে।

ল্যানসেটের এই গবেষণা কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ’র (আইসিডিডিআরবি) অসংক্রামক ব্যাধি বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলিয়া নাহিদ।

বলা হতো সামান্য পরিমাণ মদ হার্টের জন্য ভালো। পৃথিবীর অনেক দেশের তথ্য নিয়ে এই বৈশ্বিক গবেষণা যখন আমরা করলাম, তখন দেখা গেল আসলে যে কোনও মাত্রার মদ পানই স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। মাত্রা ‘ম্যাটার’ করে না, সারাবাংলাকে বলেন আলিয়া নাহিদ।

তিনি বলেন, তাই এখন বিশ্বজুড়েই অ্যালকোহল বা মদ পান ত্যাগ করতে বলা হচ্ছে। মদ স্বাস্থ্যের সরাসরি ক্ষতি করে। যার কারণে এই প্রথমবারের মতো বিশ্বের গবেষকরা বলেছেন, মদের কোনও গ্রহণযোগ্য মাত্রা নেই। যে কোনও মাত্রার মদই শরীরের জন্য খারাপ।

আলিয়া নাহিদ বলেন, মদ পানকে এখন আর কোনওভাবেই ‘জাস্টিফাই’ করা সম্ভব না। মেডিকেল পয়েন্ট অব ভিউ থেকে অ্যালকোহল অ্যালাউ করা যাবে না। আমরা আগে থেকেই জানি, অ্যালকোহল বা মদ অসংক্রামক রোগের জন্য একটি বড় রিস্ক ফ্যাক্টর। যদিও পৃথিবীর অনেক দেশেই এটা তাদের জীবন যাপনের অংশ, কিন্তু বাংলাদেশে সেটা না। সুতরাং এই গবেষণা প্রতিবেদন সবার জন্য একটি ‘ওয়েকআপ কল’। তাই যারা অ্যালকোহলে অভ্যস্ত তাদের সময় হয়েছে এখান থেকে সরে আসার। মদ পান এবং ধূমপান সমানভাবে ভয়ঙ্কর। তাই যারা শুরু করেননি, তারা যেন নতুন করে অত্যন্ত খারাপ এই অভ্যাসে অভ্যস্ত না হন।

যেকানও ধরনের ক্যান্সারের কারণ হিসেবে মদ পানকে দায়ী করলেন দেশের বিষেজ্ঞরা চিকিৎসকরাও। একইসঙ্গে কিডনির আকার বাড়িয়ে দেওয়া এবং কিডনি বিকলে আগ্রাসী ভূমকা পালন করে মদ পান। এমনকি অতিরিক্ত মদপানের কারণে হৃদরোগের আশংকা রয়েছে। রয়েছে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি, স্থুলতা এবং হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কাও।

চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক স্নায়ুবিক রোগ এবং মানুষের শরীরের প্রায় ২শ’ রোগের কারণ হিসেবে মদকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায়ী করা হচ্ছে। ‘অ্যালকোহলিক লিভার সিরোসিস’ একটি পরিচিত রোগ বলেন প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী।

তিনি সারাবাংলাকে বলেন, নিয়মিত মদ পান করলে লিভারের কার্যক্ষমতা কমে যায়, লিভারে চর্বি জমা হয় এবং পর্যায়ক্রমে লিভার সিরোসিস হয়। আর লিভার সিরোসিসে অকাল মৃত্যুর শঙ্কা অনেক বেশি। নিয়মিত মদ পানে পাকস্থলির হজম ক্ষমতাও কমে যায়।

ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, যখন কেউ মদ পান করে তখন স্নায়ুতন্ত্র উজ্জীবিত হয়, উত্তেজিত হয়। একইসঙ্গে শরীর থেকে যখন মদ বের হয়ে যায় তখন সেই উত্তেজনা অবসাদে নেমে আসে। ফলে কেউ মদ পানে অভ্যস্ত হলে যত বেশি অবসাদগ্রস্ত হয়, তত বেশি মদ পান করেন অবসাদ কাটাতে। মূলত যেটা হয়, ওই ব্যক্তি আরও বেশি অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এর মধ্য দিয়ে স্নায়ুতন্ত্রের বৈকল্য তৈরি হয়। পার্সোনাটি ডিজঅর্ডার তৈরি হয়, মানুষ অসামাজিক হয়ে যায় এবং মস্তিষ্কের মনোসংযোগ ক্ষমতা হারায়।

সব সময় মানসিক অস্থিরতা, ঘুম না হওয়া, কাজে মনযোগ দিতে না পারা, বিষণ্নতা, সিদ্ধান্তহীনতা তৈরি হয়। বদমেজাজসহ নানা ধরনের মানসিক রোগের কারণ মদ পান। আর গর্ভবতী মা যদি মদ পান করেন তাহলে অনাগত সন্তানের জন্মগত ত্রুটির সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেপাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব সারাবাংলাকে বলেন, হার্ট ফেইলিওর, অরুচি, ওজন কমে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ মদ পান থেকে জন্ম নেয়। ডিমেনশিয়া এবং মস্তিস্কে স্ট্রোক হওয়ার মতো শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিও তৈরি করে মদ পান।

সারাবাংলা/জেএ/এটি/এমএইচ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন