বৃহস্পতিবার ২৭ জুন, ২০১৯ ইং , ১৩ আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২৩ শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

মাসুম রেজা-সেলিনা শেলী: একটি অন্যরকম সংসারের গল্প

নভেম্বর ১৭, ২০১৮ | ২:২১ অপরাহ্ণ

-আপনার স্ত্রী কী করেন?

– জ্বী উনি কিছু করেন না। উনি হাউজওয়াইফ।

অথচ সকালের নাস্তা বানানো থেকে শুরু করে পরিবারের সবাইকে রাতের খাবার খাইয়ে বাসনকোসন মেজে ঘুমাতে যান যে স্ত্রী তার কথা বলা হয় তিনি কিছু করেননা, বলছিলেন নন্দিত নাট্যকার মাসুম রেজা। বাংলাদেশের এইরকম সামাজিক বাস্তবতায় একজন মাসুম রেজা নিজের পাসপোর্টে পেশার স্থানে লিখেছেন ‘হাউজ হাজব্যান্ড’।

বিজ্ঞাপন

গুণী ও সমাদৃত নাট্যকার, লেখক, উপন্যাসিক, চলচ্চিত্রকার, নাট্য নির্দেশক মাসুম রেজা- যার সবগুলো সৃষ্টিতেই নারী চরিত্ররা একেকজন স্বতন্ত্র সত্ত্বা হিসেবে বিকশিত। সে মঞ্চ নাটক নিত্যপূরাণের দ্রৌপদীর মনোসামাজিক রূপায়ন হোক কি মোল্লাবাড়ির বউতে পারুল আর বকুলের মাঝে সতীনের চিরাচরিত সম্পর্কেও নারী শক্তির অনন্য প্রদর্শন হোক- মাসুম রেজার নারী চরিত্ররা সবাই অনন্য।

স্ত্রী সেলিনা শেলী যখন আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফামের গ্লোবাল ক্যাম্পেইনার হিসেবে ইংল্যান্ডে যাওয়ার সুযোগ পেলেন তখন মাসুম রেজার কর্মক্ষেত্রে সোনালী সময় চলছে। সেলিনা শেলী জানালেন, সে সময় স্ত্রী এবং দুই জমজ মেয়েকে কাছ ছাড়া করতে চাননি তিনি। তাই দেশ ছেড়ে তার সাথে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন সেখানে গিয়েই যা পারেন লিখবেন।

ইংল্যান্ডে থাকাকালীন নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করলেন মাসুম রেজা। পাসপোর্টে লেখা হয়েছিল হাউজ হাজব্যান্ড। মাসুম রেজার ভাষায়, ‘এইটা আসলে তেমন কিছু না। ইংল্যান্ডে থাকতে লেখালিখি করতাম এই দেশের জন্য। তখন নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার সময় আমাকে জিজ্ঞাসা করল আমি কী করি। বললাম যে কিছু করিনা। ড্রাইভ করি, বাজার করি, রান্নাবান্না করি, স্ত্রী এবং মেয়েদের কাজের জায়গা ও স্কুল থেকে আনা নেওয়া করি। এসব শুনে ওরা বলল পাসপোর্টে হাউজ হাজব্যান্ড লিখে দিতে।’

নন্দিত এই নাট্যকারের কাছে জানতে চাইলাম ইংল্যান্ডে এটা বেশ সাধারণ ঘটনা কি না। তিনি বলেন, তেমন সাধারণ না, সারা বিশ্বেই হয়ত দুই থেকে তিনজনের পাসপোর্টে এটা লেখা আছে।

পরবর্তীতে দেশে এসে এই গল্পটা করছিলেন এক চ্যানেলে। সেটা শুনেই এক প্রযোজক ফোন দিয়ে বলেন, এই নিয়ে নাটক লিখে ফেলতে। তখন তিনি হাউজ হাজব্যান্ড নামে একটা নাটক লিখে ফেলেন। তৌকির আহমেদ, তারিন আহমেদ অভিনীত সেই নাটক সব মহলে দারুণ সাড়া ফেলেছিল। অনেক নারী ফোন দিয়ে তাকে বলতেন তাদের হাজব্যান্ডের সাথে কথা বলতে যেন তারাও ঘরের কাজ করেন। অন্যদিকে অনেক পুরুষ বন্ধু আবার বলতেন এটা লিখে তিনি নাকি তাদের সর্বনাশ করেছেন। তাদের বউরা নাকি এখন ঘরের কাজ নিয়ে কথা শোনায়!

মাসুম রেজা জানালেন, পাসপোর্টে পেশা হিসেবে হাউজ হাজব্যান্ড লেখা ইংল্যান্ডেও খুব একটা সাধারণ ব্যাপার  নয়। সারা বিশ্বে দুই থেকে তিনজনের পাসপোর্টে হয়ত এটা লেখা আছে।

আমাদের দেশে দেখা যায় নারীকে শারীরিক, মানসিক দুইভাবেই দুর্বল ভাবা হয়। সেখানে একজন নারীর এগিয়ে চলার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় একজন পুরুষ। শুধু স্বামীই নয়, বাবা-ভাইরাও এক্ষেত্রে অসহযোগিতার মনোভাব দেখান। এমন সামাজিক পরিস্থিতিতে স্ত্রীর কেরিয়ারের জন্য দেশ ছাড়া একটা চমৎকার এবং অভূতপূর্ব ঘটনা। মাসুম রেজা শুধু দেশই ছাড়েননি, সংসারের কাজ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন, যত্ন নিয়েছেন জমজ দুই মেয়ের। ভূমিকা রেখেছেন স্ত্রী সেলিনা শেলীর কেরিয়ার এগিয়ে নিতে।

সেলিনা শেলী বলেন, তার কেরিয়ার এগিয়ে নিতে স্বামী মাসুম রেজার ভূমিকা অগ্রগণ্য। অনেকবারই পরিস্থিতির চাপে ছেড়ে দিতে চাইলেও তার স্বামী তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আবার কাজে পাঠান। তিনি নিজেও থিয়েটারের সাথে জড়িত ছিলেন, লিখেছেন নাটকও। মাঝেমধ্যে লেখালিখি করতে ইচ্ছা করলেও পেশাগত জীবনে তিনি সন্তুষ্ট। মাঝখানে দুইমাস ঘরে বসে ফ্রি ল্যান্সিং করলেও ভার্সিটি পড়ুয়া দুই মেয়ে আর পরিবারের কথা চিন্তা করে আবারও নিয়মিত চাকরিতে ঢুকেছেন শেলী।

বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে পুরুষ হবে পরিবারের প্রধান রোজগেরে আর স্ত্রীরা ঘর সংসার সামলে বাচ্চা মানুষ করবেন। এর বিপরীত হলেই চারদিক থেকে ধেয়ে আসে কথার বান। সেলিনা শেলী আর মাসুম রেজার সংসারে ‘জেন্ডার রোল’ টা যে উল্টে গেল এর জন্য তাদের কি কোন ধরণের অপমানজনক কথা বা বাঁধার সামনে পড়তে হয়নি? কিংবা স্বামী হিসেবে মাসুম রেজার প্রতিক্রিয়া কেমন?

শেলী জানান, মাসুমকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারলে সে মেনে নেয়। তাই তিনি শুরু থেকেই সচেতনভাবে সংসারের কাজ দুজনকেই সমানভাবে করতে হবে এটা বুঝিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশে থাকাকালীন মাসুম রেজার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সংসারের কাজে অতটা ভাগ বসাতে পারতেন না সামাজিক বাস্তবতায়। দেশে থাকতে শেলীর জন্য সাহায্যকারী বাড়িয়ে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। কিন্তু ইংল্যান্ডে গিয়ে ব্যাক্তি মাসুম রেজার চরিত্র বিকশিত হয়, বলেন স্ত্রী সেলিনা শেলী।

শেলী বলেন, ‘মাসুম তখন নাট্যকার হিসেবে বেশ ভালো করছে। তবুও আমার সাথে ইংল্যান্ডে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অনেকেই বলেছিল স্ত্রীর উপর নির্ভরশীল হয়ে যাবে কিনা। কিন্তু মাসুম আমার সাথে আলোচনা করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।’

আর সামাজিক চাপের কথা বলতে গিয়ে একটা ঘটনার কথা বলেন শেলী-  ‘যাওয়ার আগে ঢাকায় আমাদের বাসায় তখন এক কাজের মেয়ে ছিল। সে একদিন বলে, এই বাসায় তো শুধু আপা কাজ করে, চাকরি করে সংসার চালায়। ভাইয়া কোন কাজ করেনা। মাসুম যে বাসায় বসে লেখালিখি করে এইটা বুঝত না। ও যে লেখালিখি করে আয় করে এই জিনিস বুঝতে চায়না।’

সেলিনা যোগ করেন, ‘মাসুম সবসময় বলে, ও যদি সংসার চালানোর চাপ থেকে মুক্ত না থাকত তাহলে এত বেশি সৃষ্টিশীল কাজ করতে পারতনা। ও তো ২৪ ঘন্টার জন্যই লেখক। আবার অন্যদিকে আমার কেরিয়ার পথটা সবসময়ই কীভাবে কীভাবে ভালো হয়ে গেছে। সমসাময়িকদের চাইতেও আগে চলে গিয়েছি কখনও কখনও। পেশাগত কাজেই আমাদের পরিবারের গাড়িগুলো আমিই কিনেছি। কিন্তু মাসুমের কখনও হীনমন্যতা হয়নি এটা নিয়ে। আমাদের দেশের ছেলেদের মাঝে এই হীনমন্যতা কমন হলেও মাসুমের ক্ষেত্রে এটা কখনও হয়নি। আমরা দুজনে মিলেই করেছি।’

মাসুম রেজা বলেন, ‘আমাদের দেশে চালু থাকা কর্ম বিভাজন বদলাতে হবে। এদেশে রান্না করাকে নারীর কাজ মনে করা হলেও ইংল্যান্ডে তা নয়।’

তিনি জানালেন, ওইদেশে থাকতে তিনি রান্না করে স্ত্রী এবং কন্যাদের জন্য অপেক্ষা করতেন একথা যখন এদেশে বলেন, তখন সেটা যেন খুব উপাদেয় ব্যাপার হয়ে যায়। সবাই বেশ মজা করে বলে, আরে আপনি এগুলো করতেন! এখনও আপনার রান্না খেলাম না। অথচ বিদেশে বললে ওদের কাছে এটা কোন ব্যাপার না। কারণ ওখানে তো পুরুষও রান্না করে। রান্নাঘরের কাজের বিভাজন নাই ওইদেশে।

আবার ওখানে ড্রাইভারের ক্ষেত্রেও লিঙ্গ বিভাজন নাই। গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসা চালকদের পঞ্চাশ শতাংশই মেয়ে, বলেন মাসুম রেজা।

ঘরের কাজই শুধু নয় সন্তান লালন পালনকেও আমাদের দেশে জেন্ডার স্পেসিফিক কাজ হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ মা ছাড়া বাচ্চা মানুষ করা সম্ভব না। বাবারা এই কাজটা করতে পারেনা। তাই তো কোন পুরুষের স্ত্রী মারা যাওয়ার সাথে সাথে তার যদি বাচ্চা থাকে তবে বাচ্চা মানুষ করার অজুহাত দিয়ে তাকে আবারও বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে ছেলেটির পরিবার। কিন্তু এদিকে স্ত্রীর পেশাগত দায়িত্ব থাকায় জমজ সন্তান লালনপালনের অনেক দায়িত্বই নিজে থেকে গ্রহণ করেছেন মাসুম। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম কাজটা করতে গিয়ে তার কি কখনও মনে হয়েছে কিনা সন্তানদেরকে একজন মাই ভালো মানুষ করতে পারেন!

তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী সবসময়ই চাকরি করেন। তিনি একজন পেশাজীবী মানুষ। পেশার খাতিরে বাইরেও যান। আমি সবসময় বিশ্বাস করি এবং প্রচার করি যে স্ত্রী কাজ করলে তা সংসারের জন্য কত বড় মঙ্গলের বিষয়। আমার লেখালিখিও এই নিয়েই। কোন স্ত্রীকে আমার নাটকের চরিত্রেও আমি কখনও গৃহবধূ হিসেবে দেখাই না।

দ্বিতীয়ত, সন্তান শুধুমাত্র স্ত্রীরাই পালন করবে এটা ঠিক নয়। পরিচর্যা মায়েরাই করবেন এটা আমি মনে করিনা। আমার মেয়েদের বয়স এক বছর হওয়ার আগেই আমার স্ত্রী শেলীকে পেশাগত কাজে নেদারল্যান্ডস যেতে হয়েছিল। আমার দুই জমজ মেয়ে হওয়ার পরেও আমার কখনও মনে হয়নি যে ও কেন যাবে। আমি তাকে সাহস দিয়েছি। ভেতরে কিছুটা ভয় লাগলেও আমি তাকে জোর করে পাঠিয়েছি। তাকে বলেছিলাম এই চাকরিটা করতে হবে।’ এরপর হাসতে হাসতে যোগ করেন, ‘তাছাড়া স্ত্রীরা চাকরি করলে তো সুবিধাও অনেক।’

সেলিনা শেলীর কাছে জিজ্ঞাসা ছিল সন্তান লালনপালনের কাজটা তিনি বেশি ভালো পারতেন কিনা? তিনি বলেন, তার বেড়ে ওঠা অন্য রকমভাবে। ছোটবেলা থেকেই নানা ধরণের সংগঠন, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, উপস্থিত বক্তৃতা এসবে অংশ নিতেন। তাই তার মানসিক গঠন কিছুটা আলাদা। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই মাসুম রেজার সাথে বন্ধুত্ব যা আজও বিদ্যমান। তাই তারা যেকোন কিছু নিয়েই আলোচনা করতে পারেন। বলতে গেলে একসাথেই তাদের বেড়ে ওঠা।

সন্তান লালন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এটা তো সামাজিক দায়িত্ব। মা পারলে বাবা কেন পারবে না। অবশ্যই পারবে। বাবারা পারেনা সেইটা একটা মিথ।’

তিনি বলেন, ‘অক্সফোর্ডে থাকার সময় দেখেছি আমার দুই ছেলে বন্ধু সরোগেট পদ্ধতিতে বাবা হল। মা ছাড়াই তারাই দিব্যি বাচ্চা মানুষ করছেন।’

শেলী সেখানে পেশাগত কাজে এতো ব্যস্ত থাকতেন যে বাচ্চাদের বেশি সময় দিতে পারতেন না। বাচ্চাদের সাথে মাসুমই বেশি সময় কাটাতেন তাই বাচ্চাদের কী প্রয়োজন তা মাসুমই বেশি বুঝতে পারতেন। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শেলী মনে করেন বাচ্চা মাকেই মানুষ করতে হবে তা না। তবে বাচ্চাদের বড় হওয়ার জন্য বাবা-মা দুজনই প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

সমাজে সমান ভূমিকা রাখার পরেও নারীদের এখনও এই দেশে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মর্যাদা দেওয়া হয়। এখনও কোথাও গেলে মেয়েদের শুনতে হয় তাদের সাথে কোন পুরুষ অভিভাবক আছে কিনা। এইরকম বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নারীবাদ সমান অধিকারের দাবী জানিয়ে আসছে। ব্যক্তি জীবনে সমানাধিকারের চর্চা করা মাসুম রেজা নিজেও একজন নারীবাদী কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি নারী পুরুষ বিভেদ করিনা। সবাই আমার কাছে মানুষ। কিন্তু যেহেতু আমাদের সমাজে নারীদের কে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে দেখার প্রবণতা আছে তাই আমি মনে করি মানুষের নারীদের প্রতি এই ধরণের মন মানসিকতা পাল্টানোর জন্য একধরণের কাজ বা আন্দোলন হওয়া উচিৎ। সেটাকে যদি নারীবাদ বলা হয় তবে নারীবাদ। এর বাইরে আর ভিন্নভাবে দেখি না আমি।’

কিন্তু নারীবাদ তো মূলত নারী পুরুষের সমান অধিকার চাচ্ছে যা আমাদের দেশে নাই। সেটা নিয়ে কী ভাবছেন জানতে চাইলে মাসুম বলেন, ‘এটা (সমানাধিকার) সারাবিশ্বেই নাই। আমার কাছে নারীদের প্রধান বাঁধা হচ্ছে নারীদের সন্তান ধারণ করতে হয়। বলা হয় পুরুষরা সন্তান দান করছেন আর নারীরা সন্তান ধারণ করছেন। তো এই সন্তান ধারণ করতে গেলে ও পরে তাকে লালনপালন করতে গেলে এক ধরণের বন্ধনে আবদ্ধ হন তারা।’

সন্তান ধারণের বিকল্প না থাকলেও সন্তানের সঠিক যত্ন ও লালন পালনে শুধু মা না, বাবারও ভূমিকা রাখা উচিৎ বলে মনে করেন নন্দিত এই নাট্যকার। একজন নারী তো সন্তান জন্ম দিচ্ছেন পৃথিবীর জন্য তাহলে সন্তান জন্ম দিতে ও বড় করতে তাকে কেন পিছিয়ে যেতে হবে, এইটার কোন যৌক্তিকতাও তিনি খুঁজে পাননা বলে জানান।

এদেশে বেড়ে উঠে এদেশের আর দশটা পুরুষের চাইতে আলাদা করে ভাবার শুরুটা কবে থেকে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে তার নিজস্ব ভাবনাটাই এমন। আলাদা করে কখনও ভাবনা আসেনি নারীদের আলাদা করে দেখার।

তাছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই নাটকের সাথে জড়িত। সেই সময় যখন মানুষ, সমাজ এবং জীবন সম্পর্কে বোধ জন্ম নিচ্ছে তখন থেকেই থিয়েটার করেন। সেখানে ছেলে মেয়ের কোন ভেদাভেদ নাই, চরিত্র অনুযায়ী অভিনয়টাই প্রধান। তাই থিয়েটারে থাকতে কখনও নারী ও পুরুষ আলাদা ভাবে চিন্তা করার অবকাশ পাননি।

এরপর ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বা উন্নয়নের উপর পড়াশোনা করা, নানা রকম এনজিও আর উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করার ফলেও তার ভাবনার জগতটা আলোড়িত হয়েছে বলে জানান তিনি।

সেলিনার ধারণা মাসুমের পরিবারের প্রভাবেই তিনি এভাবে ভাবতে শিখেছেন। মাসুম রেজার বাবা একজন আলোকিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন।  তিনি বলেন, ‘আমার শ্বশুরের বড় ডিগ্রী বা অজস্র পয়সাকড়ি না থাকলেও তিনি মানুষ হিসেবে আলোকিত ছিলেন। তাই দেখেই ওরা এমন হয়েছে বলে মনে হয় আমার।’

একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন শেলী। বিয়ের পর যখন প্রথমবারের মত বউ হয়ে মাসুমদের কুষ্টিয়ার বাড়িতে ঘুম থেকে উঠে দেখেন ওনার শ্বশুর এক ননদকে সাথে নিয়ে রুটি বানাচ্ছেন। শাশুড়ি তখনও ঘুমে। নিজে রুটি বেলতে জানেন না তাই কী করবেন  ভেবে পাচ্ছিলেন না শেলী। শ্বশুর ডেকে বলেন ‘শেলী আসো গরম গরম রুটি খাও।’ কিছুটা অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘আপনি সকালের নাস্তা বানাচ্ছেন!’ তখন তিনি বলেন, তোমার শাশুড়ি আম্মা একটু সকালে ঘুমাতে পছন্দ করে তাই সকালের নাস্তা আমিই বানিয়ে ফেলি।’

‘ছোটবেলা থেকে দেখে দেখে মাসুমের ভেতরে এই জিনিসটা চলে আসছে’ – বলেন শেলী।

আমাদের দেশে দেখা যায় নারী পুরুষের তুলনায় শারীরিকভাবে দুর্বল, এমন একটা ধারণা আছে। এভাবে কখনও ভেবেছেন কিনা জানতে চাইলে মাসুম রেজা বলেন, আলি জাকের, খালেদ খান অভিনীত বিখ্যাত নাটক কৈতব তার প্রথম নাটক। সেখানে তিনি দেখিয়েছিলেন একজন পুরুষ আর্টিস্ট তার বাড়িতে একটি নারীকে আশ্রয় দিয়ে তাকে ফটোগ্রাফি শেখায়। কিন্তু যখন প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণের ব্যপার আসে তখন দেখা যায় তিনি চিন্তা করতে থাকেন একটা মেয়ের কাছে যদি হেরে যান। কোন মেয়ের কাছে হেরে যাওয়ার ভয়ে মেয়েটাকে তিনি প্রতিযোগিতায় অংশই নিতে দেননি। এই নাটকে তিনি ফটোগ্রাফিতে নারীরাও ভালো করতে পারে তা দেখিয়েছেন। আবার একইসাথে মেল ইগোর নেতিবাচক রূপও দেখিয়েছেন। নিজে যেটা বিশ্বাস করেননা তা লেখেননা বলেই জানান মাসুম রেজা।

নিজের সাহিত্যে নারীবাদ কিংবা ব্যক্তি মাসুম রেজার প্রভাব কতটা? জানতে চাইলে মাসুম রেজা বলেন, তার মঞ্চ নাটক নিত্যপূরাণে তিনি দ্রৌপদীকে নানাভাবে, নানা সামাজিক এঙ্গেল থেকে ভেঙে ভেঙে দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার সব নাটকেই এটা পাবেন। একসময় বেশিরভাগ নাটকে ছেলের জন্ম দেখানো হত। আমিই প্রথম মেয়ের জন্মকে একটা আনন্দময় ঘটনা হিসেবে দেখিয়েছি। এমনকি ছেলে হলে যে আজান দেওয়া হয় সেখানে আমিই প্রথম মেয়ের জন্মের পরে আজান দেওয়া দেখিয়েছি। ইনটেনশনালিই করেছি এসব’, জানান মাসুম রেজা।

আর সমসাময়িক সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র, মিডিয়ায় নারীদের (চরিত্র এবং অংশগ্রহন) অবস্থান কেমন বলে মনে হয় ব্যক্তি কিংবা নাট্যকার মাসুম রেজা কাছে?

মাসুম রেজার মতে, নাটকে বা সাহিত্যে নারীর উপস্থাপনায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। নারী বলতেই প্রেমিকা, স্ত্রী, গৃহবধূ কিংবা মা সেই জায়গায় পরিবর্তন এসেছে। তবে নাটকে, সাহিত্যে এসব পরিবর্তন আসলেও বাণিজ্যের জায়গায় পরিবর্তন আসেনি। চায়ের বিজ্ঞাপনে দেখানো হয় চা বানিয়ে মেয়েটা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে, তার হাতের বানানো চা সবাই পছন্দ করছে কিনা এই ভয়ে। আবার সরষের তেলের বিজ্ঞাপনে দেখানো হয় বউটা রান্না করছে, ছেলে খেলা করছে আর স্বামী বসে পেপার পড়ছে। তেলের ধোঁয়া যেয়ে তাদের নাকে লাগছে। এসব জায়গায় বানিজ্য আছে তাই পণ্য বিক্রি করতে নারীকে এখনও স্টিরিওটাইপভাবেই দেখানো হচ্ছে বলে মনে করেন মাসুম রেজা।

আবার অন্যদিকে সাহিত্যের সাথে বাণিজ্যের সম্পর্ক না থাকলেও সিনেমার ক্ষেত্রে আলাদা, বলেন তিনি। বললেন, সেদিন একটা সিনেমায় দেখেন আমাদের দেশের বিশিষ্ট নায়ক শাকিব খান একটা সংলাপ দিচ্ছে, ‘বাঙালি নারী হিসেবে তুমি রাত্রে একটা বিদেশি ঢঙের পোশাক পরে পার্টি করে ফিরে আসবা। এটা তো হতে পারেনা। এটা বেলেল্লাপনা।’ মাসুম রেজা বললেন, ‘এটা দেখে আমার আপনার রাগ হতে পারে। কিন্তু এই সংলাপে অসংখ্য মানুষের তালি পড়বে। বাহবা দেবে বাংলার নারীর আবহমান চিত্র আর চেহারা ফুটিয়ে তোলার জন্য।’ তিনি মনে করেন, বাণিজ্যের স্বার্থে এসব বিনোদন মাধ্যমে নারীকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয় তা নারীর বা নারীবাদের বিপক্ষে যায়।

বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক বাস্তবতায় নারীবাদ অর্থাৎ নারী পুরুষের সমানাধিকার প্রচারে সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র কতটা ভূমিকা রাখতে পারে? মাসুম রেজা বলেন, ‘নারীর অবস্থানকে কেউ কেউ বোঝার চেষ্টা করছেন। কিন্তু একজন ছেলে নিজের সাথে বোনের পার্থক্য দেখে বড় হয় এই দেশে। নারীকে দ্বিতীয় শ্রেনির নাগরিক হিসেবে ভাবতে শেখে তখন থেকেই। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যাকে দ্বিতীয় শ্রেনির নাগরিক ভাবা হচ্ছে। কিন্তু দেশে পরিবর্তনের জন্য সেই অর্ধেক নাগরিককে তৈরি করতে হবে। সেই জায়গা বানাতে নাটক কিংবা সাহিত্যের অবদান তো অবশ্যই আছে।’

তবে দেখাতে হবে যৌক্তিকভাবে। অযৌক্তিকভাবে দেখালে কেউ মানবে না, যোগ করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে কিছু নারীবাদি আছেন যাদের কাছে পুরুষ মানেই শত্রু। হয়ত অনেকাংশেই সত্য। তবে সর্বাংশে সত্য নয়। এখন আপনি অভিযোগ করছেন পুরুষরা নারীদের অধিকার না দিয়ে টিকে আছে। আবার আপনিও যদি পুরুষদের কোনঠাসা করে রাখেন, তাহলে তো অবস্থানের পরিবর্তন হবে না। এটি তো পুরুষ নয়, নারী নয়, মানুষ। আমার ভাবার কারণই নাই যে এই মেয়েটি এই কাজটাই করবে শুধু।’

তিনি আরও বলেন, সবমিলিয়ে এটা আসলে মানসিকতার ব্যাপার যা আমাদের ঠিক করতে হবে। যেমন অনেকেই বলে থাকে, নারীর সবচাইতে বড় শত্রু নারী। শ্বাশুড়ি এবং পুত্রবধূর দ্বন্দ বেশ পরিচিত এই দেশে। শ্বাশুড়ি যখন দেখেন যাকে এতদিন আদর যত্ন ভালবাসা দিয়ে বড় করেছেন তার অধিকার এখন অন্য একজনের হাতে চলে যাচ্ছে এটা মানতে না পেরেই হয়ত সমস্যা হয়। কিন্তু এধরণের বিষয়কে নারীর শত্রু নারী হিসেবে প্রচার করার কোন মানে নাই বলে মনে করেন তিনি।

একজন পুরুষ হিসেবে নিজেকে বেশি শক্তিশালী, ক্ষমতাবান বা প্রতিভাবান মনে করেন কিনা জানতে চাইলে মাসুম রেজা বলেন, ‘এটা কোন দিক থেকে আমি বুঝলাম না।’

এজ এ হিউম্যান বিয়িং…

মাসুম রেজা তখন বললেন, ‘এই ভাবনাটাই কখনও আসেনি আমার। একজন লেখক হিসেবে আমি নিজেকে প্রতিভাবান মনে করলেও একজন পুরুষ হিসেবে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবিনি কখনও। একজন লেখক হিসেবে আমি সেই কথাটা বলতে পারি যা অনেকেই বলতে পারেন না। সেই ক্ষমতাটা আমার আছে।’ হাসতে হাসতে যোগ করলেন পুরুষ হিসেবে কখনোই নয় বরং পুরুষ হলেও অনেক নারীর কাছে মার খাওয়ারও সম্ভাবনা আছে!

সমসাময়িক সাহিত্য, নাটক চলচ্চিত্রে নারীর অবস্থান, তার মত পেশাগতভাবে সফল নারী চরিত্র তুলে ধরা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে সেলিনা শেলী বললেন, এটা নিয়ে তিনি বেশ হতাশ। নারীকে শক্তিশালী দেখানো পছন্দ করেন তিনি। কিন্তু আজকে সমাজে নারীর অবস্থান, ইভ টিজিং এগুলো একদিনে হয়নি। পারফর্মিং আর্ট, চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই ছড়িয়েছে বেশি। ঝগড়াঝাঁটি করে প্রেম হয় দেখানো হলেও মেয়েরাও যে প্রেমের প্রস্তাব দিতে পারে তা দেখানো হয়না। আবার মেয়েদের মাল্টিটাস্কিং স্বভাব, সহ্য ক্ষমতা ইত্যাদি দেখানো হয়না বললেই চলে, বলেন শেলী।

ইদানীংকালে খুব একটা নাটক দেখা না হলেও মাসুমের প্রথমদিকের সব নাটকের প্রথম পাঠক তিনি। এখনও টেলিভিশন নাটকগুলোর প্রথম পাঠক তিনি না হলেও মঞ্চ নাটকগুলো এখনও তিনিই পড়েন সবার আগে। কৈতব, দ্বিচক্রযান এসব নাটকের জেন্ডার এনালাইসিসটাও তিনিই করেছিলেন বলে জানান।

একটা গল্প বলেন এই নিয়ে। দ্বিচক্রযান নাটকে বন্যাকে মেয়ে দেখতে গেলে পানিতে পা ডুবিয়ে দেখানো হয়, চুল দেখানোর পরেই দৃশ্যটা শেষ হয়ে যায়। শেলী বলেন এটা পড়ে মেয়ে দেখানোর মত কুৎসিত জিনিস আবারও দেখাচ্ছে নিয়ে খুব রাগ করেছিলেন। মাসুম বলেছিলেন এটা তো সমাজের স্বাভাবিক ঘটনা। নাট্যকার হিসেবে তিনি সমাজের চিত্রই তুলে ধরেছেন। কিন্তু হাজারবার দেখানো জিনিস আবারও দেখানো নিয়ে কড়া আপত্তি জানান শেলী। মাসুম রেজার সেদিনই ছিল স্ক্রিপ্ট জমা দেওয়ার তারিখ। হুট করে কীভাবে কি করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কিন্তু শেলী অনড় ছিলেন, এই দৃশ্য যদি দেখাতেই হয় তাহলে সাথে এমন কিছু দেখাতে হবে যা এই দৃশ্যকে অলটার করে।

স্ক্রিপ্ট জমা না দিয়ে একদিন ভাবেন মাসুম রেজা। তারপর নতুন দৃশ্যে দেখান পাত্রের মামা বলছে আচ্ছা এসব দেখা তো হইছে কিন্তু তার কাছে এসবের কোন দাম নাই। তিনি মেয়ের বুদ্ধি যাচাই করতে চান। তিনি মেয়েকে একটা ধাঁধাঁ জিজ্ঞাসা করবেন। ধাঁধাঁর উত্তর সঠিক হলেই বিয়েটা হবে।

কিন্তু বাকি সব চলচ্চিত্র বা নাটক তো তাদের হাতে নাই। কিন্তু তাদের জায়গা থেকে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

মাসুম রেজা তার স্ত্রীকে পূর্ণ সহায়তা করেছেন নিজের মত করে কেরিয়ার বা জীবন গড়ে তুলতে। একজন নারী হিসেবে যেভাবে চেয়েছেন, সেভাবেই গড়ে তুলতে পেরেছেন কিনা জানতে চাইলে সেলিনা শেলী বলেন, তার মনে হয় তিনি পেরেছেন। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বৃত্তির টাকা তোলার জন্য তাকে নিজস্ব একাউন্ট খুলে দেওয়া হয়েছিল। তার বড় বোনদেরও নিজের একাউন্ট ছিল না তখন। সেই সময় থেকেই তার ভেতরে ঢুকে যায় নিজের টাকা নিজের মত করে খরচ করা যায়। সেই সাথে ব্যক্তি মানুষ হিসেবে স্বাধীনতার বোধটাও জন্ম নিয়েছে তার মধ্যে।

একাধারে একজন মা এবং মেইন ব্রেড আর্নার হয়ে নিজেকে সফলই মনে করেন সেলিনা শেলী। তবে থিয়েটারে বা পার্ফর্মেন্স আর্টসে বেশিকিছু করতে না পারার আক্ষেপ আছে বলে জানান তিনি। আর নারী হিসেবে কেরিয়ার এগিয়ে নিতেও সেভাবে বাঁধার সামনে পড়েননি। গর্ভকালীন সময়ে  অফিস থেকে ছয়মাসের ছুটি পেয়েছিলেন। তাছাড়া বাচ্চা হওয়ার পর তাদের রাখার জন্য অফিসে ক্রেস্ট তৈরি করে দিয়েছিল।

একজন নারী হিসেবে তো তিনি সফল। সংসারও সুখের কিন্তু যেভাবে চান সেভাবে জীবনকে উপভোগ করতে পারেন কিনা জানতে চাইলে সেলিনা বলেন, এদেশে সম্ভব না। এখানে স্বাধীনভাবে রাস্তায় হাঁটাও যায়না। সমস্যা অবকাঠামোতে না, সমস্যা মানুষের দৃষ্টিতে। মেয়ে বা মহিলা মানেই আলাদা করে দেখার প্রবণতা খুব অস্বস্তিতে ফেলে। তাই এইদেশে নারী হিসেবে জীবন উপভোগ করা সম্ভব না। কিন্তু স্বাধীনভাবে চলা খুব মিস করেন বলে জানান তিনি।

আলোকচিত্র- আবদুল্লাহ আল মামুন এরিন

সারাবাংলা/আরএফ/এসএস

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন