রবিবার ২০ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ৪ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ২০ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ৪

ডিসেম্বর ৪, ২০১৮ | ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ

।। ফারুক ওয়াহিদ ।।

বিজ্ঞাপন

৪ ডিসেম্বর ১৯৭১। হেমন্তের কুয়াশাচ্ছন্ন শীতার্ত দিনটি ছিল শনিবার। আন্তর্জাতিক রাজনীতির অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য দিনটি ছিল অস্থির, উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগের; সাড়ে সাত কোটি বাঙালির ঘুম হারাম হয়ে যাওয়ার অবস্থা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য খবর ছিল— পাকিস্তানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সিনিয়র জর্জ বুশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপন। যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে দাবি করে, “এই মুহূর্তে ভারত ও পাকিস্তান নিজ নিজ সীমান্তের ভেতরে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে হবে।” যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাস করানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র তখন বৈঠকের পর বৈঠক করছে, সবাই তখন চরম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন।

এই যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তান-ভারতের মধ্যেকার যুদ্ধ হিসেবে সবার সামনে উপস্থাপন করা। পূর্বপরিকল্পিতভাবে এটা প্রমাণ করার জন্য পাকিস্তান বিমানবাহিনী ৩ ডিসেম্বর রাতে ভারতের বেশ কয়েকটি স্থানে বিমান হামলা চালায় এবং এরই পরিপ্রেক্ষিতে একই তারিখে রাতের বেলা ভারতও পাকিস্তানের ওপর হামলা চালায়। এই যখন যুদ্ধের নাটকীয় উৎকণ্ঠাময় অবস্থা, তখন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ লিখিত পত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানান। এই চরম উৎকণ্ঠার মধ্যেও সারাবাংলায় হঠাৎ বিনা মেঘে বৃষ্টির সুশীতল বাতাস বয়ে যাওয়ার মতো অত্যন্ত সুখবরটি চলে আসে— সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দেওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিরাপত্তা পরিষদে ভেস্তে গেছে। শুধু তাই নয়, পোল্যান্ডও এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটোর সংবাদে রণাঙ্গনে প্রাণপণে লড়াইরত বিজয়ের পথে থাকা মিত্র-মুক্তিবাহিনী উল্লাসে ফেটে পড়ে। যুদ্ধক্ষেত্রে আরও একটি আনন্দের সংবাদ আসে। সেটি হলো— ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকে। বিবিসি, ভায়েস অব আমেরিকা, আকাশবাণী ও স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটোর সংবাদ শোনার পর মুক্তিবাহিনী ও মিত্র (ভারতীয়) বাহিনীর জয়বাংলা স্লোগানসহ তীব্র আক্রমণের মুখে বাংলাদেশের প্রতিটি জায়গায় দিশেহারা হয়ে পালানোর পথ খুঁজতে থাকে হানাদার পাকিস্তান বাহিনী।

বিজ্ঞাপন

এদিকে, রাতে রণাঙ্গনের বাংকারে বসেই শুনতে পাই, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে প্রচারিত হচ্ছে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার রচিত সেই কালজয়ী গান— “বাংলার হিন্দু বাংলার বৌদ্ধ/ বাংলার খ্রিস্টান বাংলার মুসলমান,/ আমরা সবাই বাঙালি!/ তিতুমীর ঈসা খাঁ সিরাজ সন্তান এই বাংলাদেশের,/ ক্ষুদিরাম সূর্যসেন নেতাজী সন্তান এই বাংলাদেশের,/ এই বাংলার কথা বলতে গিয়ে বিশ্বটাকে কাঁপিয়ে দিল কোন সে কণ্ঠস্বর,/ মুজিবর, সে যে মুজিবর,/ জয় বাংলা বলে রে ভাই।।/ ছয়টি ছেলে বাংলা ভাষার চরণে দিল প্রাণ,/ তারা বলে গেল ভাষাই ধর্ম ভাষাই মোদের প্রাণ।।/ মাইকেল বিশ্বকবি নজরুল সন্তান এই বাংলাদেশের,/ কায়কোবাদ বিবেকানন্দ অরবিন্দু সন্তান এই বাংলাদেশের,/ এই বাংলার কথা বলতে গিয়ে বিশ্বটাকে কাঁপিয়ে দিল কোন সে কন্ঠস্বর,/ মুজিবর, সে যে মুজিবর,/ জয়বাংলা বলে রে ভাই।।”

এই গান শোনার পর আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ত টগবগিয়ে ওঠে। এই গান ছিল যেন টনিকের মতো। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তখন মনে হচ্ছিল, শরীরে একটা অলৌকিক শক্তি এসে গেছে। “বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালি”— ‘জয়বাংলা’র সঙ্গে এই জনপ্রিয় স্লোগানটিও একাত্তরের স্লোগান এবং এই স্লোগানটি নিয়ে তখন জীবনবাজি রেখে লড়াইরত বিভিন্ন ধর্মের মুক্তিযোদ্ধাদের মনে সংকীর্ণতার কোনো প্রশ্নই ওঠেনি।

৩ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ১টায়, অর্থাৎ ৪ ডিসেম্বর প্রথম প্রহরেই বিমান হামলা শুরু করে মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর বিমানগুলো। ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ও মিত্র বাহিনীর বিমানবাহিনী অবরুদ্ধ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বারবার হানা দেয়। মুক্তিযুদ্ধের এই দিনে লক্ষ্মীপুর হানাদারমুক্ত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা দখল করে নেয় মেহেরপুর। এদিকে, মিত্র ও মুক্তিবাহিনী দর্শনা শত্রুমুক্ত করে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপক আক্রমণ চালিয়ে কামালপুর নিজেদের আয়ত্তে আনেন। একাত্তরের এই দিনে ৩ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা শমশেরনগর বিমানবন্দর দখল করে নেয়।

আখাউড়া রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনীর পূর্ণ জয় হয় এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাকিস্তানি সৈন্যরা মুক্তিবাহিনী কতৃক অবরুদ্ধ হয়ে থাকে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পতন তখন কেবল সময়ের ব্যাপার। মিত্র ও মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি হানাদারদের একটির পর একটি দুর্গের পতন ঘটিয়ে বীরের বেশে এগিয়ে চলছে তখন। পাঁচ দিনব্যাপী বিরতিহীন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর আখাউড়া সেক্টরের গঙ্গাসাগর, গুরুত্বপূর্ণ  আখাউড়া রেলওয়ে জংশন ও উজানীসারের পাকিস্তানিদের শক্ত ঘাঁটি দখলের পর মুক্তিবাহিনী দুই দিক থেকে এগিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুই পাশ দিয়ে এসে আশুগঞ্জেও অবরোধ তৈরি করেছে।

পূর্বাঞ্চলীয় রণাঙ্গনে মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা এদিন সকালে কলকাতায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, ভারতীয় পদাতিক, সাঁজোয়া ও বিমানবাহিনী পশ্চিমবঙ্গের বয়ড়া ও হিলি সীমান্ত দিয়ে ও ত্রিপুরার আগরতলা সীমান্ত পথ দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে। বিমান বাহিনীর কয়েকটি স্কোয়াড্রনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে গোলাবর্ষণের আদেশ দিয়েছেন। পদাতিক বাহিনীকে গোলন্দাজ ও সাঁজোয়া বাহিনী ছাড়া বিমান বাহিনীও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সাহায্য করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর বিমান বাহিনী কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর আঘাত হানতে থাকে। চাঁদপুর, দাউদকান্দি, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিরাজগঞ্জ, ঈশ্বরদি, সৈয়দপুর, রংপুর, যশোর ও খুলনার শক্তঘাঁটিগুলো এবং ফেরিঘাট ও রেলস্টেশনগুলো বিমান আক্রমণে তখন বিপর্যস্ত। (তথ্যসূত্র: ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আগরতলা ত্রিপুরা’ –সুকুমার বিশ্বাস)

এদিকে, পাকিস্তানিরা মিত্র-মুক্তিবাহিনীর দুর্বার আক্রমণের কাছে টিকতে না পেরে যুদ্ধে হেরে যাওয়ার আগে গণহত্যা ও বাংলাদেশে পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করে শ্মশান করে দিচ্ছে বাংলাদেশকে। যুদ্ধের বেগতিক অবস্থা দেখে রাতের আঁধারে অর্থাৎ গভীর রাতে পিআইএর তিনটি বোয়িং বিমানে করে হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ অফিসারদের পরিবারকে গোপনে করাচি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

[লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা; ২ নম্বর সেক্টর বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া]

সারাবাংলা/টিআর

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন