বুধবার ১৬ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ১ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৬ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ৬

ডিসেম্বর ৬, ২০১৮ | ১১:২০ পূর্বাহ্ণ

।। ফারুক ওয়াহিদ ।।

বিজ্ঞাপন

৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, সোমবার। হেমন্তের রোদমাখা উজ্জ্বল সকালের মুক্তিযুদ্ধের এই দিনটি ছিল বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের জন্য অসামান্য কূটনৈতিক বিজয়ের একটি ঐতিহাসিক দিন এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের স্বাধীন বাংলার জন্য সাফল্যের একটি দিন। এদিন রণাঙ্গনের অবস্থা আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং মুক্তি-মিত্রবাহিনীর আক্রমণে দিশাহারা হানাদার বাহিনী সূর্য ওঠার আগেই বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে জীবন নিয়ে পালাতে থাকে। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর এই অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতির সময় ভারত স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশকে।

৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, সোমবার ভারতের সময় সকাল ১০টা পয়তাল্লিশ ৪৫ মিনিটে, অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে ভারত সরকার স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

আরও পড়ুন- ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ৫

বিজ্ঞাপন

মুজিবনগর সরকার কর্তৃক ১০ এপ্রিল ’৭১ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে গৃহীত রাষ্ট্রের নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ উদ্ধৃত করে লোকসভার অধিবেশনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নামে অভিহিত হয়েছে।” ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তৃতার পর সকল সদস্য দাঁড়িয়ে ‘জয়বাংলা’ স্লোগান দিয়ে তুমুল হর্ষধ্বনির মাধ্যমে এই ঘোষণাকে অভিনন্দন জানান।

এই স্বীকৃতির ফলে মুক্তিযুদ্ধের এই দিনে পাকিস্তান ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়, আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়, পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করছে ‘বাংলাদেশ’। এই স্বীকৃতির খবর মুহূর্তে ‘আকাশবাণী’র মাধ্যমে চলে আসে রণাঙ্গনে যুদ্ধরত অবস্থায় মিত্র-মুক্তিবাহিনীর কাছে। রণাঙ্গনে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা ঐতিহাসিক এই স্মরণীয় মুহূর্তকে সেলিব্রেট করি ‘জয়বাংলা’ স্লোগান দিয়ে শূন্যে গুলিবর্ষণ করে।

আরও পড়ুন- ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ৪

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা তখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, আমার দুঃখিনী বাংলা আজ ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশ, তুমি আমার গর্ব, ‘সারাবিশ্বের বিস্ময়, তুমি আমার অহংকার।’ রণাঙ্গনে যুদ্ধরত অবস্থায়ও একটি সুখী সম্মৃদ্ধ বাংলাদেশ চোখের সামনে ঝিলিক দিয়ে ওঠে, এ যেন—

“একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার/ সারাবিশ্বের বিস্ময়, তুমি আমার অহংকার।/ তোমার স্বাধীনতা গৌরব সৌরভে/ এনেছে আমার প্রাণের সূর্যে রৌদ্রেরও সজীবতা/ দিয়েছে সোনালি সুখী জীবনের দৃপ্ত অঙ্গীকার।/ সারাবিশ্বের বিস্ময়, তুমি আমার অহংকার।/ তোমার ছায়া ঢাকা রৌদ্রেরও প্রান্তরে/ রেখেছি অতল অমর বর্ণে মুক্তির স্নেহ মাখা/ জেনেছি তুমি জীবন মরণে বিমুগ্ধ চেতনার।/ সারাবিশ্বের বিস্ময়, তুমি আমার অহংকার।” (গীতিকার: নাইম গওহর, সুরকার: অজিত রায়, কণ্ঠশিল্পী: সাবিনা ইয়াসমিন)

এদিকে, ৬ ডিসেম্বর রণাঙ্গনে ‍মিত্র-মুক্তিবাহিনী যুদ্ধে প্রচণ্ড সংঘর্ষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে বিজয়ের বেশে এগিয়ে চলতে থাকে। এদিনের যুদ্ধজয়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি, জেলা শহর যশোরের পতন অর্থাৎ যশোর মুক্ত। মিত্র-মুক্তিবাহিনীর সম্মিলিত মরণপন আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে পলায়নরত পাকিস্তানি সৈন্যরা যশোর ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেয় এবং পরে মিত্র-মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। যশোর ক্যান্টনমেন্ট ছিল পাকিস্তানিদের শক্ত ঘাঁটি এবং এর পতনের পর ঢাকার পাকিস্তানি জেনারেলদের মনোবলও ভেঙে পরে। মিত্র-মুক্তিবাহিনী পায়ে হেঁটে ঝিনাইদহ পৌঁছে এবং শহরটি মুক্ত করে।

এদিন, কুমিল্লায় মুক্তিবাহিনীর এস ফোর্সের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধ হয় পাকিস্তান বাহিনীর। চান্দিনার অদূরে এস ফের্সের অধিনায়ক কর্নেল সফিউল্লাহ পাকিস্তানিদের অ্যামবুশে পড়েও ভাগ্যক্রমে প্রাণে রক্ষা পান। এ যুদ্ধে অবশ্য এস ফোর্সই জয়ী হয়। এদিনে মিত্রবাহিনী আকাশ থেকে অবাধ গতিতে বিমান আক্রমণ চালায়। বঙ্গোপসাগরে ভারতের নৌবাহিনী সৃষ্টি করে নৌ-অবরোধ। আজকের এ দিনে ফেনী মুক্ত হয় এবং ফেনীতে উওড়ে বাংলাদেশের বিজয়ের পতাকা। দশম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট ও সাবসেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা কর্নেল জাফর ইমামের নেতৃত্বে ফেনী মুক্ত করেন।

আরও পড়ুন- ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ৩

এদিকে, মেজর জলিলের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধারা সাতক্ষীরা মুক্ত করে খুলনার দিকে বিজযের বেশে অগ্রসর হতে থাকে। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও মুক্ত করে সেদিন বীরগঞ্জ ও খানসামার পাকিস্তানি অবস্থানের দিকে এগিয়ে চলছিল মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী। লাকসাম, আখাউড়া, চৌদ্দগ্রাম, হিলিতেও মুক্তিবাহিনী দৃঢ় অবস্থান নেয় এবং রাতে আখাউড়া ও সিলেটের শমসেরনগর যৌথবাহিনীর দখলে আসে এবং আখাউড়ায় ওড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পতন তখন শুধু সময়ের ব্যাপার।

এদিকে, স্বীকৃতি পেয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জাতির উদ্দেশে এক বেতার ভাষণে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম মিত্ররাষ্ট্র ভারতের জওয়ানদের অভিনন্দন জানান।

আরও পড়ুন- ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ২

এদিন ঢাকা থেকে বিদেশি নাগরিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওর জন্য ভারতের কাছে দুই ঘণ্টা সময় চান জাতিসংঘের মহাসচিব উথান্ট, ভারত সে সময় দেয় জাতিসংঘকে। চীন-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জোটের ১০টি দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধবিরতি এবং সৈন্য প্রত্যাহারের যে দ্বিতীয় প্রস্তাব দিয়েছিল, তাতে সোভিয়েত রাশিয়া আবারও ভেটো দেয়। ভেস্তে যায় চীনা-মার্কিনিদের পরিকল্পনা। অন্যদিকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ায় ভারতের সঙ্গে তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে পাকিস্তান। আর ভারতে মার্কিন অর্থনৈতিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যায়।

লেখক: ফারুক ওয়াহিদ, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা; ২ নং সেক্টর বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

সারাবাংলা/টিআর

Advertisement
বিজ্ঞাপন

Tags:

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন