রবিবার ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৩১ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ১৩

ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮ | ১২:৫২ অপরাহ্ণ

।। ফারুক ওয়াহিদ ।।

বিজ্ঞাপন

১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১, সোমবার। একাত্তরের এ সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল শ্বাসরুদ্ধকর ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ের আনন্দে বিভোর আর অন্যদিকে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী পরাজয় নিশ্চিত জেনে নানা কূটকৌশলের মাধ্যমে অপকর্ম অব্যাহত রেখে তাদের এ দেশীয় দোসরদের নিয়ে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করে যাওয়ার প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠেছে।

আরও পড়ুন: ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ১২

১৩ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনী নীলফামারী মুক্ত করে। সেদিন আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ে। পাকিস্তানি হানাদাররা নীলফামারী সরকারি কলেজ, কলেজ ছাত্রাবাস ও ভকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে গড়ে তুলেছিল শক্ত ঘাঁটি এবং সেই ক্যাম্পে নারী পুরুষকে ধরে এনে নির্মম নির্যাতন চালাতো। ১৩ ডিসেম্বর নীলফামারীর তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ের ওপরে উড়ানো হয় স্বাধীন বাংলার পতাকা। প্রতি মুহূর্তে বিজয়ের খবর আসছে- ঢাকা ছাড়া বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা মুক্ত এবং সেখানে পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণ শুরু করেছে।

আরও পড়ুন: ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ১১

বিজ্ঞাপন

এদিন কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসের পতন হয় অবশেষে পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করে। একাত্তরের এই দিনে মানিকগঞ্জ-এ প্রচণ্ড সংঘর্ষের পর মুক্তিবাহিনী হানাদারদের কবল থেকে মুক্ত করে। এই দিনে বগুড়ার কাহালু থানা মুক্তবাহিনী হানাদারদের কবল থেকে মুক্ত করে। মুক্তিবাহিনী আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি সৈন্যদের মিত্রবাহিনীর কাছে হস্তাস্তর করে।

আরও পড়ুন: ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ১০

বাংলার মুক্তিকামী জনতা যে যেভাবে পারছে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সদস্যদের ঢাকার দিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করছে- বিশেষ করে নদী পারাপার। বাংলাদেশ জুড়ে উড়ছে লাল-সবুজ পতাকা। মুজিবনগর সরকারে তখন চরম উত্তেজনা- এদিন যুদ্ধজয়ের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশ থেকে জাতিসংঘের যেসব কর্মী, কূটনৈতিক প্রতিনিধি ও বিদেশি নাগরিক নিরাপদে সরে আসতে চান সরকার তাদের সব রকমের সুযোগ-সুবিধা দেবে।

আরও পড়ুন: ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ৯

এদিন শান্তি কমিটি, গভর্নর ডা. মালিক মন্ত্রিসভা ও স্বাধীনতাবিরোধী দালালরা তৎকালীন গভর্নর হাউসে জেনারেল নিয়াজির সঙ্গে বৈঠক চলাকালে মিত্রবাহিনীর বিমান গভর্নর হাউসে বোমাবর্ষণ করে- গভর্নর ডা. মালিক তখনই পদত্যাগ করেন এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে রেডক্রসের গাড়িতে করে নিরপেক্ষ এলাকা বলে ঘোষিত হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এসে আশ্রয় নেন।

আরও পড়ুন: ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ৮

এদিনে পূর্ব ও উত্তর দিক থেকে মিত্রবাহিনী ঢাকার প্রায় ১৫ মাইলের মধ্যে পৌঁছে যায়। অকুতোভয় তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকায় ঢুকে পড়েছে। ৫৭ নম্বর ডিভিশনের দুটো ব্রিগেড এগিয়ে আসে পূর্বদিক থেকে। উত্তর দিক থেকে আসে জেনারেল গন্ধর্ব নাগরার ব্রিগেড এবং টাঙ্গাইলে নামা ছত্রীসেনারা। পশ্চিমে ৪ নম্বর ডিভিশনও মধুমতি পার হয়ে পৌঁছে যায় পদ্মার তীরে। রাত ৯টায় মেজর জেনারেল নাগরা টাঙ্গাইল আসেন। টাঙ্গাইলে মেজর জেনারেল নাগরা মুক্তিবাহিনীর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা যদি আমাদের বিনা বাধায় এতটা পথ পাড়ি দিতে সাহায্য না করতেন, তাহলে আমাদের বাহিনী দীর্ঘ রাস্তায় যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ত। পথে পথেই আমাদের অনেক শক্তি ক্ষয় হয়ে যেতো। মুক্তি-মিত্রবাহিনী জয়দেবপুর, টঙ্গী ও সাভার হয়ে ঢাকার উপকণ্ঠে এসে উপস্থিত হয়। এদিন লে. কর্নেল শফিউল্লাহর ‘এস’ ফোর্স ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে ঢাকার উপকণ্ঠে ডেমরা পৌঁছায়। এই দিনে যৌথ বাহিনীর অগ্রবর্তী সেনাদল শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী অতিক্রম করে ঢাকার ৫-৬ মাইলের মধ্যে পৌঁছে যায়। এদিকে বাংলাদেশের নিয়মিত বাহিনীর সর্বপ্রথম ইউনিট হিসেবে ঢাকার শীতলক্ষ্যার পূর্বপাড়ে মুরাপাড়ায় পৌঁছায়। বাসাবো ও খিলগাঁও এলাকার চারদিকে আগে থেকেই পাকিস্তান বাহিনী ফিল্ড ডিফেন্স বা আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থাসহ অবস্থান নিয়েছিল। ঢাকার আকাশ মিত্রবাহিনীর বিমানবাহিনীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে থাকায় তারা পাকিস্তানি সামরিক অবস্থানের ওপর তীব্র আক্রমণ চালায়।

আরও পড়ুন: ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ৭

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একমাত্র শুধু একমাত্র ভরসা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ- কিন্তু আজ নিয়াজীকে জানানো হয়, মার্কিন সপ্তম নৌবহর এসে পৌঁছানোর কথা ছিল তা আটচল্লিশ ঘণ্টার জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এদিকে চীনকে সামরিক হস্তক্ষেপের ব্যাপারে রাজি করানোর কাজে ইসলামাবাদ সারাদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যায়।

মিত্রবাহিনীর বিমানবাহিনী ঢাকার পাকিস্তানিদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে বোমাবর্ষণ শুরু করলে জেনারেল নিয়াজি বোমাবর্ষণ বন্ধ রাখার জন্য ভারতের জেনারেল মানেকশ'র প্রতি আহ্বান জানান। তার অনুরোধে পরে ১৪ ডিসেম্বর বিকেল ৫টা থেকে ১৫ ডিসেম্বর সকাল ৯টা পর্যন্ত ঢাকা ও এর আশপাশে বোমাবর্ষণ বন্ধ রাখা হয়। আসলে নিয়াজির ভারতীয় বিমানবহিনীর বোমাবর্ষণ বন্ধ রাখার অনুরোধের উদ্দেশ্য ছিল ৭ম নৌবহরের সাহায্যের আশায় তাই এটা ছিল নিছক কালক্ষেপণ মাত্র।

আরও পড়ুন: ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ৬

চারদিক থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের খবর আসতে থাকায় স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের আরো উদ্বুদ্ধ করার জন্য রক্তগরম করা গান ঘন ঘন প্রচার করা হচ্ছে- “রক্তের প্রতিশোধ রক্তে নেবো আমরা।” –রণাঙ্গনে থেকে স্বাধীনবাংলা বেতার-এর এই গান শুনে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা পবিত্র মাটি ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করি “রক্তের প্রতিশোধ রক্তেই নেবো আমরা”- কিন্তু বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় ‘জেনেভা কনভেনশন’ এবং মিত্রবাহিনী- আমাদের মনে হচ্ছে ‘জেনেভা কনভেনশন’ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা শুধু মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর জন্য প্রযোজ্য- হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের জন্য নয়!

“রক্তের প্রতিশোধ রক্তেই নেবো আমরা/ রাত্রির অন্ধকারে আলোর অভিযাত্রিরা/ তোমার মায়ের ভাইয়ের বোনের পরে/ অন্যায় অবিচার হত্যার উৎসবে মিলেছে দস্যুরা/ তোমার মায়ের হাসি ধানের সবুজ শীষ/ ঘৃণ্য পশুর ঘায় এক হয়ে গেছে ভুলোনা/ না না না না/ তোমার সবুজ গাঁও স্নিগ্ধ নদীর জল/ দস্যুর আঘাতে রক্তে লাল হল ভুলোনা/ প্রতিশোধ নেবো আমরা- প্রতিশোধ নেবো আমরা/ সঙ্গিন সঙ্গী মোদের রক্তে লিখে যাবো নতুন ইস্তেহার আমরা/ ইতিহাস বলে জানি আমরা- আমরা পরাজিত হইনি/ সুর্য পাতাল হতে আমরা জীবন জয়ের পথে কভু থামিনি/ ইতিহাস বলে জানি আমরা, অগ্নি দাহনে জ্বালে তোমার স্নেহের নীড়/ পথে পথে সব নিরন্যদের ভিড় ভুলোনা/ না না নানা/ সদ্য বধুর লাঞ্ছিতা বাসর ঘর,/ তোমার শিশুর হত্যার উৎসব ভুলোনা/ না না না না/ প্রতিশোধের অগ্নি জ্বলুক চারিদিকে/ ছিন্নভিন্ন নিশ্চিহ্ন করবো শত্রুর ছাউনি আমরা/ প্রতিশোধের অগ্নি জ্বলুক চারিদিকে/ ছিন্নভিন্ন নিশ্চিহ্ন করবো শত্রুর ছাউনি আমরা/ রাত্রির অন্ধকারে আলোর অভিযাত্রিরা/ তোমার মায়ের ভাইয়ের বোনের পরে/ অন্যায় অবিচার হত্যার উৎসবে মিলেছে দস্যুরা/ রক্তের প্রতিশোধ রক্তেই নেবো আমরা/ রক্তের প্রতিশোধ রক্তেই নেবো আমরা/ রক্তেই নেবো আমরা- রক্তেই নেবো আমরা।” [চলবে]

লেখক: ফারুক ওয়াহিদ, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা; ২ নং সেক্টর বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন