বিজ্ঞাপন

‘চট্টলবীর’ ছাড়া চট্টলার এক বছর

December 15, 2018 | 6:41 am

।। স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট।।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম ব্যুরো: এবিএম মহিউদ্দিনকে ছাড়া কেমন হবে রাজনীতির ময়দান, কেমন থাকবে বন্দরনগরী- মানুষের এই চিন্তার মধ্যেই একবছর আগে বিদায় নিয়েছেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক। চট্টগ্রামের মানুষ হয়তো সেভাবে চিন্তাও করেননি যে, একদিন হুট করে চলে যাবেন তাদের প্রাণের নেতা। কিন্তু গত এক বছর ধরে বাস্তবেই উপস্থিতি নেই মহিউদ্দিনের। রাজনীতির মাঠে গর্জন নেই, ঘরের বৈঠকখানার আড্ডায় নেই, বিয়ে কিংবা দাফন, সামাজিক অনুষ্ঠান- কোথাও তিনি নেই। চট্টগ্রামের জন্য কণ্ঠ উঁচু করে কথা বলার লোকটি হারিয়ে গেছেন।

আসলেই কি হারিয়ে গেছেন ? শরীরী উপস্থিতি না থাকলেও এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী কি এখনও প্রাসঙ্গিক নন ? প্রয়াণের এক বছরে এসে সারাবাংলা.নেট চট্টগ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে এই বিষয়ে জানতে চেয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন। ছাত্রজীবন থেকে মহিউদ্দিনের ভাবশিষ্য। সুজনের মতে, চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী এখনও প্রেরণার উৎস।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন: মানুষের মাঝে নওফেল, যেন ফিরলেন মহিউদ্দিন!

খোরশেদ আলম সুজন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা অনেক সময় টাকা-বিত্ত-বৈভবের কাছে রাজনীতির পরাজয় দেখি। কিন্তু মহিউদ্দিন ভাই বিত্ত-বৈভবের কাছে মাথা নোয়াননি। মাথা উঁচু করে রাজনীতি করে গেছেন। বিত্ত-বৈভব অনেক সময় মহিউদ্দিন ভাইয়ের কাছে এসে পরাস্ত হয়েছে। এজন্যই মহিউদ্দিন ভাই আমাদের প্রেরণার উৎস। তিনি এখনও যেমন প্রাসঙ্গিক, তেমনি চট্টগ্রামের রাজনীতিতে তার আবেদন কখনও ফুরিয়ে যাবে না।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অশোক সাহা সারাবাংলাকে বলেন, ‘এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী সর্বগুণে গুণান্বিত ছিলেন, এটা কখনোই বলব না। মানুষ হিসেবে উনারও সীমাবদ্ধতা ছিল। কিন্তু মানুষের মনের কথা উনি খুব ভালো বুঝতে পারতেন। এজন্যই মানুষের মনের মধ্যে তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন। উনাকে আমরা অনেক সময় মানুষের স্বার্থে, চট্টগ্রামের স্বার্থে নিজের দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত নিতে দেখেছি। যেমন-চট্টগ্রামে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনটা নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠুক, সেটা উনি কখনোই চাননি। সীমাবদ্ধতার কথাটা আর আলোচনায় আনতে চাই না। কারণ তিনি এখন নেই।’

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাহবুবুল আলমের মতে, বন্দরনগরীর আপামর ব্যবসায়ীরা এখনও এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে গভীরভাবে অনুভব করেন।

‘এখনও যখন দেখি, কখনও চট্টগ্রামের প্রতি অবিচার করা হচ্ছে, চট্টগ্রামকে পিছিয়ে রাখা হচ্ছে কিংবা আমরা ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েছি, তখন মহিউদ্দিন ভাইয়ের কথা খুব মনে পড়ে। হয়ত তিনি বেঁচে থাকলে একাই আমাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে যেতেন ! ঠেকে গেলে মনে হয়, মহিউদ্দিন ভাই যদি বেঁচে থাকতেন !’

মাহবুবুল আলম বলেন, ‘এককথায় বলি, মহিউদ্দিন ভাইকে হারিয়ে আমরা চট্টগ্রামের আপামর ব্যবসায়ীরা একজন অভিভাবক হারিয়েছি। এই অভাব তো সহজে পূরণ হওয়ার নয়। সরাসরি সত্য কথা বলার মতো এমন অকুতোভয় নেতা খুব কমই আছেন।’

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি দেলোয়ার মজুমদার সারাবাংলাকে বলেন, ‘এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী শুধু আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন না। তিনি একজন প্রকৃত গণমানুষের নেতা ছিলেন। কারণ তিনি রাজনৈতিক চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পক্ষ নিয়ে লড়াই করেছেন। চট্টগ্রাম বন্দর যখন আমেরিকার একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র হচ্ছিল, তখন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী নিজ দলের সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সেটি ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামের নাগরিকরা অনেক সময় মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনেক কর্মকাণ্ডে দ্বিমত করেছেন। সরাসরি প্রতিবাদও করেছেন। কিন্তু মহিউদ্দিন চৌধুরীকে মানুষ তাদের হৃদয় থেকে মুছে ফেলেননি। সেটি জীবিতকালে এবং মৃত্যুর পরও। সাধারণ মানুষ এখনও সমস্যা-সংকটে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে স্মরণ করেন। তিনি এখনও সবার কাছে জীবিত।’

কবি ও সাংবাদিক কামরুল হাসান বাদল সারাবাংলাকে বলেন, ‘অনেক রাজনীতিক মন্ত্রী-এমপি, মেয়র এমনকি প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতিও হন। কিন্তু জননেতা হতে পারেন না। মহিউদ্দিন চৌধুরী মেয়র হয়েছিলেন, মন্ত্রী-এমপি ছিলেন না। কিন্তু তিনিই স্মরণকালের মধ্যে চট্টগ্রামের সবচেয়ে জননন্দিত জননেতা হতে পেরেছিলেন, কারণ তিনি জনগণের মনের ভাষা বুঝতেন। আরেকজন জননেতা না আসা পর্যন্ত মহিউদ্দিন জননন্দিত হয়েই মানুষের হৃদয়ে থাকবেন।’

তিনি বলেন, ‘আরেকজন জননেতা আসলেও মহিউদ্দিন চৌধুরী কখনও বিস্মৃত হবেন না। কারণ তিনি ইতিহাসের অনেক দায় মিটিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, চট্টগ্রাম বন্দরকে রক্ষার সংগ্রাম-অনেক আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ইতিহাসের পাতায় এমনিতেই ঠাঁই করে নিয়েছেন। চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ সকল আন্দোলন-সংগ্রামে, রাজনীতিতে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নামটি সগর্বে উচ্চারিত হবে।’

২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর একটি ক্লিনিকে জীবনাবসান হয় এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর। টানা ১৭ বছরের মেয়র মহিউদ্দিন, যিনি চট্টগ্রামের স্বার্থের জন্য আপোষহীন থেকে যিনি বন্দরনগরীর মানুষের কাছে ‘চট্টলবীর’ হিসেবে খ্যাত।

মহিউদ্দিন যখন জীবিত ছিলেন, দিনরাত সরগরম থাকত নগরীর চশমাহিলের বাসায় চট্টলবীরের বৈঠকখানা। সেই বৈঠকখানায় চট্টলবীরের চেয়ারটি এখনও আছে। মানুষ বসার সোফাও আছে। দেওয়াল জুড়ে ফ্রেমবন্দী মহিউদ্দিনের স্মৃতি। আন্দোলন-সংগ্রামের মহিউদ্দিন, রাজনীতির-রাজপথের মহিউদ্দিন।

সেই বৈঠকখানাই সবই আছে, নেই শুধু মহিউদ্দিন। তবুও দিনশেষে অসংখ্য মানুষ এখনও ছুটে যান চট্টলবীরের বৈঠকখানায়।

মহিউদ্দিনের একান্ত সহকারী হিসেবে দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালন করা সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ওসমান গণি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘স্যার নেই। তবুও অনেকে আসেন। বৈঠকখানায় বসেন। ছবিগুলো দেখেন। অনেকে কান্না করেন। আমরা সাধ্যমতো তাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করি। কারণ, স্যার মানুষকে খাওয়াতে ভালোবাসতেন।’

মহিউদ্দিনের ছেলে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এখন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী-বাকলিয়া) আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী।

নওফেল মনে করেন, আওয়ামী লীগের জন্য তার বাবার অবদানকে মনে রেখেছেন দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। বাবার ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে দলে পদ ও সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

সারাবাংলা/আরডি/এমএইচ

Tags: , ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন