মঙ্গলবার ১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ৩০ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ সফর, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়ের দলিল

ডিসেম্বর ১৫, ২০১৮ | ৯:০৭ অপরাহ্ণ

আন্দালিব রাশদী

বিজ্ঞাপন

আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি টপ সিক্রেট কর্ম-তালিকায় একাধিকবার পশ্চিম পাকিস্তানের ভৌগলিক অখণ্ডতা রক্ষায় আমেরিকার প্রতিশ্রুতির কথা, আমেরিকার মিত্রদের সাহায্য গ্রহণের কথা এমনকি কড়া ভাষায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে হুমকি দেবার কথা বলা হয়েছে।

এই কর্মতালিকা থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ যে আর পাকিস্তানের সাথে নেই সে হিসেবটা তারা আগেই করেছে। ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নিয়ে যে তাদের মাথাব্যথা কম দিল্লি সফরে এসে হেনরি কিসিঞ্জারের যে গোপন আলাপ (পরবর্তী সময়ে ডি-ক্ল্যাসিফাইড ডকুমেন্টে প্রকাশিত) তা থেকে স্পষ্ট।

বোস্টন গ্লোবের সংবাদ- গণযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে

বিজ্ঞাপন

কেনেথ কিটিং দিল্লিতে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ভারত মহাসাগরে সপ্তম নৌবহরের কারণে ভীষণ বিব্রত, তিনি স্টেট ডিপার্টমেন্টেকে কড়া টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন।

তিনি এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন বাংলাদেশ অবশ্যই স্বাধীন হতে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে নতুন এই দেশটির সাথে আমেরিকার সুসম্পর্ক স্থাপন করা উচিত। ওদিকে সিনেটর কেনেডি বলেছেন, গণহত্যার দায় সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানের। একাত্তরের ৫ জুন সিডনি শনবার্গ নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ লিখেছেন কলেরা আক্রান্ত শরণার্থীদের দুর্দশার কথা। বি জেড খসরু বলছেন, যখন পূর্ব পাকিস্তান পুড়ছে, জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঝিমোচ্ছেন। এই রচনায় শেষের এপিসোডটি ডিসেম্বরের বিজয় সংবাদ। লি লেসেইজ ওয়াশিংটন পোস্টে লিখেছেন বাঙ্গালি ২৫ মার্চের পর যে পতাকা লুকিয়ে রেখেছিল, এখন সগর্বে তা উড়াচ্ছে।

বোস্টন গ্লোবের খবর (বায়ে) সপ্তম নৌবহর (ডানে)

ভারত-পাকিস্তান সঙ্কট : যুক্তরাষ্ট্রের করণীয়

স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মতালিকা
এটি টপ সিক্রেট সংবেদনশীল দলিল। ঈষৎ সংক্ষেপে উপস্থাপিত হলো:
১. রাষ্ট্রদূত কিটিং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আশু সাক্ষাৎ করে কাঠোর কুটনৈতিক বার্তা (হুমকি!) দেবেন। (কেনেথ কিটিং নয়া দিল্লিতে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত)

২. অবিলম্বে ভারত মহাসাগরে ইউ এস ন্যাভাল টাস্ক ফোর্স পাঠাতে হবে-কারণ গভীর সমুদ্রে মার্কিন নৌযান নিয়ে ভারতের অযাচিত হস্তক্ষেপের জবাব দেওয়া; যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নিরাপদে প্রত্যাহারও একটি কারণ হতে পারে।

৩. জর্ডান পশ্চিম পাকিস্তানকে যে দুই স্কোয়াড্রন উড়োজাহাজ দেবে তা পূরণ করতে ইরান জর্ডানকে দুই স্কোয়াড্রন দেবার যে প্রস্তাব দিয়েছে তা গ্রহণ করা।

৪. আমেকিার সরকারের পক্ষ থেকে এই বার্তা দেওয়া যে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে অস্ত্রনীতি পূর্ণবিবেচনা করা হচ্ছে।

৫. পাকিস্তানকে অতিরিক্ত সামরিক সহযোগিতা ও রসদ সরবরাহের জন্য একই সঙ্গে ইরান, জর্ডান ও ইজরায়েলকে অনুরোধ জানানো। ইজরায়েলের পক্ষ থেকে জর্দানকে এই বলে আশ^স্ত করা যে পাকিস্তানকে সহযোগিতা করতে গিয়ে তাদের যে সামরিক ঘাটতি ঘটবে ইজরায়েল তার সুযোগ নেবে না।

৬. পশ্চিম পাকিস্তানের ভৌগলিক ও রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা রক্ষা করতে পিপলস রিপাবলিক অব চায়না (পিআরসি) যদি তাদের সামরিক সহায়তাও দেয় যুক্তরাষ্ট্র তা ভালোভাবে নেবে। এ কারণে যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন চীন আক্রমণ করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র নির্বাক দর্শকের মতো দাড়িয়ে থাকবে না এই বার্তাটি চীনকে দিতে হবে।

৭. সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে কঠোর কুটনৈতিক বার্তা পাঠিয়ে জানিয়ে দিতে হবে ভারত যদি পশ্চিম পাকিস্তানে পূর্ব পাকিস্তানের মতো হস্তক্ষেপ করে এবং আক্রমণ চালায় যুক্তরাষ্ট্র অলস হয়ে বসে থাকবে না।

৮. পশ্চিম পাকিস্তান যদি ভারতীয় ভারী আক্রমণের স্বীকার হয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ভারতকে কঠোর সিগন্যাল দিয়ে জানিয়ে দিতে হবে যে এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্টে নিশ্চুপ থাকবে না।

৯. পাকিস্তানের ভৌগলিক অখন্ডতা রক্ষায় সম্মিলিত সহযোগিতা আদায়ের লক্ষে সিয়াটো ও সেন্টোর জরুরি বৈঠক ডাকতে হবে। (সিয়াটো : সাউথ ইস্ট এশিয়া ট্রিটি অর্গানাইজেশন; সেন্টো : সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশন)

১০. সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতকে কঠোর কূটনৈতিক বার্তা দিয়ে যুক্তরাষ্টের সামরিক পদক্ষেপ সম্পর্কে সতর্ক করে দিতে হবে।

১১. ইরান তুরস্ক ও থাইল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারক্রাফট বেসগুলোতে বিশ্বাসযোগ্যভাবে আরো শক্তি সঞ্চয় করতে হবে।

১২. যুক্তরাষ্ট্রের সিলক্ল্যান্ট আটলান্টিক কমান্ড প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের উদ্দেশে আশু সামরিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। (সিলক্ল্যান্ট : কমান্ডান ইন চিফ, আটলান্টিক কমান্ড)

লক্ষণীয় এই চেকলিস্টে কেবল পশ্চিম পাকিস্তানের ভৌগলিক অখ-তার কথা বলা হয়েছে, অর্থাৎ মানসিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে বাদ দিয়েই এটি বিবেচনা করা হয়েছে।

ভারত মহাসাগরে সপ্তম নৌবহর: বিব্রত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত
ভারতে নিযুক্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিং ভারত মহাসাগরে রণজাহাজবাহী টাস্ক ফোর্সের উপস্থিতি মেনে নিতে পারছেন না। ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ আমেরিকার সেক্রেটারি অব স্টেটকে জরুরি গোপণীয় টেলিগ্রাম পাঠালেন। দিল্লি থেকে পাঠানো সেই টেলিগ্রাম ভাষান্তরিত হলো :

বিষয়: ভারত মহাসাগরে ক্যারিয়ার টাস্ক ফোর্স মোতায়েন-
১. গত ক’দিন আগে পর্যন্ত (ভারত ও পাকিস্তানের) বৈরীতা বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পক্ষে কথা বলে আসছিলাম। কিন্তু এখন আমি সঙ্কটের মধ্যে আছি। আমার কূটনৈতিক সহকর্মীদের অনেকেই মনে করছেন ভারত মহাসাগরে ক্যারিয়ার টাস্ক ফোর্স মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উস্কানি দিচ্ছে।

২. কানাডিয়ান হাইকমিশনার জর্জ বেশ জোর দিয়েই এর প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন এই টাস্ক ফোর্স মোতায়েনে আমাদের সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের সামরিক উদ্যোগ অব্যহত রাখতে ইয়াহিয়া খানকে উৎসাহিত করেছে।

এ বিষয়ে জর্জ মনে করেন এই টাস্ক ফোর্স মোতায়েনের কারণেই (ঢাকা থেকে) রাও ফরমান আলীর বার্তা এবং পরপর গভর্নর মালিকের বার্তা (দুটোতেই যুদ্ধবিরতি ও আত্মসমর্পনের প্রস্তাব রয়েছে) ইয়াহিয়া খান উপেক্ষা করছেন।

৩. অধিকন্তু জর্জ মনে করেন এই মোতায়েনের কারণে বৃহৎ শক্তিগুলোর সরাসরি সম্পৃক্ত হবার যৌক্তকতা খুঁজে পাবে-এতে সোভিয়েত ও চীন উভয় শক্তিই বিচলিত হবে এবং এটাকে তারা অধিকতর সম্পৃক্ততার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করবে।

৪. জর্জ আমাকে ইঈিত দিয়েছে এ বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী ট্রুডোর কাছে কঠোর বার্তা পাঠাবেন যাতে ট্রুডো (আমাদের) প্রেসিডেন্টকে বিষয়টি জানান।

৫. সরকারের এই সিদ্ধান্ত ও অবস্থানের পক্ষে কথা বলার জন্য সম্পূর্ণ যৌক্তিকতা প্রেরণকে আমি স্বাগত জানাব যাতে আমি এখানকার সহকর্মীদের উত্থাপিত যুক্তির জবাব দিতে পারি।

[ভারত নিযুক্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিং (জন্ম মে ১৯০০ মৃত্যু ৫ মে ১৯৭৫) শুরু থেকেই বাংলাদেশের শরণার্থী সমস্যা তুলে ধরেন, পাকিস্তানকে মার্কিন সামরিক সহায়তার প্রকাশ্য বিরোধিতা করেন, বাংলাদেশ স্বাধীনতা সময়ের ব্যাপার বলে মনে করেন। প্রেসিডেন্ট নিক্সন ভারতে নিযুক্ত আমেরিকান কূটনীতিবিদদের সম্পর্কে কিসিঞ্জারকে বলেন, তারা আমেরিকান স্বার্থের পরিপস্থী কাজ করছেন। তিনি সম্ভাব্য স্বাধীন বাংলাদেশের সাথে আগে থেকেই একটি সুসম্পর্ক সৃষ্টি করতে চেয়েছেন।]

কেনেথ কিটিং (বায়ে) নিউজউইকের প্রচ্ছদে মুক্তিসেনা (ডানে)

মৃত্যু ও হতাশা দুর্গত শরণার্থীদের পেছন ছুটছে
সিডনি শনবার্গ একাত্তরের মার্চে ঢাকায় ছিলেন। ২৭ মার্চ অন্যান্য বিদেশি সাংবাদিকদের সাথে তাকেও ঢাকা থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার হাতে লিখিত হয়েছে একাত্তরের বাংলাদেশ নিয়ে কিছু স্মরণীয় প্রতিবেদন। ৫ জুন ১৯৭১ নিউইয়র্ক টাইমস এ প্রকাশিত তার একটি ছোট ও মানবিক প্রতিবেদন অনূদিত হলো :

করিমপুর, ভারত।
এক ঘন্টা আগে মা কলেরায় মারা গেছে- কিন্তু তার এক বছরের কমবয়সী ছেলে শিশু গণেশ মায়ের বুকের সাথে লেগে থেকে তার স্তন চুষে যাচ্ছিলো যতক্ষণ না দৃশ্যপটে একজন ডাক্তার এসে হাজির হলেন এবং আস্তে করে শিশুটিকে সরিয়ে নিলেন।

শরণার্থী ১৯৭১

পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তের কাছাকাছি এই ভারতীয় শহরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সিমেন্টের মেঝেতে সেই শিশুটির কাছ থেকে কয়েক ফুট মাত্র দূরে সত্তর বছর বয়সী দাদা অবিনাশ মালাকার মৃত পড়ে আছেন। শরীর কুচকে তার ছেলে পাশে বসে আছে; কাঁদছে ক্রমেই শক্ত হয়ে আসা শুকনো দেহের মৃতমানুষটির কাছে বসে। চারদিকে মাছি এসে জড়ো হয়েছে, একজন খালা কিংবা ফুপুর হাতে ঝুলে থেকে বিলাপ করছে বুড়োর ছোট্ট নাতনি। এই পরিবারটি এসেছে পূর্ব পাকিস্তানের যশোর থেকে । ১৩ দিন অবিরাম হেঁটে ভারতে নিরাপদ আশ্রয়ে এসেছে।

পূর্ব পাকিস্তানের ১৩৫০ মাইল সীমান্তের ওপারে সর্বত্র এটাই সাধারণ দৃশ্য। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাত থেকে বাঁচার জন্য লাখ লাখ বাঙ্গালি; বেসরকারি অঙ্কের হিসেবে পঞ্চাশ লাখ পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এখানে চলে এসেছে। তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে গুঁড়িয়ে দিতে ২৫ মার্চ থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী চেষ্টা করে যাচ্ছে।

উদ্বাস্তু বাঙ্গালিরা তাদের সাথে কলেরা নিয়ে এসেছে। সরকারি হিসেবে এখন পর্যন্ত পশ্চিম বঙ্গে কলেরায় মৃতের সংখ্যা ৩৬০০, কিন্তু বাস্তবে সংখ্যাটি আরো বেশি, সম্ভবত ৫০০০ ছাড়িয়ে। বাঙ্গালিরা প্রতিবেশি আর যে তিনটি রাজ্যে আশ্রয় নিয়েছে সেখানে কলেরায় মৃত্যুর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

ক্রমেই এই সংখ্যা বেড়ে চলেছে এবং বাংলাদেশ থেকে শরণার্থীর যে ঢেউ এখনো আসছে তাতে এই সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সে সম্পর্কে কোনো ভবিষৎবাণী করা সম্ভব হচ্ছে না। গতকাল উড়োজাহাজে বহু টন সাহায্য সামগ্রী এসে পৌঁছেছে-ত্রাণ সহায়তা প্রদানে পৃথিবীজুড়ে নাড়া পড়ে গেছে বলে এখন মনে হচ্ছে।

ব্রিটিন ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে টীকা, ঔষধ, মেডিক্যাল সরঞ্জাম এবং তাবু ভর্তি কার্গো উড়োজাহাজ এসে অবতরণ করেছে।

জেনেভাতে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ও জাতিসংঘ কর্মকতারা ত্রাণ হিসেবে ১৭ মিলিয়ন ডলার দিতে সম্মত হয়েছে।

কবর দিতে যতটা সময় লাগে তার চেয়েও দ্রুতগতিতে বাঙ্গালিরা মারা যাচ্ছে। অনেক রাস্তার কলেরায় মৃত মানুষের লাশ পড়ে আছে, এই ঘাতক রোগে আক্রান্ত হবার ভয়ে তাদের কোথাও কবরস্থ করা উদ্যেগ না নিয়ে মৃতদের বন্ধু ও স্বজনরা রাস্তায় ফেলেই নিজেদের আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে।

লাশের উপর আকাশে উড়ছে শকুনের দল। নিচে কুকুর ও কাক। কোনো কোনো শহরে গণকবরে লাশ দাফনের চেষ্টা করা হয়েছে। কলকাতা থেকে সড়কপথে ১২০ মাইল উত্তরের করিমপুরে গত ২৪ ঘন্টায় ৫ জন ত্রাণ কর্মী এ ধরণের কবরে কয়েকশ’ লাশ সমাহিত করেছে। এখানেও শত শত ক্ষুধার্ত নেড়ি কুকুর মাটি খুঁড়ে লাশ বের করে ফেলছে।

করিমপুরের ছোট্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে মাত্র কুড়িটি বেড আর শতাধিক কলেরা রোগী। সীমান্তবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো এভাবেই ভারাক্রান্ত, এটিই সাধারণ ছবি।

মহামারীর শব্দ-কাশি, বমি, গোঙ্গানি ও কান্নার ধ্বনি ছোট দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসছে। এখানে আরো ভিড় করেছে প্রোস্টেট ও অন্যান্য গ্রস্থির অসুখে আক্রান্ত মানুষ।

গণেশ নামের যে শিশুটি তার মৃত মায়ের স্তন্য পান করছিল, তার বাবা সতীশ মাতব্বর ছেঁড়া কাপড়ে আশ্রয়কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে তার দুঃখের বয়ান শোনাচ্ছে: আমার যে কী হয়েছে কোনো ভাষায় তা প্রকাশ করতে পারব না। ৪৫ বছর বয়স্ক এই ধান চাষী বিলাপের স্বরে বলতে থাকে, ‘আমার বউ গেছে, তিনটি সন্তান গেছে। আমার আর কী হতে পারে?’

গণহত্যার দায় পাকিস্তানের-এডওয়ার্ড কেনেডি
‘পাকিস্তানকে সহায়তা বন্ধ করা হোক’- এডওয়ার্ড কেনেডি ১৭ আগস্ট ১৯৭১ দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদটি সংক্ষেপে অনূদিত হলো:

নয়া দিল্লি, ১৬ আগস্ট। পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা চালানোর জন্য সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি পাকিস্তানকেই দায়ী করেন এবং যতদিন না পাকিস্তানের পূর্বঅংশের দ্বন্দ্ব মিটছে পাকিস্তানের জন্য সব ধরণের সামরিক ও বেসামরিক সহায়তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেবার দাবি জান।

পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের ক্যাম্প চার দিন ধরে ঘুরে ঘুরে দেখে দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী শরণ সিংয়ের সাথে বৈঠক করেন এবং তারপর সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানকে মার্কিন সহায়তা বন্ধের দাবি জানান এডওয়ার্ড কেনেডি।

সিনেটর কেনেডি শরণার্থী বিষয়ক সিনেট সাব-কমিটির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন পূর্ব পাকিস্তান প্রশ্নে রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন সাহায্য বন্ধ রাখতে হবে। রাজনৈতিক সমাধানের শুরুটা হতে হবে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির মধ্য দিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে একাত্তরের মার্চের সঙ্কট শুরু হবার আগে পাকিস্তানের সাথে যে সব সামরিক সরবরাহ চুক্তি হয়েছে তা বলবৎ থাকবে তবে এর পর অস্ত্র সহায়তার আর কোন চুক্তি করবে না; অর্থনৈতিক সহায়তা অব্যহত থাকবে।
শরণার্থীর স্রোত  (বায়ে) শরণার্থী শিবিরে কেনেডি (ডানে)

কেনেডি শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের সমালোচনা করেন এবং বলেন শেখ মুজিবের একমাত্র অপরাধ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া। তাঁর বিজয়ের কারণেই পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে।

সিনেটর বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার আন্তর্জাতিক আইনের সকল ধারণার লঙ্ঘনের শামিল। তিনি মনে করেন পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে ক্ষত সৃষ্টি করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে ভারতের চুক্তি প্রসঙ্গে বলেন যেহেতু ভারত জোট নিরপেক্ষতার নীতি থেকে সরে আসেনি, এই চুক্তিতে আমেরিকার অসুবিধে হবার কারণ নেই।

দক্ষিণ ভিয়েতনামের উদ্দেশ্যে প্রেরিত যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের জাহাজ পাকিস্তান অভিমুখে যাত্রার যে অভিযোগ উঠেছিল তা যথার্থ নয় বলে সরকার জানিয়েছে। সিনেটর কেনেডি বলেছেন, এই অভিযোগেরও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

পূর্ব পাকিস্তান পুড়চ্ছে, ইয়াহিয়া ঝিমেচ্ছেন

বি জেড খসরু বি লিখেছেন:
যদিও পাকিস্তানের গলার ফাঁস দৃঢ় হয়ে আসছিল, এমনকি নভেম্বরের মতো এতোটা দেরিতে এসেও ইয়াহিয়া পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন। সাপ্তাহিক বুলেটিনে ১৯ নভেম্বর সিআইএ বলেছে, মুক্তিবাহিনীর শক্তি ক্রমেই বাড়তে থাকা সত্ত্বেও বিদ্রোহীদের অবিলম্বে স্বাধীনতার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সাথে সমঝোতা আলোচনা শুরু করার মতো কোন চাপ ইসলামাবাদ অনুভব করছে কিনা, এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

ইয়াহিয়া বরং বাংলার সমস্যার তার নিজস্ব সমাধান নিয়ে এগোতে চাইছেন। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কিছু সংখ্যক সদস্যের খালি হয়ে যাওয়া আসনে তিনি ডিসেম্বরে নির্বাচন দিতে চান। তিনি সাতটি দলের একটি কোয়ালিশন দাঁড় করাতে পেরেছেন যারা জাতীয় সংসদে প্রাধান্য বিস্তার করতে পারবে। পাকিস্তানপন্থী বাঙালি নুরুল আমিন এই গোষ্ঠির নেতৃত্বে থাকবেন। বলতে গেলে এ ধরনের সরকারের পূূর্ব পাকিস্তানে কোনো সমর্থনই থাকবে না। কিন্তু আমেরিকান সরকার এই উপসংহারে পৌঁছেছে যে এছাড়া জেনারেল ইয়াহিয়ার আর কোনো পথ খোলা নেই।

সিআইএ বলেছে, ‘তার নিজের প্রতিষ্ঠিত পথ থেকে বেশি রকম দূরে সরে গেলে নিজের পদ রক্ষা করতেই ইয়াহিয়া সমস্যায় পড়ে যাবেন।’

ততদিনে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এটা বুঝতে সমর্থ হয়েছে এমনকি নেতারা যদি ইয়াহিয়ার সাথে কোনো চুক্তি করেও ফেলে বাঙ্গালিরা স্বাধীনতার চেয়ে কম কোনো কিছুতেই রাজি হবে না। ‘এমনকি ইয়াহিয়া যদি কারারুদ্ধ বাঙ্গালি নেতার সাথে কোনো সমঝোতা করতে সমর্থ হন, আর তা যদি অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার কম কিছু হয়, তারা মুজিবুর রহমানকেই অস্বীকার করবে।’

দু’সপ্তাহ আগে ইয়াহিয়ার উপর একটি প্রতিবেদনে উইলিয়াম উপস্থাপন করেছেন যে, এই সামরিক স্ট্রংম্যান (ইয়াহিয়া) ক্রমেই ক্রমবর্ধমানহারে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনা প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে বিচ্ছিনতরœ হয়ে পড়ছেন বর্তমান পরিস্থিতির কাছে তা তামাশা ছাড়া কিছু নয়। ২৭ অক্টোবর উইলিয়াম পাকিস্তানের কেবিনেট সেক্রেটারি গোলাম ইসহাক খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। খান বিশ^াস করেন পূর্ব পাকিস্তান থেকে যে সামরিক রিপোর্ট পাঠানো হচ্ছে তা প্রেসিডেন্টকে বেপথু করছে বাস্তবে যা ঘটছে রিপোর্টে তার প্রতিফলন ঘটছে না।

জেনারেল ইয়াহিয়ার অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এম এম আহমেদ ইয়াহিয়ার ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এবং সামরিক বাহিনী বেপথু প্রতিবেদন সম্পর্কে আগেই বলেছেন। তিনি বললেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় সার্বভৌম ক্ষমতা পেয়ে গেছে, বিভিন্ন বিষয়ে ইয়াহিয়ার নীতি ও নির্দেশের বাইরে তারা কাজ করে যাচ্ছে।

বিভিন্ন ঘটনা থেকে ইয়াহিয়ার এই বিচ্ছিন্ন হওয়া স্পষ্ট হয়ে উঠেছে; আহমেদ বললেন: প্রথমত পূর্ব পাকিস্তানে সেনা কমান্ডাররা ইচ্ছেমত স্বাধীনভাবে সামরিক অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বেসামরিক পুতুল গভর্নর এম মালিক ও তার মন্ত্রিপরিষদের চেহারা দেখিয়ে আসলে সামরিক বাহিনীই শাসন করে যাচ্ছে- তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য তারা সম্পূর্ণভাবে সেনাবাহিনীর উপর নির্ভরশীল। তৃতীয়ত পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনা সমূহ পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করার কোন স্বতন্ত্র বন্দোবস্ত ইয়াহিয়ার নেই।

পূর্ব পাকিস্তানে কি ঘটছে এ নিয়ে অবশ্য ইয়াহিয়ার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ধারণা ছিল। ২৮ অক্টোবর জেনারেল ইয়াহিয়া আমেরিকানদের বলেন পূর্ব পাকিস্তানে মন্ত্রিসভার বেসামরিকীকরণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করে এনেছে। নির্বাচন যখন আওয়ামী লীগের শূণ্য ঘোষিত আসনগুলো পূর্ণ করল পূর্ব পাকিস্তানে অনুগত প্রাদেশিক সরকারের রাজনৈতিক স্থান সংকুলানের কাজটি সম্পন্ন হলো। ইয়াহিয়া বিশ^াস করতেন নির্বাচনোত্তর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কাছে বিদ্রোহীদের প্রতি ভারতের সমর্থন মার খেয়ে যাবে। তখন নিজের লক্ষ্য অর্জনের জন্য যুদ্ধে যাওয়া ছাড়া ইন্দিরা গান্ধীর হাতে আর কিছু থাকবে না।
১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ বোমাবর্ষনের পর বঙ্গভবনের দরবার হল

পূর্ব পাকিস্তানে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মিথটি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে গিলিয়েছেন পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক গভর্নর এবং সেনা কমান্ডাররা। তারা প্রকৃত অবস্থার সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অযথার্থ একটি ইয়াহিয়ার কাছে তুলে ধরেছেন।

বাস্তবতা হচ্ছে বেসামরিক সরকারের আচ্ছাদনে সামরিক নীতিমালা এবং অপারেশন বাঙ্গালীদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।

কেবল ভারতই বিদ্রোহের বীজ বপন করেছে তা নয় ইয়াহিয়ার কাছে ক্রমবর্ধমান স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমোবনতির মধ্যকার যে শূণতা তা অনেক বড়। ২১-২৬ অক্টোবর আমার পূর্ব পাকিস্তান সফরের সময় পর্যবেক্ষণ এবং ইতিপূর্বের ১৯-২৫ আগস্টের পর্যবেক্ষণের তুলনা করলে আমি তা-ই পাই।

যদিও ইয়াহিয়া পুতুল সরকার বসিয়েছেন আসলে প্রদেশ শাসন করেছে তার সেনাবাহিনী।

ডিসেম্বর ১৯৭১ বিজয় সংবাদ
[ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনটি ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ প্রকাশিত হয়। এটি তৈরি করেন প্রতিবেদক লি লেসেইজ। তার মূল কর্মক্ষেত্রে হংকং হলেও ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তিনি দিল্লিতে ছিলেন এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফেরি বোটে রণাঙ্গণে চলে আসেন। তিনি ওয়াশিংটন পোস্টের বিদেশ বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। শেষে এই পত্রিকার সহকারি ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের উইকএন্ড এডিটর ছিলেন। ২৭ জুলাই ১৯৯৬ ৫৭ বছর বয়সে ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন। ১৬ ডিসেম্বর অপরাহ্নে ঢাকা রেসকোর্সে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭-এ সৃষ্ট পাকিস্তান সমাহিত হয়। লি লেসেইজের প্রতিবেদনটির একাংশ অনূদিত হলো।]

পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ শেষ:
ফুল ও করতালির মধ্যে ভারতীয় বাহিনীর ঢাকা প্রবেশ
আত্মসমর্পন দলিলে সই করতে নিয়াজিকে কলম এগিয়ে দিচ্ছেন অরোরা

ঢাকা ১৬ ডিসেম্বর।
হাজার হাজার বাঙ্গালির ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ও আনন্দধ্বনির মধ্য দিয়ে ভারতীয় সৈন্যদল আজ ঢাকা শহরে প্রবেশ করল।
মেজর জেনারেল গান্ধর্ব নাগরার কমান্ডের অধীন ভারতীয় সৈন্য এবং পূর্ব পাকিস্তানি গেরিলাদের একটি দল খুব ভোরে শহরের বাইরের দিকটাতে একটি ব্রিজ উড়িয়ে দেবার পর জানতে পারে ভারতের কাছে আত্মসর্ম্পন করার চূড়ান্ত ঘোষণা পাকিস্তানি কমান্ড মেনে নিয়েছে।

নাগরা বলেন, স্থানীয় সময় সকাল ৮-৩০ (ইস্টার্ন স্ট্যান্ডার্ড টাইম বুধবার রাত দশটা) টায় তিনি পাকিস্তানি সামরিক সদর দফতরে একটি বার্তা পাঠান এবং তাৎক্ষণিকভাবে জবাব পেয়ে যান যে পাকিস্তান তাদের আর প্রতিরোধ করবে না। তারপর দলবলসহ তিনি শহরে প্রবেশ করলেন।

তিনি এখানে সকাল দশটার দিকে পাকিস্তানি কমান্ডার লেফেটন্যান্ট জেনারেল একে নিয়াজির সাথে দেখা করলেন। নাগরা বললেন, ‘আমরা পুরোনো বন্ধু, সেই কলেজের দিনগুলো থেকে।’
প্রথম ভারতীয় ট্রুপস ঢাকায় প্রবেশ করছে

ভারতীয় জেনারেল তারপর ঢাকা এয়ারপোর্টে গেলেন, ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকবের পৌঁছানোর প্রতীক্ষায় রইলেন, তিনি কলকাতা থেকে হেলিকপ্টারে আসছেন।

এয়ারপোর্টে জেনারেলের সাথে কেবল তিনজন ভারতীয় সৈনিক। তিনি অমসৃণ কাঠের স্টিক হাতে নিয়ে যখন ঘোরাচ্ছেন পাকিস্তানি এয়ারপোর্ট ডিফেন্স ইউনিট রানওয়ের শেষপ্রান্তে একত্রিত হয়েছে, এখান থেকে তারা তাদের আত্মসর্ম্পনস্থলে চলে যাবে।

বেশ কয়েক ঘন্টা ধরে রাস্তায় পাকিস্তানি সৈন্যের সংখ্যা ভারতীয় অনেক বেশি, মাঝে মধ্যে বিক্ষিপ্ত গোলাগুলি হচ্ছে। অনেক ভারতীয় ও পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়েছে, হোটেল ইন্টারকন্টিনেটালের সামনে ভারতীয় একজনের মৃত্যু হয়েছে।

মুক্তি বাহিনী-পূর্বপাকিস্তান লিবারেশন আর্মির সদস্যরা জনতার সাথে মিলে গেছে। আনন্দিত জনতার সাথে মিশে তারা আকাশের দিকে গুলি ছুঁড়ছে।

নাগরা ৯৫ মাউন্টেন ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার এইচ এস কের¬কে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে পাঠালেন। এটি রেডক্রসের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ জোন ঘোষিত হয়েছে। এখানে অবস্থানকারী বিদেশি এবং এখানে আশ্রয় নেওয়া পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক বেসামরিক সরকারের সদস্যদের রক্ষা করার জন্য ক্লের এখানে আগমন।

বাঙ্গালি জনতা বারবার ক্লের কার রাস্তায় ঘিরে ধরে। এক পর্যায়ে নতা ড্রাইভারকে গাড়ি থেকে বের করে নিয়ে আসতে চেষ্ঠা করে। ব্রিগেডিয়ার ক্লের নিজেই বেরিয়ে আসেন, বাঙ্গালিরা তার উপর আছড়ে পড়ে, একজন তার হাতে গুঁজে দেয় এক গোছা গাঁদা ফুল। বাঙ্গালিরা চিৎকার করে বলতে থাকে, অনেক ধন্যবাদ, অনেক ধন্যবাদ। ২ ব্রিগেডের কিছু বেশি সৈন্য নিয়ে ৪ ডিসেম্বর সকালে নাগরা ও ক্লের পাকিস্তানি সীমান্ত অতিক্রম করেন, উত্তর দিক থেকে লড়াই করতে করতে ঢাকায় এসে উপস্থিত হন।
তারা ১৬০ মাইল পেরিয়ে এসেছেন আংশিক গরুর গাড়িতে এবং আংশিক পায়ে হেঁটে যুদ্ধ করে, সবগুলো শহরেই।

একজন বিদেশি রিপোর্টার এয়ারপোর্টে নাগরাকে বললেন, ‘আমরা আপনাদের উপর ভরসা করেছিলাম, ক্রিসমাসের আগে বাড়ি ফিরে যাব।’

জেনারেল বললেন, আমরা সে ব্যবস্থাই করেছি।

ঢাকার পথে ভারতীয় টি ৫৫ ট্যাঙ্ক

তিনি বললেন, আমরা যে পথে ঢাকায় প্রবেশ করেছি সে পথে পাকিস্তানি সৈন্যদের মৃতদেহ পড়ে আছে। ‘এটা মর্মান্তিক, হাতে সময় না থাকায় আমরা তাদের কবর দিতে পারিনি।’
নাগরা বললেন, ‘সারাপথ আমাদের জন্য করতালি ও আনন্দ ধ্বনি দেওয়া হয়েছে।’ জেনারেল নাগরার একজন সহকারি বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে তার কাছে এলেন।

জনতার কাছে উপেক্ষিত পাকিস্তানের পরাজিত সৈন্য ও পুলিশ সারিবদ্ধভাবে নিজেদের অস্ত্র বহণ করে আত্মসমর্পন ক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে চলেছে। সেখানে তাদের নিরস্ত্র করা হবে।...

চারদিকে আনন্দের গুলিবর্ষণ ও উল্লাসের চিৎকারের মধ্য দিয়ে বিকেল ৫টায় রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্úনের ঘটনা ঘটে।

বাসভর্তি ভারতীয় সৈন্যদের গাড়ি থামিয়ে উল্লসিত বাঙ্গালিরা ধন্যবাদ দিচ্ছেন। ২৫ মার্চের পর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে নির্মম কর্মকা- চালিয়েছে তখন থেকে লুকিয়ে রাখা বাংলাদেশের পতাকাটি বের করে তারা আবার উড়িয়ে দিচ্ছেন।
ইনস্ট্রুমেন্ট অব সারেন্ডার, একদিকে জগজিৎ সিং অরোরার সই, অন্যদিকে আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজির

সারাবাংলা/এমএম

Advertisement
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন