শনিবার ২০ এপ্রিল, ২০১৯ ইং , ৭ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৩ শাবান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ১৬

ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮ | ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ

।। ফারুক ওয়াহিদ।।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর, দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। মুক্তির অপেক্ষায় পৌষের কনকনে শীতে ১৫ ডিসেম্বর রাতেও চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে অবরুদ্ধ ঢাকাবাসী তথা সাড়ে ৭ কোটি বাঙালি এক মুহূর্তের জন্য চোখের পাতা এক করতে পারেনি- কী হবে ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টায়! পৌষের সোনালি রোদ মাখা সেই দিন কি বাংলায় আবার ফিরে আসবে! বাঙালির স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন কি আজ পূর্ণতা পাবে- কখন আসবে চূড়ান্ত সোনালি বিজয়ের সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি! নাকি অন্য কিছু ঘটবে! মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী হানাদার পাকিস্তানিদের ওপর চূড়ান্ত আঘাত হেনে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য শুধু একটি নির্দেশের অপেক্ষায় চারিদিক দিয়ে ঢাকাকে ঘেরাও করে রেখেছে- হানাদার পাকিস্তানিদের পালাবার কোন পথ নেই- সারেন্ডার করো না হয় চূড়ান্ত আঘাত প্রতিহত করার জন্য তৈরি হও। তবে সারেন্ডারের চেয়ে মুক্তিবাহিনী চাচ্ছে শেষ যুদ্ধ করে হানাদার পাকিস্তানিদের একটা চরম আঘাত দিয়ে প্রতিশোধ নেওয়া।

আরও পড়ুন: ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ১৫

১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টা শেষ সময় অর্থাৎ হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী যদি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ও পূর্ণ অস্ত্র সংবরণ না করে তবে তার পরে আর কোনো সময় দেওয়া হবে না, এটাই যৌথবাহিনী প্রধান জেনারেল মানেকশ’র চূড়ান্ত আদেশ। এরই মাঝে ১৬ ডিসেম্বর ভোররাতে হঠাৎ জেনারেল নিয়াজির অনুরোধ বার্তা এলো- অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য- ঢাকাবাসীর তখন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে উৎকণ্ঠা আরো বাড়িয়ে দিলো- এটা কি নিয়াজীর কালক্ষেপণ? তিনি কি এখানো কি আশায় আছেন মার্কিন ৭ম নৌবহরের সাহায্যের আশায়? এরপর হয়তো টালবাহানা করে আবারো সময় বাড়াতে চাইবেন। ১২ ডিসেম্বর রওনা দেওয়া ভিয়েতনাম ফিলিপাইন উপকূলে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর ১৫ ডিসেম্বরের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী বঙ্গোপসাগর থেকে মাত্র ২৪ ঘণ্টার দূরত্বে গভীর সমুদ্রে এসে অবস্থান করছিল। অবশেষে জেনারেল নিয়াজির বিশেষ অনুরোধে যৌথকমান্ড প্রধান জেনারেল মানেকশ’র নির্দেশে যুদ্ধবিরতির সময়সীমা ১৬ ডিসেম্বর বিকেল ৩টা পর্যন্ত বাড়ানো হলো। মুক্তিবাহিনী আর সময় বাড়ানোর পক্ষে নয়- নিয়াজীকে তারা ভালোভাবেই চেনেন- তাই তারা সবাই চাচ্ছেন হানাদার বর্বর পাকিস্তানিদের পূর্ণোদ্যমে চূড়ান্ত আঘাতই হানা হোক।

আরও পড়ুন-‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ১৪

১৬ ডিসেম্বর পৌষের হাড়কাঁপানে শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে মিত্রবাহিনীর মেজর জেনারেল নাগরা মীরপুর ব্রিজের ওপর অবস্থান নিয়েছেন। জেনারেল নাগরার সঙ্গে কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান কাদের সিদ্দিকী রয়েছেন। জেনারেল নাগরা জেনারেল নিয়াজীর উদ্দেশ্যে একটি চিরকুট লিখলেন- “প্রিয় আবদুল্লাহ, আমি এখন মীরপুর ব্রিজে। ঘটনার শেষপ্রান্তে আমরা এসে গেছি। পরামর্শ হচ্ছে আপনি আত্মসমর্পণ করুন। সে ক্ষেত্রে আমরা আপনাদের দেখাশোনার দায়িত্ব নেব। শীঘ্রই আপনার প্রতিনিধি পাঠান।-নাগরা।” সকাল ৯টায় জেনারেল নাগরা এই চিরকুটটি তার এডিসির হাতে দিয়ে তাকেই নির্দেশ দিলেন একটি জিপে বিশালকায় একটি সাদা ফ্লাগ লাগিয়ে লে. জেনারেল নিয়াজীর কাছে যাওয়ার জন্য। সাদা ফ্লাগ লাগিয়ে জিপটি ইস্টার্ন কমান্ড হেড কোয়ার্টারে এসে পৌঁছলো। জেনারেল নাগরার চিরকুটটি পড়ে ইস্টার্ন কমান্ড হেড কোয়ার্টারে উপস্থিত শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে পরামর্শ করে নিয়াজি অবশেষে মেজর জেনারেল নাগরার চিরকুট অনুযায়ী আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন। মেজর জেনারেল নাগরা, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ব্রিগেডিয়ার ক্লার সাদা ফ্ল্যাগওয়ালা জিপে মীরপুর ব্রিজের পশ্চিম দিকে এসে উপস্থিত হলেন। পাকিস্তান ৩৬ ইনফ্যানট্রি ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জমসেদ খান তাদের ঢাকা নগরীতে অভ্যর্থনা জানিয়ে নিজের স্টাফ গাড়িতে বসার অনুরোধ জানালেন এবং ইস্টার্ন কমান্ড হেড কোয়ার্টারে সসম্মানে নিয়ে আসেন।

আরও পড়ুন- ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ১৩

এদিকে দুপুর ১২টার দিকে মিত্রবাহিনীর মেজর জেনারেল জ্যাকব ভারতীয় সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের কর্নেল খেরা-কে সঙ্গে নিয়ে একটি বিশেষ আর্মি হেলিকপ্টারে তেজগাঁ বিমান বন্দরে অবতরণ করেন। জেনারেল জ্যাকব ও কর্নেল খেরা-কে অভ্যর্থনা জানান পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার বারেক। জেনারেল জ্যাকবের হাতে ছিল ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের দলিল। জেনারেল নিয়াজী এই দলিলকে যুদ্ধবিরতির দলিল বলে উল্লেখ করলেন। জেনারেল জ্যাকব আত্মসমর্পণের দলিলটি সবার সামনে ব্রিগেডিয়ার বারেকের হাতে দিলেন। বারেক এগিয়ে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর টেবিলে দলিলটা খুলে ধরলেন। এক নজর চোখ বুলিয়ে রাও ফরমান আলী আপত্তির সুরে বললেন, “‘ভারত-বাংলাদেশ জয়েন্ট কমান্ডারের কাছে’ এই কথাটাতে থাকতে পারে না। আমরা তো ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে চুক্তি করবো।” জেনারেল জ্যাকব তাৎক্ষণিক জবাব দিলেন, “দিল্লী থেকে এভাবেই এই দলিল তৈরি হয়ে এসেছে। এর কোনো পরিবর্তন বা সংশোধন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।” কোনো উপায় না দেখে এই কথা শোনার পর লে. জেনারেল আমীর আবদুল্লা খান নিয়াজী আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করতে সম্মত হলেন। [সূত্র: ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ –মেজর সিদ্দিক মালিক]

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন: ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ১২

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪টা ১৯মিনিট ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের যৌথ বাহিনীর প্রধান লে. জে. জগজিৎ সি অরোরার কাছে জেনারেল নিয়াজী তার কোমরের বেল্ট থেকে সুদৃশ্য রিভলবারটি এবং ইউনিফরমের কাঁধ থেকে লে. জে. ব্যাজ দুটো জগজিৎ সিং অরোরা-র হাতে তুলে দিলেন। সেদিন বিকেলেই বাংলাদেশ সময় বিকেলবেলা ৪টা ৩১ মিনিটে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার পরাজিত পাকিস্তানি সৈন্য নিয়ে মিত্র বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় যৌথ কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন। বাংলাদেশ-ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় যৌথ কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ভারতীয় ফিল্ড মার্শাল শ্যাম মানেকশ’র পক্ষে স্বাক্ষর করেন। এ সময় মুজিবনগর সরকারের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে. খন্দকার। ঠিক সেই মুহূর্তে ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মাও কেঁপে উঠেছিল এবং মনে হচ্ছিল তাদের আত্মাও যেন বলে উঠছে ‘জয়বাংলা’। সেই মুহূর্তটি বাঙালি জাতির হাজার বছরের সবচেয়ে গৌরবের মহূর্ত। এই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের পর পর রাজধানীজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের জয়ধ্বনি ‘জয়বাংলা’র জয়জয়কার। দস্তখতের জন্য অরোরা গাঢ় কালো কালির একটি শেফার কলম এনেছিলেন। কিন্তু নিয়াজি সই করার সময় কালি বেরোল না। কলমটিতে ঝাঁকি দিয়ে কালি ঠিক করা হলো। তারপর স্বাক্ষর। স্বাক্ষর করার সময় প্রথমে পুরো নামটি নিয়াজি লিখলেন না। তিনি স্বাক্ষর করলেন, ‘এ এ কে নিয়া’। সেটি নজরে পড়ল ভারতীয় নৌবাহিনীর কর্মকর্তা এন কৃষ্ণনের। এবার নামটি পুরো করে লিখলেন নিয়াজি। অরোরা একবার উল্লেখ করেছিলেন তিনি নিয়াজীকে এর আগেও মিলিটারি একাডেমির পরীক্ষায় একবার সাহায্য করেছিলেন আর এবার কলম দিয়ে।

বাংলাদেশ-ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় যৌথ কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা একবার নিয়াজীর ১৬ ডিসেম্বর সারেন্ডার সম্পর্কে বলেছিলেন- “নিয়াজীকে ভাবার জন্য তিরিশ মিনিট সময় দিলাম। যখন ফিরে এলাম, নিয়াজী তখনও নিশ্চুপ। আমি তার সামনে গিয়ে বললাম, আপনি কি এই চুক্তি মানতে রাজি আছেন? পর পর তিনবার জিজ্ঞেস করার পরও কোনও উত্তর দিলেন না তিনি। তখন আমি দলিলটা হাতে নিয়ে বললাম, ধরে নিচ্ছি আপনি আমার দাবি মেনে নিয়েছেন। এরপর দেখি তার চোখে জল। আমি সেদিকে করুণাভরে তাকিয়ে ভাবলাম, এই লোকটা বাংলাদেশের মানুষকে অনেক কষ্ট দিয়েছে। আপনারা জানেন, তার সেনাবাহিনী কি করেছে, তাই নতুন করে তা বলার প্রয়োজন নেই। এজন্য আমি তাকে ঢাকাবাসীর সামনে আত্মসমর্পণ করানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। নিয়াজী আবারও বললেন, তিনি তার সদর দফতরে আত্মসমর্পণ করবেন। আমি বললাম, না আপনাকে রেসকোর্সের ময়দানে ঢাকাবাসীর সামনে আত্মসমর্পণ করতে হবে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি নিয়মিত বাহিনীর প্রকাশ্য আত্মসমর্পণই শুধু নয়, আমি তাদের গার্ড অব অর্নার দিতেও বাধ্য করলাম। এই মানুষটিই বলেছিলেন যে, ঢাকা দখল করতে হলে তার লাশের ওপর দিয়ে করতে হবে। এজন্যই তাকে আমি ঢাকাবাসীর সামনে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছিলাম।”

আরও পড়ুন: ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ১১

বাংলাদেশ-ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় যৌথ কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা তথা মিত্রবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারের ওয়ার করেসপন্ডেন্ট জনাব মুসা সাদিক-এর একটি লেখার কিছু অংশ উদ্ধৃতি করছি- “পাক হানাদার কবলে বন্দী বঙ্গ জননীর আঁখিজল মুছিয়েদিতে ’৭১-এ যে বীর অরোরা এসেছিলেন এই বঙ্গে, তিনিতো কিছুই চাননি। আজ তিনি তো নেই! বিশ্ব চরাচরে কোথাও তিনি নেই! আজ তাই ’৭১-এর বীর প্রসবিনী বঙ্গ জননী জলটলমল চেয়ে আছে সেই পথপানে- স্বাধীনতার পতাকা হাতে যে পথ বেয়ে সেই বীর এসেছিলেন বঙ্গে, যে পথ ধরে সে বীর গিয়েছিলেন চলে। ’৭১-এ নির্য্যাতিতা- ভুলুণ্ঠিতা তোমার জননী-ভগিনিকে মাথার পাগড়ি খুলে পরিয়ে দিয়েছিলেন যে পরদেশী বীর, তার বীরত্ব দিয়ে, বিক্রম দিয়ে সেবা করেছিলেন তোমার বঙ্গ জননীর। বিধাতা প্রেরিত বঙ্গ জননীর বীর সন্তান তিনি। তার গরবে গরবিনী বঙ্গ জননী, গর্বিত বাংলাদেশ। বীর প্রসবিনী বঙ্গ জননীর কোল আলো করে ফিরে ফিরে এসো ’৭১-এর মহান বীরেরা। তোমাদের বীরত্বে-বিক্রমে জেগে জেগে উঠুক বাংলাদেশ। জয় হোক বঙ্গ জননীর। জয় হোক বাংলার। জয়তু বাংলাদেশ।”

আরও পড়ুন: ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ১০

২৩ বছর এবং দীর্ঘ ৯ মাসের দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটিয়ে বাঙালি জাতির জীবনে এলো রাঙা প্রভাত- এলো হাজার বছরের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিল একটি স্বাধীন-সার্বভৌম প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। বাঙালি পেয়ে যায় একটি মানচিত্র, একটি লাল-সবুজ পতাকা। “বিজয় নিশান উড়ছে ঐ” হ্যাঁ এই গানটিই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বেজে উঠে। “বিজয় নিশান উড়ছে ঐ” গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শেষ গান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গান। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর পেয়ে শহীদুল হক খান গানটি তাৎক্ষণিকভাবে লেখেন আর সুজেয় শ্যাম সুর করেন। সমবেত কণ্ঠে বেজে উঠা গানটির লিড দেন অজিত রায়। এই ঐতিহাসিক গানটির বিশ্ব রেকর্ড হলো এক অন্তরা লেখার সাথে সাথে সুর দেওয়া হচ্ছে- অন্যদিকে আরেক অন্তরা লেখা হচ্ছে এবং সেই মুহূর্তেই রেকর্ড করা হয় এবং সাথে সাথে রাতেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বেজে উঠে- পৃথিবীতে গানের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটেনি। সমবেত কণ্ঠে কণ্ঠ দেন- রথীন্দ্রনাথ রায়, প্রবাল চৌধুরী, তিমির নন্দী, রফিকুল আলম, মান্না হক, মৃণাল কান্তি দাস, অনুপ ভট্টাচার্য, তপন মাহমুদ, কল্যাণী ঘোষ, উমা খান, রূপা ফরহাদ, মালা খুররমসহ আরও অনেকে। দেড় ঘণ্টার মধ্যে সুর, মহড়া সব শেষ। এরপর রেকর্ড করা হয় এবং রেকর্ড করা শেষ হওয়ার পরই এই কালজয়ী গানটি প্রচার করা হয়। সেদিন এই গানে তবলায় অরুণ গোস্বামী, দোতারায় অবিনাশ শীল, বেহালায় সুবল দত্ত, গিটারে ছিলেন রুমু খান।

পুরো গানটা এরকম: “বিজয় নিশান উড়ছে ঐ/ খুশির হাওয়ায় ঐ উড়ছে/ উড়ছে… উড়ছে… উড়ছে…/ বাংলার ঘরে ঘরে,/ মুক্তির আলোয় ঝরছে…/ মুক্তির আলোয় ঝরছে…/ মুক্তির আলোয় ঝরছে।/ আজ জীবনের জয়োল্লাসে/ জমছে শিশির দুর্বাঘাসে/ জয়োল্লাসে, জয়োল্লাসে/ পাশে নেই আমাদের মহান নেতা/ হাসির মাঝে আজ জাগে ব্যাথা/ সাত কোটি প্রাণ দিকে দিকে ওই/ দ্বীপ্ত মশাল জ্বেলে চলছে, দ্বীপ্ত মশাল জ্বেলে চলছে/ বাংলার ঘরে ঘরে, বাংলার ঘরে ঘরে/ মুক্তির আলোয় ঝরছে…/ মুক্তির আলোয় ঝরছে…/ মুক্তির আলোয় ঝরছে।/ অন্ধকারার আঁধার থেকে/ ছিনিয়ে আনবো বঙ্গবন্ধুকে/ বঙ্গবন্ধুকে, বঙ্গবন্ধুকে/ উচ্ছ্বল বন্যার কলগ্রাসে/ শত্রুরা নিশ্চল হয়েছে/ কোটি কোটি প্রাণ দিকে দিকে ওই/ বন্ধ কারার দ্বার খুলছে, বন্ধ কারার দ্বার খুলছে/ বাংলার ঘরে ঘরে/ মুক্তির আলোয় ঝরছে,/ মুক্তির আলোয় ঝরছে,/ মুক্তির আলোয় ঝরছে।”

আরও পড়ুন: ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ ডিসেম্বর ৯

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের পাকিস্তান আর্মি তখনও সারেন্ডার করেনি চলছে তুমুল যুদ্ধ- তাই একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের ঢাকায় পাকিস্তান আর্মির সারেন্ডারের খবর রেডিওতে রণাঙ্গনের বাঙ্কারে বসে শুনি এবং জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে ঘেরাও করে রাখা পাকিস্তানি আর্মির ক্যাম্পের দিকে অনবরত ফায়ার করতে থাকি- কিন্তু সেদিন প্রতুওরে ফিরতি ফায়ার কম এসেছে। ১৬ ডিসেম্বর রাতে রণাঙ্গনে বাঙ্কারে বসেই রেডিওতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে “বিজয় নিশান উড়ছে ঐ খুশির হাওয়ায় ঐ উড়ছে বাংলার ঘরে ঘরে” গানটি প্রথম শুনি এবং গানটি শুনে আনন্দে কেঁদেছিলাম কিন্তু সে কান্না ছিল অন্যরকম কান্না- সেটা ছিল আনন্দাশ্রু। কিন্তু গানটিতে একজায়গায় যখন বেজে উঠে- “পাশে নেই আমাদের মহান নেতা/ হাসির মাঝে আজ জাগে ব্যাথা … অন্ধকারার আঁধার থেকে/ ছিনিয়ে আনবো বঙ্গবন্ধুকে/ বঙ্গবন্ধুকে, বঙ্গবন্ধুকে” তখনই সত্যিকারের কান্না চলে আসে চোখ আর পানি ধরে রাখা যায়নি- সেটা ছিল সত্যিকারের কান্নার চোখের জল। ১৬ ডিসেম্বর রাতেই বাঙ্কারে বসে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত ব্যঙ্গ রসাত্মক কথিকা এম. আর. আখতার মুকুল-এর শেষ ‘চরমপত্র’ শুনেছিলাম। [চলবে]

লেখক: ফারুক ওয়াহিদ, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা; ২ নং সেক্টর বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন