বুধবার ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ৩ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

খোঁচামারা গান আলকাপ

জানুয়ারি ২, ২০১৯ | ১২:২৯ অপরাহ্ণ

শেখ সাদী ।।

বিজ্ঞাপন

আজ গানের মোকামে আলকাপ কথা তুললাম।

একজনের প্রশ্নের পিঠে উত্তর দিয়ে খোঁচা মেরে প্রশ্ন করতে-করতে এগিয়ে যায় একটি ঠাট্টার গল্প। এটিই আলকাপ। বাংলার লোকগানের ইতিহাসে আলকাপ বিশেষ মর্যাদার স্থানে বসে আছে।

নাম নিয়ে নানা মত চালু।

কেউ বলেন কাপট্য বা ছলনা, ছদ্মবেশ এবং কপটতা থেকে ‘কাপ’ শব্দের জন্ম। অন্যদলের মত হলো আলকাপের ‘আল’ অর্থাৎ  মশকরা বা ঠাট্টা। এ-ও শোনা যায় ‘আল’ মানে আধুনিক। আর ‘কাপ’ মানে ঠাট্টা। এই দু’য়ে মিলে ‘আধুনিক ঠাট্টা’।
গম্ভিরার বোলবাই অংশের জরায়ুতে জন্ম আলকাপের।
এই আলকাপ বড় হয়। হেঁটে বেড়ায় গঙ্গা, পদ্মা, মহানন্দা, ভগীরথী ঘেঁষা অঞ্চলে।
এসব এলাকায় লোকগানের সুর নিয়েছে আলকাপ। বিশেষ করে নিয়েছে হোলী, বোলবাই, গীতগোবিন্দ এবং চন্ডীমঙ্গল থেকে কথা-সুর নিয়ে শরীরটা বড় করেছে আলকাপ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পশ্চিমবঙ্গের মালদহ এলাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয় আলকাপ গানের প্রবর্তকের নাম বনমালী প্রমাণিক। জন্ম ১২৭১ বঙ্গাব্দে। পেশায় নাপিত। এক চোখ অন্ধ বলে ‘বোনাকানা’ নামে তিনি বেশি পরিচিত।

বিজ্ঞাপন

বাড়ি মালদহ জেলার মনকষা গ্রামে। বনমালীর গানের জীবন শুরু হয় চন্ডীমঙ্গল, মনসা মঙ্গল, বোলবাই দলের শিল্পী হিসেবে।
কিশোর বয়স তখন। ঝুমুর দলের সাথে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান বনমালী। কয়েকবছর পর ফিরে আসেন মালদহ। গড়লেন নতুন দল। নাম রাখলেন আলকাপ।
অল্পদিনের মধ্যে সারা বাংলায় প্রিয় হয়ে ওঠে। একসময় রাজশাহী, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, পাবনা, কুষ্টিয়া ও পাশের দেশ ভরতের মালদহ ও মুর্শীদাবাদ এলাকায় আলকাপের রমরমা ছিল।
দলে থাকে দশ থেকে পনের জন। সাথে দুই বা চারজন বালক। এরা ‘ছোকরা’ বা ‘ছুকরি’ নামে পরিচিত। দলপ্রধানকে বলা হয় খলিফা।
এই খলিফার ওপর নির্ভর করে দলের সুনাম। থাকে একজন রসিক। তিনি রংদার নামেও পরিচিত। বাদক দরকার হয় কয়েকজন।
আকাশের নিচে বাদ্যযন্ত্র এক জায়গায় রেখে শিল্পীরা গোল হয়ে বসেন।
বৃত্তের চারপাশে আরেকটি বড় বৃত্ত হতো দর্শকদের। গান চলে সারা রাত। বড় বাড়ির উঠোনে বা খোলা মাঠে মাটির ওপর চট, মাদুর বা শতরঞ্জি পেতে হয় আলকাপ গান।
চলে এক রাত থেকে সাত রাত পর্যন্ত।
বেশিদিন আগের কথা নয়, উত্তরের সব জেলাতে আলকাপ গানের চল ছিল, এখন নেই।

গানে প্রথমে করা হয় বন্দনা, ‘ওমা ভবেশ্বরী তৃমি মা ঈশ্বরী
দিয়ে চরণতরী
ভবে করে পার
কেঁদেকেঁদে ডাকি মা তোমারে,-
এ ভব সাগরে।’
বন্দনা শেষে ছোকরা শিল্পীরা প্রেমের গান করেন। পরনে থাকে নারীর পোশাক। নেচে-নেচে গান করার পর শুরু হয় দ্বৈতগান। বাদকরা বাজনা বাজানোর পাশাপশি গানেও সুর ধরেন। গানে বলতে বিশেষ ধরনের নৃত্যগীত। ব্যঙ্গকৌতুকসহ সংক্ষিপ্ত পরিসরের কাহিনী। থাকে উক্তি। প্রতিউক্তি। প্রশ্নউত্তর।

বেশিরভাগ বিষয় পৌরাণিক। রাধা কৃষ্ণের প্রণয় প্রসঙ্গ এবং লোককথা নির্ভর কাহিনী।
শুরুতে সমবেত প্রার্থনা সংগীত শেষ হলে দলের ছোকরারা প্রত্যেকে একটি করে প্রেমের গান করে বা বৈঠকি গান গায়। গানের সঙ্গে নারীর পোশাক পরে নাচে ছোকরা। একসময় শেষ হয় বৈঠকি গান।

এরপর প্রেম বা লোককাহিনি ধরে শুরু হয় ঠাট্টা বা মশকরা। একসময় এটা শেষ হলে প্রবেশ করে মূলপর্বে। মানে লোকনাটকে।
পুরাণের গল্প, ইতিহাসের চমকপ্রদ ঘটনা, সমসময়ের রাজনীতি এবং নারী পুরুষের প্রেমের গল্প।

এসব ছাড়াও কাঠুরিয়ার আলকাপ, দৈনন্দিন জীবনের অভাব-অভিযোগ, রঙ্গ-পাঁচালীর আঙ্গিকে সমকালের রাজনীতির বিষয় নিয়েও হতো আলকাপ। চরিত্রের প্রয়োজনে অন্য অভিনেত্রী-অভিনেতা থাকেন।

নাটকের গুণ থাকলেও আলকাপ করা হয়েছে গানে ও সংলাপে।

লেখা বা মুখস্থ থাকে না।

সংলাপ তৈরি না থাকলেও গানগুলি লেখা হয় আগে লোকনাটকের সূত্র ধরে। যারা অভিনয় করে দলের প্রধান তাদেকে বুঝিয়ে দেন, শুরুর আগে। পঞ্চাশের দশকের শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ধর্মীয় এবং পারিবারিক অনুষ্ঠানেও আলকাপ গানের চল ছিল। এখন নেই।

সারাবাংলা/পিএম

Advertisement
বিজ্ঞাপন

Tags: ,

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন