বুধবার ১৭ জুলাই, ২০১৯ ইং , ২ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৩ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

‘এই ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে কাঁটাতারের মানচিত্র মুছে দিতে চেয়েছি’

জানুয়ারি ২, ২০১৯ | ৪:১৭ অপরাহ্ণ

রেজওয়ান সিদ্দিকী অর্ণ, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট ।।

চলচ্চিত্রের নন্দতত্ত্বে বিচরণ করা এক নির্মাতা কৌশিক গাঙ্গুলি। সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমে যেন তিনি সময়ের কথা বলেন। আর সেকারণে হয়ত তার  সিনেমাগুলো সময়ের সাক্ষী হয়ে রয়। তারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি এই নন্দিত নির্মাতা নির্মাণ করেছেন ‘বিজয়া’। এই ছবিতে তিনি একটি সময়ের চিত্র তুলে ধরেছেন। যে চিত্র মানুষের কল্পনা শক্তিকে উসকে দেবে। নতুন করে ভাবাবে দেশভাগ, ধর্ম আর ভালোবাসার জটিল সমীকরণ নিয়ে।

সিনেমাটি পশ্চিমবাংলায় ৪ জানুয়ারি মুক্তি পাবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে মুক্তি পাবে একই মাসের শেষের দিকে। এটি মূলত গেল বছর মুক্তি পাওয়া ‘বিসর্জন’ ছবির সিক্যুয়াল। মজার বিষয় হলো, পশ্চিমবাংলায় ‘বিজয়া’ মুক্তির দিন বাংলাদেশে মুক্তি পাবে ‘বিসর্জন’।

‘বিজয়া’ নির্মাণের উদ্দেশ্য, চলচ্চিত্রের নন্দনত্ত্বসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সারাবাংলার সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন কৌশিক গাঙ্গুলি।


  • জানুয়ারিতে পশ্চিমবাংলায় মুক্তি পাচ্ছে ‘বিজয়া’। সিনেমাটি বাংলাদেশেও মুক্তি পাবে কাছাকাছি সময়ে। ‘‌‌বিসর্জন’- এর সফলতার পর ‘বিজয়া’ নিয়ে বাড়তি কোন প্রত্যাশা?
বিজ্ঞাপন

দর্শকের মধ্যে ‘বিসর্জন’ নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল। কিছু মানুষ জানার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন- পদ্মা, নাসির আলী এবং গণেশ মণ্ডলের কি হলো? ‘বিজয়া’তে তারা সেসব প্রশ্নের উত্তর পাবেন। আবার ‘বিজয়া’ দেখার পরও অনেক প্রশ্ন তৈরী হবে। এটাই তো সিনেমা ধর্ম।

‘বিসর্জন’ সফল হয়েছে তাই বিজয়া নির্মাণ করেছি। সেজন্য এটা নিয়ে প্রত্যাশাও অনেক। আমার বিশ্বাস সিনেমাটি মুক্তির পর আমার প্রত্যাশা পূরণ হবে।

  • পশ্চিমবাংলায় ‘বিজয়া’ মুক্তির দিন বাংলাদেশে ‘বিসর্জন’ মুক্তি পাবে। জানেন নিশ্চয়ই!

বিষয়টি আমি জানি। প্রথমে ‘বিসর্জন’, তার কিছুদিন পর ‘বিজয়া’। বাংলাদেশের মানুষ পর পর দুটি ছবি দেখতে পারবেন। সিক্যুয়ালের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে না।

বাংলাদেশ আমার প্রিয় জায়গা। আমার দেশ বাংলাদেশ। কুমিল্লায় আমার বাড়ি। দেশভাগ হওয়ার কারণে আমার বাবা-মাকে ভারতে চলে আসতে হয়েছে। এই ছবিতে আমি বাংলাদেশের প্রতি আমার ভালোবাসা উজাড় করে দেয়ার চেষ্টা করেছি। এই যে, রাজনৈতিক কারণে দেশভাগ আমি মেনে নিতে পারিনি, আমার অসন্তোষ রয়েছে এবং হিন্দু-মুসলিম নিয়ে রাজনীতির বিরুদ্ধে আমার এই ছবি দুটি। রাজনীতিবিদরা যতদিন এগুলো নিয়ে গণ্ডগোল পাকাবেন ততদিন আমরা এ ধরনের সিনেমা নির্মাণ করবো। সিনেমা আমাদের অস্ত্র। আমি এটাও চাইবো সাধারণ মানুষ যেন তাদের রাজনীতিতে প্রভাবিত না হন।

পদবীর মতো ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়। পদবী যেমন জন্মসূত্রে পাওয়া, ধর্মও  জন্মসূত্রে পাওয়া। রাজনীতিবিদরা চাইবেন এটা নিয়ে ঝামেলা করতে। কারণ তাদের পেশা মানবসেবা নয়। রাজনীতিটাই তাদের পেশা। দুই বাংলার মানুষের কাছে আহ্বান, তারা কখনোই তাদের পেশার খোরাক হবেন না। বাংলাদেশ এবং ভারতবর্ষ খুব সুখী দেশ। এই দুই দেশের মানুষজন অনেক ভালো। দুই বাংলার মানুষ একেবারেই এক। তারা সারাক্ষণ মিশতে চায় একে অপরের সঙ্গে। আমার এই ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে কাঁটাতারের মানচিত্রকে মুছে দিতে চেয়েছি।

  • ‘বিজয়া’ নামকরণের সার্থকতা ?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘নাম যেন কোন গল্প না বলে। গল্প যেন সবসময় ব্যঞ্জনা দেয়।’ এটা ঠিক তাই। প্রতিমা বিসর্জনের পর আমাদের হিন্দু ধর্মে বিজয়া উৎসব করা হয়। এই বিজয়া উৎসব পুর্নমিলনীর মতো। সবাই সবার সাথে আলিঙ্গন করে, বন্ধুত্বের প্রসার করে। ছবিটি দেখলে বোঝা যাবে এই উৎসব কোন জায়গায়। কোন প্রেক্ষাপটে করা হয়েছে।

  • আপনার সব ছবিতে একটা বিশেষত্ব থাকে। নতুন কিছু একটা হয়। এই ছবির বিশেষত্ব কি?

এটা আমি বলব না। কারণ মানুষ ছবিতে বিশেষ কিছু খুঁজতে যান। এখন বলে দিলে সব মাটি হয়ে যাবে। আপাতত এই বিশেষত্বটুকু তোলা থাক। তবে এটা বলতে পারি, আমি যে ধরনের সিনেমা নির্মাণ করি সেটাই। যেভাবে আমি গল্প বলি সেভাবেই ‘বিজয়া’র গল্প বলেছি।

  • ‘‌‌বিসর্জন’ যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে ‘বিজয়া’র কাহিনী এগোবে। সিনেমার ক্ষেত্রে গল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে একটি কাঠামো তৈরী করা কতটা চাপের? তাছাড়া আপনি নিজেই এই ছবির গল্পকার। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি জানতে চাই।

আমার ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন চাপের কিছু না। ‘বিজয়া’র পরে আরও একটি গল্প রয়েছে। এমনকি ‘বিসর্জন’- এর আগেও একটি গল্প রয়েছে। সেটা বানানো হয়নি। আমি দ্বিতীয় খণ্ড থেকে সিনেমা বানিয়েছি। কেননা, আমার মনে হয়েছে দ্বিতীয় খণ্ড আগে নির্মিত না হলে কোন মানে দাঁড়াবে না। এরপর তৃতীয় খণ্ড বানাবো। দেখা যাক কি হয়!

  • শুনেছি তৃতীয় কিস্তি বাংলাদেশে শুটিংয়ের পরিকল্পনা করছেন। প্রেক্ষাপট কেমন হতে পারে? আর শুটিং কোথায় করবেন?

এখনই কিছু বলতে চাইছি না। আগে ‘বিজয়া’ মুক্তি পাক। মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখি। তারপর এ বিষয়ে বিস্তারিত সিদ্ধান্ত নিতে পারব।

  • ‘এমন একটা সময় ছবিটা রিলিজ করছে যখন পরকীয়া আর অবৈধ নয়’- এরকম একটি কথা সাক্ষাৎকারে বলেছেন। বাংলাদেশে কিন্তু বিষয়টি তা নয়। বাংলাদেশের দর্শকের জন্য বিষয়টি আপত্তিকর মনে হতে পারে। এ বিষয়ে আপনার ব্যাখ্যা জানতে চাই।

না না। আপত্তিকর মনে হবে না। বাংলাদেশ হোক আর ভারত- পরকীয়া কিন্তু চলছে। থামানো যায়নি। এটা থামানোও যায় না। এটা একটি প্রাকৃতিক জিনিস। কোথাও বৈধ, কোথাও অবৈধ। আমার বক্তব্য পরকীয়া মানেই খারাপ কিছু নয় যদি সেখানে সৌজন্যতা, সততা থাকে। তাছাড়া পরকীয়াকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সিনেমা নির্মাণ করিনি।

  • ছবিতে জয়া আহসান অভিনয় করছেন পদ্মা চরিত্রে। কোন বিশেষ কারণে জয়া আহসানকে এই চরিত্রের জন্য মানানসই মনে করলেন?

জয়া অসম্ভব দক্ষ এবং পাওয়ারফুল অভিনেত্রী। ভারতবর্ষের কোনো অভিনেত্রীর কাছে আমি এমন অভিনয় পেতাম না। সবচেয়ে বড় কথা জয়ার সাবলীল কথা বলার ভঙ্গী তা এই ছবির জন্য যথাযথ। পদ্মা চরিত্রে তিনি অপরিহার্য ছিলেন। যখন প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটি দেখবেন তখন বুঝতে পারবেন জয়া কতোটা ভালো অভিনয় করেছেন।

  • বাংলাদেশের চলচ্চিত্র পরিচালনার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। জয়া আহসানকে এ বিষয়ে বলেছেনও নাকি! তাহলে কি জয়া প্রযোজিত কোনো ছবিতে আপনাকে পরিচালনায় দেখা যেতে পারে?

বাংলাদেশে গিয়ে ছবি বানাতে পারলে নিজেকে খুব সম্মানিত মনে করব। তবে এখনই সেটা সম্ভব হচ্ছে না। ২০২০ সাল বা তার পরববর্তী সময়ে হয়ত বাংলাদেশের কোন সিনেমা পরিচালনা করতে পারি। হতে পারে সেটা জয়ার ছবি, কিংবা অন্য কারও। সেটাতে জয়া অভিনয় করতে পারেন। আবার নাও করতে পারেন। দেখা গেল সেই ছবিতে কোন নারী চরিত্রই থাকল না।

  • নান্দনিক নির্মাতা হিসেবে আপনাকে অভিহিত করা হয়। আপনার কাছে চলচ্চিত্রের নান্দনিকতার সংজ্ঞা কি?

যে শিল্পের সৌজন্যতা নেই সে শিল্পের নান্দনিকতা থাকে না। একটা ঐতিহ্য ও সৌজন্যতা বজায় রাখতে হবে সিনেমায়। এবং মনে রাখতে হবে, সিনেমা শুধুমাত্র ব্যবসা না। ব্যবসার বাইরেও সিনেমার লোকশিক্ষার দায়িত্ব থাকে। এর মাধ্যমে মানুষের নানা মতামত তুলে ধরতে হয়। মোদ্দাকথা, একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার সৃষ্ট শিল্প যেন জনমানুষের মতামত গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এটাই সিনেমার নান্দনিকতা।

  • পরিচালক কৌশিক গাঙ্গুলির নিজস্বতা কি?

আমার জানামতে ভারতবর্ষে কোন নির্মাতা নিজেই নিজের গল্পে এতগুলো সিনেমা নির্মাণ করেননি। আমি এখন পর্যন্ত ২২টি ছবি নির্মাণ করেছি। সবগুলোর গল্পকার আমি।

সারাবাংলা/আরএসও/পিএ/পিএম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন