বুধবার ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৯ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরি

বিজ্ঞাপন

তারুণ্য আওয়ামী লীগের শক্তি, চ্যালেঞ্জও

জানুয়ারি ২, ২০১৯ | ৭:০৫ অপরাহ্ণ

।। মাকসুদা আজীজ, অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর ।।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা: সদ্য অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটি ছিল দেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচন। প্রথমত, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ২০১৪ সালে হয়ে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের সব দল অংশ নেয়নি। শুধু তাই নয়, ওই নির্বাচনের আগে-পরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট টানা হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি দিয়েছিল। একইসঙ্গে ওই নির্বাচনের পর দশম সংসদকে বিতর্কিত সংসদ বলেও অভিহিত করে সরকারবিরোধী দলগুলো। এ কারণে গত পাঁচ বছর ধরেই সব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনে প্রত্যাশা ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি দেশবাসীরও। সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী এবারের নির্বাচন ছিল অংশগ্রহণমূলক। এই নির্বাচনে প্রায় সব দলই অংশ নেয়। দ্বিতীয়ত, এই নির্বাচনে তরুণদের বিপুল অংশগ্রহণ ছিল। সেদিক থেকে বলতে গেলে, তরুণরাই এই নির্বাচনের মূল নিয়ামক।

নির্বাচনের শুরু থেকেই বলা হচ্ছিল, এই নির্বাচন হবে তারুণ্যের নির্বাচন। ১৮ থেকে ২৮ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা ২২ শতাংশ। আবার, প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছেন— এমন ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ। পরিসংখ্যানের দিক এটি পরিষ্কার ছিল, তরুণদের ভোট যেদিক যাবে, জয় সেদিকেরই হবে।

দশম জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ তরুণদের এই জোয়ারের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিল ২০০৮ সালের নির্বাচনেই। ওই সময় মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রশ্নে তরুণরা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও কমিউনিটি ব্লগে খুব সোচ্চার ছিলেন। ২০০৮ সালেই একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে নিশ্চিত হয়েছিল, এই তরুণরা ‘আই হেট পলিটিক্সের’ অনুসারী নয়।  বরং সত্তরের দশকের তরুণদের উত্তরাধিকারী, যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবনও দিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চ, ২০১৫ সালের ভ্যাটমুক্ত শিক্ষার আন্দোলন, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক  আন্দোলনের মতো প্রতিটি আন্দোলন রাজনীতিবিদদের কাছে তরুণদের রাজনীতিতে আগ্রহের বার্তাই দিয়েছে। ফলে তরুণদের অবহেলা করার উপায় ছিল না কোনো রাজনৈতিক দলেরই। তাই প্রতিটি দল চেয়েছে, ইশতেহার থেকেই এমন কিছু করতে যা তরুণদের আকৃষ্ট করে। নির্বাচনি প্রচারণায়ও তরুণদের বিষয়টি এসেছে। এমনকি নির্বাচনের প্রচলিত ধারা ভেঙে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসে প্রচারণা চালিয়েছে প্রতিটি দল। তরুণরা নির্বাচনি ইশতেহারে তাদের প্রত্যাশা জানিয়েছে। এছাড়া বেশকিছু সামাজিক সংগঠনও তরুণদের নিয়ে সম্মেলন করেছে।  সবাই উপলব্ধি করতে পেরেছে, নিজেদের উন্নয়নের জন্য পরিশ্রম শুরু করতে হবে একদম গোড়া থেকেই।

২০০৮ সালের মতো ২০১৮ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের শক্তি হয়েছেন  নতুন ভোটাররা। শুধু তাই নয়, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ যাদের ভোটে ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেছে দলটি।  ২০১৮ সালে এসে এর ফলও পেয়েছে আওয়ামী লীগ। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের যে কাজটি সবচেয়ে বেশি কার্যকর ছিল, সেটি হলো দলটি তরুণদের বক্তব্য শুনেছে। তবে, অন্য রাজনৈতিক দলের মতো নিজেদের ইশতেহারে  তরুণদের বক্তব্য যোগ করে দেয়নি। এমনকি ইউনেসকো যে শিক্ষায় জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ করার তাগিদ দিয়েছে, তাও আওয়ামী লীগ তাদের ইশতেহারে যোগ করেনি। বরং আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বার বার বলা হয়েছে, তারা এমন ইশতেহার দিয়েছে, যা অর্জন করা সম্ভব।

রাজনৈতিক প্রচারণায় আওয়ামী লীগের আরেক মাধ্যম ছিল তরুণদের সঙ্গে খোলা সংলাপে বসা। এই কাজটি আওয়ামী লীগ খুব সুসংগঠিতভাবে করে এসেছে পুরো সময় ধরে। তরুণদের জন্য প্রচলিত ছাত্রলীগ, যুবলীগের বাইরেও জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড, ইয়ুথ বাংলা গঠন তরুণদের নতুন পথের দিশা দিয়েছে। এই কার্যক্রমগুলো আওয়ামী লীগের তরুণ নেতৃতে একটা ‘ফ্রেশ এয়ার’ দিয়েছে। এই ফ্রেশ এয়ার বা নতুন মুখ যাই বলি আমরা, এর মধ্যে এমন ছেলে-মেয়েও আছে, যারা সমাজের তুলনামূলক স্বচ্ছল স্তর থেকে এসেছে। যেহেতু এতদিন তারা দেশের রাজনীতিকে ‘হেট’ করতো, তাই তারা বিদেশে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখতো। এখন দেশেই তারা নিজেদের একটা ভবিষ্যৎ দেখছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ নামের যে দেশটি বিশ্বে নানান উপায়ে জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে, সেই দেশের কাজে আসাটাকে তারা ব্যক্তিগতভাবে লাভজনক বলে মনে করছে।

এই পুরো ঘটনায় যেই দু’টি জিনিস খুব গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো, এক. আওয়ামী লীগ তার পুরো প্রচারণাটা করেছে তরুণদের আলোকিত করার মাধ্যমে। আগে রাষ্ট্র চালনার যে বিষয়গুলো তরুণদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হতো, তা এখন তাদের কাছে পরিষ্কার। শুধু তাই নয়, তারা এটাও জেনে ফেলেছে যে, বদল তারা আনতে পারে। আর এই বদলের মাধ্যমে তাদেরও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে। দুই. এই যুগের  তরুণরা অভিমত দেওয়াকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। নিজের স্বার্থটাকে বুঝে নিতে জানে।

এই দুই বিষয়কে বেগবান করবে এ যুগের তরুণদের নিজেকে প্রতিনিয়ত উন্নত করার চেষ্টা ও তথ্যপ্রাপ্তি। তাদের কর্মকাণ্ড বলছে, ২০১৯-২০২৩ সময়ে দেশ পরিচালনায় আওয়ামী লীগকে বার বার ইশতেহারের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। ২০২৩ সালের শেষ পর্যন্ত তরুণদের দুর্নীতি থেকে মুক্তি দিতে হবে। পাশাপাশি  সুবিচার, শান্তি ও সমৃদ্ধি দিতে হবে। প্রশ্ন করা, জবাব চাওয়া ও ভীষণ অধিকার সচেতন এক তরুণ প্রজন্মই হবে আওয়ামী সরকারের এই আমলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যে প্রজন্ম বিশ্বাস করে, তারা নিজে হাতে দেশ চালাতে পারছে না বলে প্রতিনিধিকে সংসদে পাঠিয়েছে, তাদের নজরদারি থেকে একচুলও ছাড় পাচ্ছে না আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট। এরফলে ২০২৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে আবারও ক্ষমতায় আসতে হলে এই চ্যালেঞ্জগুলো মাথায় রেখেই আগাতে হবে।

সারাবাংলা/এমএ/এমএনএইচ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন