রবিবার ১৬ জুন, ২০১৯ ইং , ২ আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১২ শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

যত বিস্ময়-বৈচিত্র্য পদ্মাসেতুর!

জানুয়ারি ৯, ২০১৯ | ৮:৫২ পূর্বাহ্ণ

।। সাব্বির আহমেদ, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট ।।

মাওয়া-জাজিরা থেকে ফিরে: বিশ্বের তীব্র খরস্রোতা নদী আমাজানের পরেই পদ্মার অবস্থান। এ কারণে এই নদীতে সেতু তৈরি অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ। একইসঙ্গে বিস্ময়করও। পদ্মার তলদেশ এতই দ্রুত পরিবর্তনশীল, যেকোনো মুহূর্তেই সেখান থেকে মাটি সরে গিয়ে ২১ তলা ভবন সমান গভীর খাদ তৈরি হতে পারে। আর এই চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখেই এর চেয়েও বেশি গভীরে পাইল বসিয়ে তৈরি করতে হচ্ছে পদ্মাসেতু। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ স্বপ্নের এই সেতু তৈরি করতে গিয়ে বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীদের।

আরও পড়ুন: পাখির চোখে দেখে আসা পদ্মাসেতু

পদ্মাসেতু, পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ, পদ্মাসেতু রেলসংযোগ,

সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পদ্মার গভীরতা প্রায় চল্লিশ মিটার (১৩১ ফুট)। সাধারণত একতলা ভবনের উচ্চতা ১০ ফুট হয়। সে হিসাবে পদ্মার তলদেশ থেকে পানির ওপরের ভাগপর্যন্ত উচ্চতা ১৩ তলা ভবনের সমান। আর নদীর তলদেশে হঠাৎ খরস্রোতে আরও প্রায় ৬৫ মিটার (২১৩ ফুট) মাটি সরে গিয়ে খাদ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ প্রায় ২১ তলা ভবন সমান মাটি পদ্মার নিচে যেকোনো সময় ধস নেমে সরে যেতে পারে। যে কারণে ১৩ ও ২১ তলা ভবন মিলিয়ে ৩৪ তলা ভবন সমান গভীরে পাইল বসাতে হয়। প্রকৌশলীরা হিসাব করে ১২০ মিটার গভীরে নিয়ে যান একেকটি পাইল। যার ফলে নদীগর্ভে ৪০ তলা ভবনের একটি অবকাঠামো গড়তে হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পদ্মাসেতু, পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ, পদ্মাসেতু রেলসংযোগ,

ধূসর রঙে যে পদ্মাসেতু দাঁড়িয়ে গেছে, তার তলদেশে এই ৪০ তলা ভবন সমান কাঠামো রয়েছে। যাকে পদ্মাসেতুর সবচেয়ে বড় বৈচিত্র্য ও চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন পদ্মাসেতুর আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিনি জানান, এই নদীর মাওয়া পয়েন্টেই মাত্র ২০ সেকেন্ডে যে পানি প্রবাহিত হয়, তা রাজধানী ঢাকার দেড় কোটি মানুষের সারাদিনের যত পানি লাগে, তার সমান। হিসাব অনুযায়ী, পদ্মায় প্রতি সেকেন্ডে ১ লাখ ৪০ হাজার ঘন মিটার পানিপ্রবাহ রয়েছে। এদিক থেকে আমাজানের পরই এই প্রমত্তা পদ্মার স্থান।

পদ্মাসেতু, পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ, পদ্মাসেতু রেলসংযোগ,

সংশ্লীষ্ট প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পদ্মাসেতুর প্রতিটি পাইলের ভারবহন ক্ষমতা ৮ হাজার ২০০ টন। প্রতিটি পিলারের (পিয়ার) ভারবহন ক্ষমতা ৫০ হাজার টনের। পৃথিবীর অন্য কোনো সেতুর পিলারে এত লোড দেওয়া হয়নি বলেও সূত্র জানায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব পাইল নদীগর্ভে নিয়ে যেতে এর আগে পৃথিবীতে শক্তিশালী কোনো হ্যামার ছিল না। এজন্য ৪০০ কোটি টাকা দিয়ে হ্যামার তৈরি করে আনা হয়েছে। এ পর্যন্ত এ রকম ৫ টি হ্যামার ব্যবহৃত হয়েছে পদ্মায়। তবে এর মধ্যে ২টি বিকল হয়ে গেছে। কাজ চলছে বাকি ৩টি দিয়ে। হ্যামারগুলো জার্মান প্রযুক্তির নেদারল্যান্ডসের একটি কোম্পানি থেকে বিশেষ অর্ডারে আনা হয়েছে।

পদ্মাসেতু, পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ, পদ্মাসেতু রেলসংযোগ,

স্বপ্নের এই সেতুটি যেসব উপাদানে তৈরি হচ্ছে সেতু, তাতেও রয়েছে বৈচিত্র্য। এই সেতু তৈরিতে যে পাথর ব্যবহৃত হচ্ছে, তার একেকটির ওজন এক টন। পাথরগুলো ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের পাকুর নামক স্থান থেকে আমদানি করা হয়েছে। এসব পাথর এত ভারী ও বড় যে, মাত্র ১৫ টুকরো পাথরের বেশি একটি বড় ট্রাকে তোলা যায় না।

পদ্মাসেতু, পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ, পদ্মাসেতু রেলসংযোগ,

জানা গেছে, পদ্মাসেতু নির্মাণে যে ওয়ার্কশপ ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিও বিশ্বের সবচেয়ে বড় নির্মাণ ওয়ার্কশপ। এর আগে কোনো সেতু তৈরিতে এত বড় কর্মযজ্ঞের প্রয়োজন হয়নি। এখানে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে রিমোট কন্ট্রোল পদ্ধতিতে ভারী বস্তু ওঠানো-নামানো হয়। পদ্মা পাড়ে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে এই পাইল ও স্প্যান ফেব্রিকেশন ইয়ার্ড (ওয়ার্কশপ) তৈরি করা হয়েছে। যেখানে প্রস্তুত হচ্ছে সেতুর একের পর এক পাইল ও স্প্যান। এই ইয়ার্ডের আয়তন ৩০০ একর।

পদ্মাসেতু, পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ, পদ্মাসেতু রেলসংযোগ,

সেতু এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পেছনের অংশ দিয়ে পাত প্লেট ঢুকছে, অন্যদিকে পাইল বের হচ্ছে। এরপর সামনের অংশে স্প্যান ফেব্রিকেশন করা হচ্ছে। যেখানে চীন থেকে আনা স্প্যানের জায়ান্ট দেওয়া হয়। এরপর তিন রঙে পরিবর্তন করে ৩ হাজার ৬০০ টনের ক্রেনে তুলে সেতুর পিলারের ওপর স্থাপন করা হয়।

আরও পড়ুন: পদ্মার তলদেশের কাদামাটি রূপ নিচ্ছে শক্ত-স্থায়ী কাঠামোয়

পদ্মাসেতু, পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ, পদ্মাসেতু রেলসংযোগ,

স্বপ্নের পদ্মাসেতুতে যানবাহন উঠতে আর বেশি দিন বাকি নেই। ৬০ শতাংশ অগ্রগতির পর এখন স্বপ্ন বাস্তবায়নের শেষপ্রান্তে। ২০১৯ শেষ হলেই চালু হতে পারে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নির্মাণ অবকাঠামো পদ্মা বহুমুখী সেতু। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলাকে যুক্ত করবে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে। আর এটি তৈরি হচ্ছে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে।

দেখুন ভিডিও চিত্র:

সারাবংলা/এমএনএইচ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন