রবিবার ১৬ জুন, ২০১৯ ইং , ২ আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১২ শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

এ এক ‘বটুয়া বুড়ি’র গল্প

জানুয়ারি ৯, ২০১৯ | ৩:৩৯ অপরাহ্ণ

।। রাজনীন ফারজানা ।।

কথায় বলে শরীরের বয়স বাড়ে না, বয়স বাড়ে মনে। অর্থাৎ বয়সকে বাধা মনে করলেই তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তা নাহলে যেকোন বয়সেই জয় করা যায় শত প্রতিকূলতা, পূরণ করা যায় মনের যত ইচ্ছা।

এমনই একজন- ভারতের আসামের লতিকা চক্রবর্তী। ৮৯ বছরের লতিকা নিজের সেলাই মেশিনে পুরনো কাপড় থেকে বটুয়া ব্যাগ তৈরি করেন। শারীরিকভাবে সক্ষম হলে হাতমেশিন চালিয়ে ব্যাগ বানানো হয়ত যায়। কিন্তু লতিকা চক্রবর্তী ব্যাগ বানিয়েই থেমে থাকেননি। তার বিপণনও তুলে নিয়েছেন নিজ হাতে।

কী ভাবছেন কুঁজো বুড়ি লাঠি ঠক ঠক করে বাড়ি বাড়ি ফেরি করছেন, এই তো?

বিজ্ঞাপন

বাস্তবে কিন্তু তা নয়। রীতিমতো আধুনিক যুগের অনলাইন শপিংয়ে তার তৈরি ব্যাগ দেদারছে বিক্রি হচ্ছে। ‘লতিকা’স ব্যাগ’ যার ব্র্যান্ড নেম।

লতিকার বটুয়া ব্যাগ

 


কে বলে শখের দাম নাই!

১৯৩০ সালে আসামের ডিব্রুগড়ে জন্ম নেন লতিকা। মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকেই শাড়ি পরেন। শাড়িই তার প্রিয় পোশাক। বিয়ের পর সার্ভেয়ার স্বামীর সরকারি বদলির চাকরির সুবাদে ভারতের নানা জায়গা ঘুরেছেন, থেকেছেন। তখন নানা জায়গা থেকে নানারকম শাড়ি এবং বৈচিত্র্যময় কাপড় সংগ্রহ করতেন তিনি।

পুরনো এসব শাড়ি কিংবা কাপড় ফেলে দিতে পারেননি লতিকা। পুরনো শাড়িগুলো কতটা সুন্দর তা নিয়ে ভাবেননা। বরং শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে মিশে থাকা স্মৃতিগুলোই তার কাছে অনেক দামি। তবে একটা পর্যায়ে স্মৃতির চেয়েও শাড়িগুলোর অভিনব ব্যবহারের কথা ভাবলেন। ওগুলো যেহেতু আর পরাই হবে না, তাই কেটে কেটে সেলাই মেশিনে জামাকাপড়, সোয়েটার, পুতুল এবং পুটুলি ব্যাগ বানিয়ে পুরনো এসব শাড়ি-কাপড়কে নতুন জীবন দিতে শুরু করলেন তিনি।

ছোটবেলাতেই উল বোনা, হাতে ও মেশিনে সেলাই করা রপ্ত করেন লতিকা। বাচ্চাদের নিজের হাতে বানানো পোশাক পরানো বেশ গর্বের ছিল সেসময়ের মায়েদের কাছে। লতিকারও ভালো লাগত নিজের হাতে সন্তানদের পোশাক বানাতে। একসময় বাচ্চারা বড় হয়ে গেলে তিনি পুরনো কাপড় দিয়ে পুতুল বানাতে শুরু করেন।

শ্বাশুড়ি এত সুন্দর সেলাই করেন দেখে, চার থেকে পাঁচ বছর আগে লতিকার ছেলের বউ তাকে অনুরোধ করেন সালোয়ার কামিজের সাথে ম্যাচিং বটুয়া ব্যাগ বানিয়ে দিতে। তখন লতিকা বুঝতে পারেন ব্যাগটা তিনি ভালোই বানান! আর কাজটা উপভোগ করতে শুরু করেন।

সেই থেকে বন্ধু-বান্ধব এবং পরিবারের সদস্যদের জন্য পুরনো কাপড় দিয়ে ব্যাগ বানাতে শুরু করেন লতিকা। সবাই বেশ পছন্দ করতে থাকেন হাত মেশিনে সেলাই করা রঙ বেরঙের চমৎকার ডিজাইনের বটুয়া। লতিকা চক্রবর্তী অনেকের জন্মদিন বা নানা উপলক্ষে এসব ব্যাগ উপহার দিতেন।

লতিকার বটুয়া ব্যাগ

এমন সময়ে তার নাতি জয় জার্মানি থেকে দেশে আসে। দাদীর বটুয়া তৈরির দক্ষতা দেখেতো ভীষণ মুগ্ধ। নাতিরই আইডিয়া ছিল দাদীর এসব ব্যাগ অনলাইনে বিক্রি করার। তিনি লতিকা’স ব্যাগ নামে ওয়েবসাইট খুলে দিলেন। এরপর লতিকা চক্রবর্তীর পরিবারের সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে এই ওয়েবসাইট এবং লতিকার ব্যাগকে জনপ্রিয় করতে থাকেন। এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে আসামের লতিকা চক্রবর্তীর হাত মেশিনে সেলাই করে বানানো পুরনো শাড়ি-কাপড়ের বটুয়া ব্যাগের গল্প। লতিকার ছেলে এবং ছেলের বউ তাকে এই ব্যাবসা চালাতে সাহায্য করছেন।


স্মৃতি, সে কি ফেলা যায়!

‘একটা পুরনো শাড়ি কিংবা পোশাক দেখলে আমি তার মাঝে মলিনতা দেখি না, বরং চোখের সামনে ভেসে ওঠে এইসব পোশাকের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা নানা স্মৃতি। বিয়ে কিংবা অন্য কোন অনুষ্ঠানে হয়ত পরা হয়েছিল সেসব পোশাক। পোশাকটা দেখলে আমার সেসব দিনের স্মৃতি মনে পড়ে যায়। পুরনো শাড়ি কিংবা কাপড় থেকে নতুন করে ব্যাগ বানিয়ে সেসব স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করি আমি। তাই বলা যায়- আমার বানানো প্রতিটা ব্যাগের মাঝে একটা করে গল্প আছে,’ এক ভারতীয় নারী ব্লগকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলছিলেন লতিকা চক্রবর্তী।

লতিকার এই স্মৃতি ধরে রাখার প্রয়াসে তৈরি হয়েছে তার বিপুল ভক্তকুল। দারুণ জনপ্রিয় এসব রিসাইকেলড বটুয়া। লতিকা’স ব্যাগের ব্যাবসাও তাই চলছে রমরমা। কিন্তু ব্যাবসার কাছে নিজেকে সঁপে দেননি লতিকা। এখনও নিজের মন মর্জিতেই চলেন তিনি। কখনোই কোন ব্যাগ বানানোর জন্য নির্দিষ্ট দিন তারিখ নেন না। একটা ব্যাগ কীভাবে কোন ডিজাইনে বানাবেন, সেটা ভালোভাবে মাথায় গেঁথে নিয়ে তবেই কাজে বসেন।

শুধু পুরনো শাড়িই নয়, স্মৃতির প্রতি অসম্ভব ভালোবাসা লতিকার। ৬৪ বছর আগে স্বামী শ্রী কৃষ্ণলাল চক্রবর্তীর উপহার দেওয়া সেলাই মেশিনটা দিয়েই এখনও কাজ করছেন তিনি। প্রতিদিন নিজের হাতে যত্ন করেন মেশিনটার। তাই এখনও দারুণ কাজ করে সেটা। স্বামীকে হারিয়েছেন আজ ৩৪ বছর হল। কিন্তু স্বামীর দেওয়া ভালবাসার এই উপহারখানা ছুঁয়ে রোজ স্বামীকে স্মরণ করেন তিনি।

৮৯ বছরের লতিকা চক্রবর্তী বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের ভালোলাগা আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন। লতিকা চক্রবর্তী হতে পারেন আমাদের অনেকের জন্য অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, বুড়িয়ে যাওয়া মানেই অবসর কাটানো আর চুপচাপ মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা নয়।

বয়স বাড়লে শরীরের জোর কমে যায়, ধীর হয় গতি আর কমে যায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। ফলে ঘিরে ধরে নানারকম অসুখ বিসুখ। কিন্তু ভারতের ৮৯ বছরের লতিকা চক্রবর্তী এসব গৎবাঁধা ধারণা ভেঙে দিয়েছেন। এই বয়সে অনলাইন উদ্যোক্তা হয়ে তিনি দেখিয়েছেন জোরালো ইচ্ছাশক্তি স্বপ্ন পূরনের পথে আসা সমস্ত বাধা দূর করে।

সারাবাংলা/আরএফ/এমএম 

 

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন