শুক্রবার ২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ইং , ১৩ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ শাবান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

অতঃপর মায়ের অভিভাবকত্ব!

জানুয়ারি ১৩, ২০১৯ | ১:১৭ অপরাহ্ণ

মায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমাদের দেশে প্রচলিত আইন এবং সমাজের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছেন আমাদের নারীরা। এ লড়াই চিরন্তন। নারী তার সন্তানের অভিভাবকত্ব, পিতৃত্ব, হেফাজত এমনি নানা বিষয়ে আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন। কেউ পাচ্ছেন প্রকৃত অধিকার কিংবা কেউ বঞ্চিত হচ্ছেন। বা কোন মা হারিয়ে ফেলছেন চিরদিনের মত তার মাতৃত্বের অধিকার।
আমি মানবাধিকার সংস্থায় কাজের সূত্রে এমনি নানা বিষয়ের মুখোমুখি হয়েছি। অনেক বঞ্চিত নারী এসেছেন সংস্থায়। মামলা নয় সালিশ প্রক্রিয়ায় তার অধিকার ফিরে পেতে। কর্মদক্ষতা আর নিষ্ঠা দিয়ে পেরেছি কোন কোন নারীর অধিকার আদায় করে দিতে। আর সালিশ প্রক্রিয়ায়তেই সে ফিরে পেয়েছে দীর্ঘদিনের চাওয়াগুলো।
সালমা (ছদ্মনাম) আমার কাছে এসেছিল একটু ভিন্ন একটি বিষয় নিয়ে। জাফর হোসেন (ছদ্মনাম) সালমার প্রাক্তন স্বামী। পারিবারিক মীমাংসায় মোহরানা পরিশোধ করেই জাফর প্রায় ১০/১২ বছর আগে সালমাকে তালাক দেন। সালমার যখন তালাক হয় তাদের একমাত্র শিশুপুত্র রায়হান (ছদ্মনাম) খুব ছোট। এক রকম অপরাগতা এবং মা-বাবার সংসারে আবার ফিরে আসবার কারনে সালমার পক্ষে সম্ভব হয়নি রায়হানকে নিজের কাছে রাখবার। সে সুযোগটাই জাফর নেন এবং রায়হান তার বাবার কাছেই বড় হতে থাকে।
রায়হান বছরে ২/১ বার বরিশাল থেকে ঢাকায় আসতো মায়ের সাথে দেখা করতে। সালমা কথাগুলো বলবার সময় অঝোরে কাঁদছিল। বলছিল, ‘‘আপা আমি নিজে কিছু করি না। খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাবার কারনে লেখাপড়া বেশীদূর হয়নি। ছেলেকে ভালো স্কুলে পড়াবার সামর্থ্য আমার ছিল না। আমি যদি রায়হানকে ওর বাবার কাছ থেকে নিয়ে আসতাম তাহলে ওর বাবা ছেলের খরচ দিতো না। আজ আমি আপনার কাছে এসেছি দুটো বিষয় নিয়ে। এতবড় অন্যায় আমি আর সহ্য করতে পারিনি। তাই আপনাদের এই সংস্থার দ্বারস্থ হয়েছি।’’

সে আরো বলে,  “আমার তালাক হবার পর থেকে আমার স্বামী বরিশালে বসবাস করছে। সেখানে একটি সরকারি ব্যাংকে উচ্চপদে বর্তমানে কর্মরত এবং ২য় বিয়েও করেছে। তার ২য় স্ত্রীর একটি কন্যা সন্তানও হয়েছে। আমার ছেলে এ বছর এস.এস.সি পরীক্ষার্থী। আমি খুব বিশ্বস্তসূত্রে জানতে পেরেছি রায়হান এর এস.এস. সি (রেজিষ্ট্রেশন) এ জাফর মায়ের নামের স্থলে আমার নাম অন্তর্ভুক্ত করেনি। রেজিঃ ফরম এ মায়ের নামের স্থলে সে তার ২য় স্ত্রীর নাম দিয়েছে।
বিষয়টি আমার জন্য পীড়াদায়ক এবং অপমানজনক, আমি কোন ভাবেই মানতে পারছিনা আমি মারা গেলেও তো আমি রায়হানের গর্ভধারিনী মা এবং মায়ের নামের স্থলে আমার নামটি হবে তাই নয় কি?”

সালমা তার অন্তরের জমানো কষ্টটা বলে কিছুটা হালকা হয়। সালমার দাবী ছিলো ছেলের রেজিষ্ট্রেশন ফরমে যেন তার নামটি দেয়া হয় এবং ছেলের সাথে সাক্ষাৎ টি যেন নিয়মিত হয়।

বিজ্ঞাপন

একটি বিষয় আমাদের সকলেরই জানা প্রয়োজন বর্তমান সরকার বাবার পাশাপাশি অভিভাবক হিসাবে মায়ের নাম দিয়ে এস.এস. সি ও এইচ এস সি পরিক্ষায় নিবন্ধন (রেজিষ্ট্রেশন) করার পক্ষে মত দিয়েছেন। ১৯৯৮ সালের ৯ ডিসেম্বর রোকেয়া দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষনা দিয়েছিলেন এখন থেকে বাবার পাশাপাশি মায়ের নামও লিখতে হবে। এরপর সংবিধানের প্রচলিত বিধি বিধান ও বিদ্যমান আইন গুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সেই ঘোষনার পর ২০০০ সালের ২৭ আগষ্ট সরকারী প্রজ্ঞাপন জারীর মাধ্যমে মায়ের নাম লেখার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

শুধু মায়ের নাম ব্যবহার করলে পরীক্ষার ফরম অপূর্ণ বিবেচিত হবে কেন জানতে চেয়ে তিনটি মানবাধিকার সংস্থা হাইকোর্টে রীট করে। হাইকোর্টেও রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এবং সরকারে এই সিদ্ধান্তের ফলে বাবার পাশাপাশি মায়ের অভিভাবকত্বের ভুমিকাটি সুষ্পষ্ট এবং নিশ্চিত হয়।

আমি সালমার লিখিত অভিযোগ গ্রহনের পর তার প্রাক্তন স্বামী জাফরকে সংস্থার পক্ষ থেকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠাই। নোটিশ পাবার পরই তিনি বরিশাল থেকে ঢাকায় আসেন এবং সংস্থায় সাক্ষাৎ করেন। তাকে সালমার লিখিত অভিযোগকৃত বিষয়ে জানানো হলে তার পুরোটাই স্বীকার করলেও তার ২য় স্ত্রীকে প্রাধান্য দেবার মত শর্ত আরোপ করতে থাকেন। সালমা তার শিশু সন্তাটিকে নিজের কাছে রাখেনি, তার কোন যত্ন করেনি, দায়িত্ব নেয়নি। তার ২য় স্ত্রী রায়হানের প্রতি সব কর্তব্য পালন করে রায়হানের মা হয়েছেন। সে হিসাবে রেজিষ্ট্রেশন ফরম এ তার ২য় স্ত্রীর নামটি মায়ের নামের স্থলে থাকাই যুক্তিযুক্ত বলে তিনি বার বার বলতে থাকেন।

তাকে হাইকোর্টেও রুল এবং সরকারে সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানানো হলেও তিনি প্রথমে আমলে নিচ্ছিলেন না। এক রকম মুখের জোরে বিষয়টি এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করতে থাকেন।
তাকে আর কোন অযৌক্তিক বক্তব্য না দেবার সুযোগ দিয়ে ছেলেসহ নির্ধারিত সালিশের তারিখে উপস্থিত হবার জন্য বলা হলে জাফর সালিশের তারিখে নির্ধারন করে ছেলেসহ আসবেন বলে আশ্বস্ত করলেন।

নির্ধারিত সালিশের তারিখে সালমা সংস্থায় উপস্থিত হলেন। জাফর তার ছেলেকে নিয়ে আসলেন। দীর্ঘদিন পর মা ছেলের সাক্ষাতে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হলো। ছেলে তার মাকে পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো, মা পাগলের মত সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আইন সমাজ সব কিছুর উর্ধ্বে এই সম্পর্কের মুহুর্ত আমাদের চোখের জলও ধরে রাখতে পারেনি।

রায়হানকে তার বাবা যে তার এস.এস. সি রেজিষ্ট্রেশন ফরম এ তার মায়ের নাম দিতে দেননি এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। রায়হান বলে,  ‘‘আমি জানি আমার মায়ের নাম দেয়া হয়নি। আমি এখন যাকে আম্মা বলে ডাকি তার নাম দেয়া হয়েছে। আমি বাবাকে খুব ভয় পাই। এজন্য কোন প্রতিবাদ করতে পারিনি। তবে এ বিষয়ে আমি খুব কষ্ট পেয়েছি। আমি তো জানি আমার মা আছেন। আমি জানি না কোন পরিস্থিতিতে বাবা মায়ের বিচ্ছেদ হয়েছে। তখন আমি খুব ছোট ছিলাম। আমি খুব ছোট থেকেই বাবার সাথে আছি। ২/১ বার ঢাকায় এসেছি মায়ের সাথে দেখা করতে। বাবা আমাকে ফোনে ও মায়ের সাথে কথা বলতে দেন না। তবে আমি চাই মা যেখানেই থাক আমি মায়ের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে। মাকে আমি খুব ভালোবাসি। আমি মায়ের কাছে আসতে চাই এবং মায়ের সাথে সময় কাটাতে চাই। আর রেজিষ্ট্রেশন ফরম এ আম্মার নাম পরিবর্তন করে আমার নিজে মায়ের নাম দিতে চাই। এটা আমার দাবী এবং চাওয়া, আজ সাহস করে কথাগুলো বললাম। যা এত দিন আমার বুকের মধ্যে চাপা দেয়া ছিলো।”
রায়হানের কথা আর মায়াময় মুখটা অনেক কিছুই বলে দিচ্ছিল। সে তার বাবার কাছে ভালো নেই। তবে তাকে লেখাপড়া শিখতে হবে এবং ভবিষ্যতে তার মায়ের পাশে দাঁড়াতে হবে, এই বার্তাই ছিলো রায়হানের বক্তব্যে।

উভয় পক্ষের সাথে আলোচনা করে সালমার দাবীর প্রেক্ষিতে জাফরকে সময় দেয়া হয় যে সকল নিয়মকানুন মেনে যত দ্রুত সম্ভব বোর্ডের রেজিষ্ট্রেশন থেকে মায়ের নাম পরিবর্তন করবার এবং পরিবর্তনের পর সকল কাগজপত্র সংস্থায় জমা দেয়া এবং অবহিত করা। রায়হান তার মায়ের সাথে যাতে নিয়মিত দেখা করতে পারে সে বিষয়টি নিশ্চিত করা। সালমা ফোনে তার ছেলের খোঁজখবর নিতে পারবে এবং উৎসব পার্বণে ছেলে মায়ের কাছে আসবে। সকলের সম্মতিতে সিদ্ধান্ত পত্রটি লিখিত হয়।

জাফর বরিশালে ফিরে যান এবং ফোনে রেজিষ্ট্রেশনের তার ছেলের প্রকৃত মায়ের নাম পরিবর্তনের বিষয়টির কাজের অগ্রগতি জানাতে থাকেন এবং খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে নাম পরিবর্তন করে সালমার (রায়হানের প্রকৃত মা) নাম অন্তর্ভূক্ত করেন এবং রেজিষ্ট্রেশন ফরমের সকল কাগজপত্র সংস্থায় দিয়ে যান।

সালমাকে সংস্থায় আসতে বলি এবং তাকে তার নাম যে ছেলের রেজিষ্ট্রেশন ফরমে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে সে সংক্রান্ত সকল প্রমানাদি তার হাতে তুলে দেই। সালমার চোখে আনন্দের অশ্রু চিকচিক করছিল এবং সে বলেন আমি পেরেছি আপা। ছেলেকে নিজে কাছে রাখতে না পারার অপরাধ বোধ প্রতিনিয়ত আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিলো। আজ আপনার মাধ্যমে আপনার সংস্থায় মাধ্যমে একটা প্রতিবাদ করেছি এবং সফলও হয়েছি। ছেলে এখন আমাকে নিয়মিত ফোন করে, সামনের মাসে ঢাকায় আসবে। তার বাবার কোন আপত্তি নেই বলে জানাই। এ যেন এক অসাধারন গল্প একজন বঞ্চিত মায়ের সাফল্য।

সন্তান জন্ম দিয়ে তার আবেগ ভালোবাসা দিয়ে সন্তান বড় করেও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই সেই মায়ের। মাকে এই স্বীকৃতি দিতে চায় না সমাজ, তথা এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। সালমার মতো হাজারো নারী শুধুমাত্র সন্তানের প্রকৃত অভিভাবকত্বের আশায় ঘুরে ফিরে আদালতের দ্বারে দ্বারে। তবু এই সমাজ, আইন আর তথাকথিত পুরুষ রা যে মা ৯ মাস গর্ভে ধারন করে সেই মাকেই বঞ্চিত করে সন্তানের প্রতি সর্বময় অধিকার থেকে। একজন নারীর জন্য এ লড়াই বড় বন্ধুর, এ পথ পাড়ি দিয়ে কবে এ দেশের নারীরা কোন আইনের বেড়া জাল না পেরিয়ে সন্তানকে বুকে নিয়ে বাঁচবে তা আমার জানা নেই।

আমরা ভুলে যাই শিশুর জন্মদান থেকে শুরু করে বড় হওয়ার প্রক্রিয়ায় মায়ের ভূমিকাই প্রধান। আমি মনে করি মা বাবা দু’জনেরই অভিভাবক হিসাবে একই মর্যাদায় থাকা উচিত। তাই সন্তানের অভিভাবক হিসাবে বাবার নামের পাশে মায়ের নাম ব্যবহারে এদেশের নারীদের কিছুটা হলেও অসহায়ত্বের ভার কমেছে এবং এটি সমাজে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। মা পাবেন স্বস্তি এবং বাবারা বুঝবেন এবং অনুধাবন করবেন বা করছেন যে তারাই শুধুমাত্র অভিভাবক নন। মাও সন্তানের অভিভাবত্বের দাবীদার। যার প্রমান রয়ে যাবে কাগজে কলমে। যা অস্বীকার করবার আর কোন সুযোগ থাকবে না।

সারাবাংলা/এসএস

অতঃপর মায়ের অভিভাবকত্ব!
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন