শুক্রবার ২৬ এপ্রিল, ২০১৯ ইং , ১৩ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৯ শাবান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

সেলিনাদের গল্প

জানুয়ারি ২০, ২০১৯ | ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ

রাজনীন ফারজানা ।।

 

এক কামরার একটা ঘুপচি ঘরের এক চিলতে জানালা দিয়ে দিনের বেলাতেই আলো আসে কোনমতে। এই ঘরটাতেই পুরো একটা সংসার। ঘরের বাইরে সব ভাড়াটেদের জন্য বারোয়ারি রান্নাঘর আর বাথরুম। সেলিনাদের  ঘরের অর্ধেকটা জুড়েই ভাঙাচোরা খাট। খাটের নীচে উঁকি মারছে মুখের একদিকে কাটা একটা পাকা পেঁপে, প্লাস্টিকের নানা আকারের ঝুড়িতে অর্ধেকটা সংসার। ঘরের চারদিকে দড়িতে ঝুলছে নানারকম কাপড়। এক কামরার এই সংসারটা গার্মেন্টসকর্মী সেলিনার।

হাই স্কুলের শিক্ষকের মেয়ের সেলিনার ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া শিখে ভালো কিছু করবেন জীবনে। কিন্তু বাল্যবিয়ে আর দারিদ্র্যের কষাঘাতে সেলিনার এখন জায়গা হয়েছে খিলগাঁওয়ের সিপাহীবাগের এই এক কামরার সংসারে। বাবা ছিল হাই স্কুলের শিক্ষক। কিন্তু ছয় ছেলেমেয়েসহ আটজনের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হত। বড় মেয়ের বিয়ে দেন বিশ বছর বয়সে। কিন্তু বাকিদের জন্য আর অপেক্ষা করেননি। বাকি তিন মেয়েকেই বিয়ে দেন অল্প বয়সে।

বর্গা চাষীর ছেলের সাথে বিয়ের প্রস্তাব আসে ১৪ বছরের সেলিনার। সেলিনার বাবার হাতে পায়ে ধরে কেঁদেকেটে বলেন, তার সংসারে কাজ করার লোক নাই। বর্গাচাষী ছেলের বিয়ে দিয়ে তিনি একজন কাজ করার লোক নিতে চান। সেলিনার মায়ের আপত্তি স্বত্ত্বেও একরোখা বাবা বিয়ে দিয়ে দেন সেলিনাকে। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি শুরু হয় কিশোরী সেলিনার। স্বামী অন্যের জমিতে কাজ করে ফসল নিয়ে আসে। ফসল রোদ দিয়ে, ঝেড়ে পুঁছে ঘরে তুলতে হত একা হাতে। কিন্তু অভাবের সংসারে প্রায়ই ছেলেমেয়ে নিয়ে না খেয়ে থাকতে হত। আর ধার দেনা চলত প্রায় প্রতি মাসেই।

সেলিনাদের গল্প

অভাব সহ্য করতে না পেরে ভাইয়ের পরামর্শে ঢাকায় চলে আসে সেলিনার পরিবার। চেকার হিসেবে কাজ শুরু করেন মালিবাগ চৌধুরিপাড়ার একটা গার্মেন্টসে। সেলিনার স্বামী নানারকম কাজের চেষ্টা করে শেষমেশ ঠিকাদারি কাজে রডের হেলপারি শুরু করেন। কিন্তু তার তিনশো টাকার রোজ কামাইতে পাঁচজনের সংসার চলে না। তাতেও অভাব মেটে না সেলিনাদের। বাধ্য হয়ে সেলিনা তাই নিজের সাথে কাজে নিয়ে নেন বড় মেয়ে দশ বছরের আয়শাকে। ছোট দুটোকে পাঠিয়ে দেন গ্রামে। এখন খিলগাঁওয়ের দক্ষিণ বনশ্রী এলাকার ছেলেদের প্যান্ট বানায় এমন এক গার্মেন্টসে মা করেন চেকারের কাজ আর ষোল বছরের আয়শা অপারেটর।

ত্রিশোর্ধ সেলিনার পাঁচজনের সংসারের মোট আয় প্রায় বিশ হাজার। কেউ অসুস্থ হয়ে কিংবা অন্য কোন সমস্যায় একদিন কাজে যেতে না পারলে তা নেমে আসে আঠারো হাজারে। এই দিয়ে খেয়ে পরে ধারদেনা ছাড়া দিন চলে গেলেও ভবিষ্যতের জন্য এক পয়সা সঞ্চয় করার উপায় নাই। সেলিনা ও তার স্বামীর বয়স বেড়ে গেলে বা হঠাৎ করে কাজ চলে গেলে কী খাবেন, কোথায় থাকবেন জানেন না সেলিনা।

সিপাহীবাগ এলাকায় আয়শাদের এক কামরার ঘর ভাড়া মাসে তিন হাজার টাকা। গ্রামে থাকা দুই সন্তানের জন্য প্রতিমাসে পাঠাতে হয় পাঁচ হাজার টাকা। বাকি টাকায় চলে বাজার খাওয়া। গার্মেন্টসের কাছেই থাকেন তাই যাওয়া আসার কষ্ট তেমন নাই। সেলিনা আর তার মেয়ে আয়শার আয়ের প্রায় পুরোটাই ঘরভাড়া আর ছোট দুইজনের পড়াশোনার জন্য খরচ হয়ে যায়।

প্রতিদিনের খাওয়াদাওয়ার জন্য তাই সেলিনার স্বামীর দৈনন্দিন মজুরিই ভরসা। তাদের সংসারে তিনদিনের জন্য লাগে পাঁচ কেজি চাল। ৪২ টাকা কেজি চালে পাঁচ কেজি কিনতে খরচ পড়ে ২১০ টাকা। আর দুইদিনের জন্য লাগে ১০০ টাকার বাজার। তাই মাঝমধ্যে কাজে যেতে না পারলে দোকান থেকে বাকিতে খাবার এনে খেতে হয়। এর মাঝেই আছে অসুখবিসুখ বা জরুরি প্রয়োজন। এমন কিছু হলে বাকিতে কাজ চালিয়ে নেন। পরে আবার কাজ করে ধার শোধ করেন।

সেলিনাদের গল্প

তিনবেলা ভাতই চলে সেলিনার সংসারে। সকালে ভর্তাভাতের সাথে মাঝেমধ্যে ডিমভাজি থাকে। দুপুরে ডাল আর আলু বেগুনের তরকারি। রাতে দুপুরের থেকে যাওয়া ভাত তরকারিতেই চলে যায়। ভাত না থাকলে চা আর রুটি এনে খান। তাদের পরিবারে কোন নাস্তা খাওয়া হয় কিনা জানতে চাইলে সেলিনা বলেন মাঝেমধ্যে কেক বা বিস্কিট নিয়ে যান গার্মেন্টসে। এমনিতে বাসায় ভাত ছাড়া বাড়তি খাবারের ব্যবস্থা নাই। গরীবের সংসার বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন সেলিনা। মাসে কয়দিন মাছ মাংস খান জানতে চাইলে সেলিনা বলেন, টাকার জন্য মাছ মাংস খেতে পারেননা ততটা। মাসে আট থেকে নয়দিন খেতে পারেন। কারণ একবার কিনলে পাশের বাসার ফ্রিজে রেখে খেতে পারেন।

এখন প্রতিদিন পেটে ভাত জুটলেও বা ধারদেনা না থাকলেও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত সেলিনাদের। কারণ তাদের গার্মেন্টসে পাঁচ মাস হল কোন ওভারটাইম হয়না। বছরে দুটো বোনাস যা বেতনের অর্ধেক। সবই খরচ হয়ে যায়। বাড়িতে কিছু জমি কেনার বা মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য কোন সঞ্চয় করতে পারেননা তারা। লেখাপড়া জানার পরেও ব্যাংকে কোন একাউন্ট নাই তাদের। সেলিনা বলেন, সে কিছুই চেনেনা তাই ব্যাংকে যেয়ে একাউন্ট খোলা হয়নি। এদিকে ভারি কনস্ট্রাকশনের কাজ করার কারণে সেলিনার স্বামীর কোমরের হাড়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এর জন্য চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য তো নাইই, উপায় নাই একদিন ঘরে শুয়ে থাকার। এদিকে অন্য কোন কাজও পারেনা তার স্বামী।

শুধু মা-মেয়ের আয়ে সংসার চলে না। স্বামী পুরোপুরি পড়ে গেলে কি হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করেন সেলিনা। শুধু বড় মেয়ের বিয়েই নয় ছোট দুই সন্তানের পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যাবে। বড় মেয়েকে ক্ষুধার যন্ত্রনায় পড়াশোনা করাতে পারেননি, শৈশবেই কাজে ঢুকিয়েছেন। কিন্তু ছোট দুইজনকে লেখাপড়া করাতে চান তিনি।

সেলিনাদের গল্প

মেয়েকেও কি নিজের মতো অল্প বয়সে বিয়ে দেবেন কিনা জানতে চাইলে সেলিনা বলেন, তার বাবা যে ভুল করছিলেন সেই একই ভুল তিনি করবেন না। ভালো ছেলে (চাকরি করে এমন) না পেলে বিয়েই দেবেন না। শূন্য চোখে তাকিয়ে যোগ করেন, ‘‘তাছাড়া মেয়ের আয়ে সংসার চলে। বিয়ে দেবোই বা কীভাবে!’’

শুক্রবার একটা দিন ছুটি। টিভি দেখা আর সারাদিন শুয়ে বসে কাটানো ছাড়া আর কোন বিনোদন নাই সেলিনাদের জীবনে। কারণ কোথাও যেতেও লাগে বাড়তি টাকা। জীবনের প্রয়োজন মেটাতেই যেখানে হিমশিম খান সেলিনা কিংবা আয়শারা সেখানে আর কিছু নিয়ে ভাবার অবসর জোটে না তাদের। ভবিষ্যৎ অজানা হলেও দিনের শেষে সেলিনাদের একটাই শান্তি মাসের শেষে কোন ধারদেনার বোঝা নাই মাথার উপর।

ছবি- নিজস্ব

সারাবাংলা/আরএফ/এসএস

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন