সোমবার ২২ এপ্রিল, ২০১৯ ইং , ৯ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৪ শাবান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

হাসপাতালে দুদক: বিভক্ত চিকিৎসকরা

জানুয়ারি ২৪, ২০১৯ | ১১:২৬ অপরাহ্ণ

।।  জাকিয়া আহমেদ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট।।

ঢাকা: ঢাকাসহ দেশের আটটি জেলায় ১১টি হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে রাজধানীতে ৪০ শতাংশ চিকিৎসককে অনুপস্থিত পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আর উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে অনুপস্থিতির হার ছিল প্রায় ৬২ শতাংশ। চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি ও হাসপাতালগুলোতে দুদক অভিযান চালাতে পারে কি না, তা নিয়ে চিকিৎসকরা প্রায় দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছেন। আর দুদক বলছে, এ ধরনের অভিযান চালানোর এখতিয়ার তাদের রয়েছে। আর এই অভিযানের পর চিকিৎকদের উপস্থিতি বেড়েছে বলেও দুদক জানায়।

 এদিকে, চিকিৎসকদের একাংশের দাবি, দুদকের কাজ দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা। সরকারি হাসপাতালগুলোয় গিয়ে চিকিৎসকদের হাজিরাখাতা দেখা দুদকের এখতিয়ারে পড়ে কি না—এমন প্রশ্ন তুলছেন তারা। আবার কেউ কেউ এ-ও বলছেন, ভূমি, রাজস্ব, পুলিশ, শিক্ষা, বিআরটিএ কিংবা সচিবালয়ে গিয়ে কর্মকর্তাদের হাজিরা খাতা চেক করতে পারবে দুদক?

বিজ্ঞাপন

বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও চিকিৎসকরা নানান ধরনের মন্তব্য করছেন। চিকিৎসক নোমান খালিদ চৌধুরী লিখেছেন, ‘কর্মস্থলে অনুপস্থিতির বিষয়টি দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। এটি প্রচলিত ‍দুর্নীতি নয়, দুদকের প্রধান কাজ দুর্নীতি দমন।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাপাতালের চিকিৎসক রাশেদুল হাসান সারাবাংলাকে বলেন, ‘অন্য যেকোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর মতো চিকিৎসকদের ১০০ ভাগই যদি নয়টা থেকে ৫টা ডিউটি করেন, তাহলে এরপরে ডিউটি করবে কে? চিকিৎসকদের কেউ সকালে ডিউটি করবেন, কেউ বিকালে ডিউটি করবেন, এটাই স্বাভাবিক। দিনের একটি বিশেষ সময়ের অভিযানে তো সব ডাক্তারকে একসঙ্গে পাওয়া যাবে না। যিনি রাতে ডিউটি করবেন, তাকে তো সকালে উপস্থিত পাওয়া যাবে না। তবে কেউ ফাঁকি দিলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

জানতে চাইলে সরকার সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিব)-এর সভাপতি এম ইকবাল আর্সলান সারাবাংলাকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ও অধিদফতরের যারা মনিটরিংয়ের দায়িত্বে রয়েছেন, এটা তাদের ব্যর্থতা। তাদের ব্যর্থতার জন্যই দুদক অভিযানে গেলো। দুদক তাদের কল সেন্টারে অভিযোগ পেয়ে গিয়েছে। তারা কিছু চিকিৎসককে অনুপস্থিতি পেয়েছে। কিন্তু তারা যে পরিসংখ্যান দিয়েছে যে ৬২ শতাংশ অনুপস্থিত, সেই পরিসংখ্যান কতটুকু সঠিক, সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।’

এম ইকবাল আর্সলান আরও বলেন, ‘টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্বরত ১৫ জন চিকিৎসকের মধ্যে ৬ জন ডেপুটেশনে, ১ জন প্রশিক্ষণে, ১ জন পিএলএতে রয়েছেন বলে জানতে পেরেছি। রোস্টারে নাম ছিল কিন্তু উপস্থিত ছিল না, তাদের নাম দেখে অনুপস্থিত বলে ধরা হয়েছে। তাই দুদকের দেওয়া ৬২ শতাংশ অনুপস্থিতির পরিসংখ্যানের বিষয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে।’

(স্বাচিব)-এর সভাপতি বলেন, ‘আরেকটি বিষয় হচ্ছে, চিকিৎসকরা রোস্টারভিত্তিক ডিউটি করেন। যারা সন্ধ্যা রাতে দায়িত্ব পালন করেন, তারা তো সকালের ডিউটিতে থাকেন না। এটাকে অনুপস্থিত হিসেবে দেখা গেলেও প্রকৃতপক্ষে তারা অনুপস্থিত নন। তিনি হয়তো রাতে ডিউটি করেছেন। তাকে দিনে তো পাওয়া যাবে না। এটা তো অন্য অফিসের মতো ৯-৫টা অফিস না।’

দুদকের অভিযান নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ইকবাল আর্সলান বলেন, ‘দুদক বলছে, যদি সরকারি কর্মচারি বা কর্মকর্তা হয়ে উপস্থিত না থেকে বেতন নেন, তাহলে এটা দুর্নীতি। তাদের সে অধিকার রয়েছে অভিযান চালানোর। কিন্তু চিকিৎসকদের বা স্বাস্থ্যকর্মীদের অনুপস্থিতি দেখার জন্য আমাদের সুপারভাইজিং অথোরিটি, সিভিল সার্জন, বিভাগীয় পরিচালক রয়েছেন। সে দায়িত্ব পাালনে তারা ব্যর্থ হয়েছেন বলেই দুদক আজ অভিযানে গেলো। তারা ব্যর্থ হলেন কেন?’

আরও পড়ুন : চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি ‘গ্রহণযোগ্য’ নয়, ব্যবস্থা নেবে মন্ত্রণালয়

তবে, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন মহাসচিব ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘দুদক বললেই হবে না যে, এত সংখ্যক চিকিৎসক অনুপস্থিত ছিলেন। ’ তিনি বলেন, ‘এভাবে অভিযানে যদি মাঠপর্যায়ের চিকিৎসকরা রুখে দাঁড়ান, তাদের দায়িত্ব থেকে, পেশা থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দেন, তখন কি দুদক এসে চিকিৎসা দেবে?’

এদিকে, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রভাষক তরুণ চিকিৎসক ডা. জাহিদুর রহমান বলেন, ‘শুধু ডাক্তার নন, সব সরকারি কর্মকর্তাই অফিস ফাঁকি দেন। ডাক্তারদেরটা বেশি চোখে পড়ে, কারণ তারা সংখ্যায় অনেক। হাসপাতাল ছাড়া আর কোনো জায়গায় একসঙ্গে এত সরকারি কর্মকর্তা পাওয়া যায় না। দুদক কিন্তু গতকালকেও ভালো ছিল। আজকে যেই তারা চিকিৎসকদের হাজিরা খাতা চেক করলো, সেই খারাপ হয়ে গেলো! আজকে হাসপাতালে হানা দিয়ে ডাক্তারদের কাছে খারাপ হয়েছে, কালকে কোচিং সেন্টারে হানা দিয়ে শিক্ষকদের কাছে খারাপ হবে। এটাই স্বাভাবিক, এই খারাপ হওয়াটাই ভালো।’

তবে কেবল হাসপাতালে হানা নয়, পাশাপাশি হাসপাতালের চারিদিকে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ক্লিনিকগুলোতে হানা দেওয়া দরকার মন্তব্য করে জাহিদুর রহমান বলেন, ‘তাহলে মানুষ বেশি উপকৃত হতো। কারণ অনেক চিকিৎসকই সকালে হাসপাতালে হাজিরা দিয়ে রোগী দেখেন ক্লিনিকগুলোতে। সেই কাজগুলোই আমরা অনেকে করছি, হাসিমুখেই করছি। নিজেদের অন্যায়গুলো স্বীকার করে অনুতপ্ত হওয়ার বদলে সেগুলোকে জায়েজ করার চেষ্টা করছি।’

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই-মাহবুব সারাবাংলাকে বলেন, ‘চিকিৎসকরা উপস্থিত থাকেন না, এটা তো অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু এর সমাধান কী, সেটা খুঁজে বের করতে হবে। চিকিৎসকরা কী কাজের জায়গা নিয়ে সন্তুষ্ট নন, তা আগে খুঁজে বের করতে হবে।’

অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, ‘‘হেলথ সার্ভিস সিস্টেমে’ কোনও সমস্যা রয়েছে কি না, তাও দেখতে হবে। ‘অ্যাপোয়েন্টমেন্ট-ওয়ার্ক সেটিসফেকশন-জবাবদিহিতা’ সবকিছু মিলিয়ে দেখতে হবে। তারা কেন যাচ্ছেন না, তা নিয়ে সরকারকে কাজ করতে হবে।’’

আরও পড়ুন:  ১০ হাসপাতালে দুদকের অভিযান, ৯২ চিকিৎসক অনুপস্থিত

এদিকে, চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি নিয়ে বিষয়টিকে অত্যন্ত ‘বিব্রতকর ও লজ্জাজনক’ আখ্যা দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরে পরিচালক (হাসপাতাল অ্যান্ড ক্লিনিক) অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘‘জাতির কাছে আমাদের লজ্জার কোনো শেষ নেই। এ প্রশ্নের উত্তর দিতে অত্যন্ত বিব্রতবোধ করছি। এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ‘ডিরেক্টর অব হসপিটাল’ হিসেবে আমার লজ্জার শেষ নেই।’’

স্বাস্থ্য অধিদফতরে পরিচালক বলেন, ‘‘চিকিৎসকরা চাকরি করবেন, বেতন নেবেন কিন্তু অনুপস্থিত থাকবেন—এটা মেনে নেওয়া যায় না। ইতোমধ্যেই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রণালয় থেকে এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে দুটি সেল করা হয়েছে।’ এই সেলের সদস্যরা চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতি ‘ক্লোজলি মনিটর’ করবেন বলেও তিনি জানান।

দুদকের অভিযান নিয়ে চিকিৎসকদের প্রশ্ন তোলা নিয়ে জানতে চাইলে সংস্থটির পরিচালক মুনীর চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘সব জায়গায়ই আমরা অভিযান করছি।’ তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বলতে ছিল, চিকিৎসকদের উপস্থিত না থাকা, দিনের পর দিন বা ৫ জনের স্থলে একজন থাকা অথবা কেউ না থাকা। বারবার মানুষের কাছ থেকে এমন অভিযোগ পেয়েছি। ওই অভিযোগে আোদের হটলাইনে এসেছে। ’

দুদক পরিচালক বলেন, ‘‘কর্মস্থলে না থেকে বেতন তোলাও ‘এ টাইপ অব করাপশন’। সেই হিসেবে কেবল হাসপাতাল নয়, প্রতিটি পাবলিক অফিস দুদকের নজরদারিতে রয়েছে। এটা আমাদের আইনের আওতায় করাপশন প্রিভেনশন স্ট্রেটেজি। এটা আমাদের দুর্নীতি বা অনিয়ম ঘটে যাওয়ার আগে প্রতিহত করার রীতি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সেদিন অভিযানের পর আমাদের কাছে রিপোর্ট এসেছে, এরপর ব্যাপকভাবে চিকিৎসকদের উপস্থিতি বেড়েছে। এখন আপনাকেই আমার প্রশ্ন, এখন কেন তারা রেগুলার হচ্ছেন?’

শুধু চিকিৎসক বা হাসপাতাল নয়, প্রতিটি পাবলিক সার্ভিস ওরিয়েন্টেড প্রতিষ্ঠানে দুদকের অভিযান চালানোর এখতিয়ার রয়েছে বলেও জানান দুদকের পরিচালক মুনীর চৌধুরী।

সারাবাংলা/জেএ/এমএনএইচ

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন