বৃহস্পতিবার ২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ইং , ১২ বৈশাখ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ শাবান, ১৪৪০ হিজরী

বিজ্ঞাপন

পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া রে…

জানুয়ারি ২৬, ২০১৯ | ১:৫০ অপরাহ্ণ

মোসফেকা আলম ক্যামেলিয়া ।।

১৯৯৬ সালের এক শীতের সকাল। ইস্কাটনে থিয়েটার সেন্টার ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট নামক এক এনজিওতে কাজ করি। কর্ণধার শহিদুল আলম সাচ্চু, সাইফুল ইসলাম নিপু ও রেহানা সামদানী কনা। একদিন তাদের রুমে হঠাৎ ডাক। একটা খাম এগিয়ে দিল। উৎসুক হয়ে খুলে নিজের চোখকেও বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না। আমার নামে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের টিকেট। গন্তব্য ইউরোপ।

Passe Partout নামক এক ব্রিটিশ সংস্থার ইনভাইটেশনে Theatre in Education প্রজেক্টের কাজে অংশগ্রহণের জন্য ১৯৯৭ সালে প্রথমবারের মত বিলেতে পা রাখলাম। পুরনো ঢাকার মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে আমি। বিদেশ পাড়ি দেয়া ছিল রীতিমত কল্পনাতীত। সেই কল্পনাকে হাতের মুঠোয় এনে দেবার জন্য সেই মেয়েটি আজও তাদের কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে।

আমাদের কাজ ছিল মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। কাজ বলতে প্রায় ৩৯টি স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের সাথে ভাববিনিময় আর থিয়েটারের মাধ্যমে নিজেদের সংস্কৃতি তুলে ধরা। শুরু থেকে শেষ অবধি বোরিং কিছু আলোচনার চাইতে মজার যে চিত্রগুলো আজও স্মৃতিতে আসে তারই একটি দিয়ে গল্প শুরু করি।

সঙ্গী ছিল সংস্থার অন্যতম সদস্য রিচার্ড আর কেনিয়া থেকে আগত মার্থা। আমাদের মূল কাজ ছিল এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকার রিপ্রেজেন্টেশন।

ইউরোপ ভ্রমণ

এবার শুরু করি সফরের প্রথম গল্প। গল্পটি চেনার বাইরের জগতের এক জীবনধারা নিয়ে। ডেনমার্কের এক শহরতলী। অদ্ভুত সুন্দর দেশ। রাস্তার ধার দিয়ে সমুদ্র দেখতে দেখতে একটা লাল জিপে যাত্রা। ডেনমার্কের সেই জিপসি অধ্যুষিত অঞ্চলটিতে পরিচয় হয়েছিল জিপসি এক মধ্যবয়সী পুরুষের সাথে। কালে কালে তার নাম বিস্মৃতিতে মিশে গেছে। জটার মতোন লম্বা চুল, গায়ের রং লালচে ফ্যাকাশে, সোনালী চুলের সাথে সোনালী কালোয় মেশানো দাড়ি। চোখ গুলো ধূসর। তাকাতে কেমন গা ছমছম করে। মনে হয় দূর অরণ্যের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছি। নাম দিলাম তার মার্কোপোলো। কেমন আছে সেই মার্কোপোলো? যার নাম নাই ইতিহাসে।

সমাজের প্রথা ভেঙে, নিয়ম ভেঙে নিজের বাউলিয়ানা মনের তাড়নায় হয়েছে ছন্নছাড়া। ঘর বেঁধেছে মনের মাধুরীতে। রাষ্ট্রের ভেতরেই রাষ্ট্রের আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গড়েছে নিজের ইচ্ছাধীন রাষ্ট্র। নিজের গড়া আইন। ক্রিশ্চিয়ানিয়া ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগের মূল কেন্দ্রের খুব কাছেরই এক শহর। ১৯৭১ সালে কিছু উদ্বাস্তু আর আর্টিস্টদের দখলের মাঝ দিয়ে এই শহরটি হয়ে যায় হিপ্পিদের এক শহর। এই উদ্বাস্তুদের এক বড় অংশ জিপসি। এস এম রশিদের জিপসি নিয়ে গবেষণা প্রবন্ধে পাই , রোমানি বা জিপসিরা ইউরোপে হাজির হয়েছিল ১৪ শতকের শেষ ও ১৫ শতকের প্রথম ভাগে। অর্থাৎ প্রায় ৫০০ বছর আগে। তাদের ভাষাও বিকশিত হয়েছে সমান্তরালভাবে। তবে তাদের নিয়ে আমার গল্প বলার আগে জিপসি নিয়ে এক কৌতুহলউদ্দীপক কথা জানাই।

‘জিপসি ” নামকরণের পেছনে আছে ঐপনিবেশিক বৃটেনের হাত। ইউরোপজুড়ে, মূলত ব্রিটেনে যেসব রোমানরা থাকত, তারা অনেক সময় কৃষি খামার থেকে টুকটাক চুরি করতো। ব্রিটিশরা ভারতের যাযাবর গোষ্ঠীকে ‘জিপসি ক্রিমিনাল ট্রাইবস’ নামে শ্রেণিভুক্ত করেছিল।

তবে ব্রিটিশরা যে পুরো ভারতকেই তখন লুটেপুটে নিয়েছিলো তা বুঝতে এই সংবেদনশীল জাতির দেরি হয়নি। প্রচলিত এক প্রবাদ ছিল রোমানিদের মধ্যে- ‘‘Ô0 Rrom chorel e khaini, o Gazho chorel e ferma” অর্থ রোমানি চুরি করে একটি মুরগি আর অ-রোমানি চুরি করে পুরো খামার।

ইউরোপ ভ্রমণ

যাই হোক, সেই ১৯৯৭ সালে দেখা আমার এই শহরের এক জিপসির সাথে। নাম মনে নাই। তাই আমার কাছে সে মার্কোপোলো। যে আমার চেনাজানা জগতের বাইরের এক জগত ভ্রমণের গল্প তার হাশিস এ টান দেয়া ঘোর চোখে বলছিল। একসেন্টের ভিন্নতার কারণে তার কথা প্রায় আশি ভাগই বুঝিনি। সবকিছু মনেও নেই। শুধু মনে আছে তার একটা ঘোড়া ছিল। আর মাথায় ছিল কাউবয় হ্যাট। এখনও চোখে ভাসে লোকটা ঘোড়ার পিঠ দলাই মলাই করতে করতে কী যে বলছে আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। মাঝে মাঝে হাত উচু করে আকাশ দেখাচ্ছে আবার কখনও পা দিয়ে মাটির উপর বুটের আঘাত দিতে দিতে দুই হাত ছড়িয়ে কথা বলছে।

তার পাখির ভাষা শুনতে শুনতে আশেপাশে চোখে পড়ল চারপাশের বাড়িগুলোর উপর। ৩৪ হেক্টর জায়গার বাড়িগুলো কার্টুনে দেখা বাড়িগুলোর মত নানা আকারের। সবগুলোই কাঠের। কোনটা যেন আস্ত একটা ডিম, কোনটা বিশাল এক জুতা, কোন ঘর আবার এবড়োথেবড়ো হয়ে ভয়ংকর সুন্দর দেয়াল পেইন্টিং নিয়ে দাড়ানো। আবার কিছু কিছু হয়তো বিভিন্ন পেইন্টিং এর খন্ড খন্ড অংশ দিয়ে গড়া।  আশেপাশে বেশ কয়েকটি ক্যারাভ্যানও চোখে পড়ল।

আমাদের মার্কোপোলো জানালো, সামার চলে আসছে। তাই শহরের মানুষগুলো তাদের জমানো দমগুলো ছাড়তে এবার এদিকটায় ভীড় জমাবে। মার্কোপোলোর ঘরে গেলাম না। কোথায় জানিও না। কার্টুনের মতোন গড়া বাড়িগুলোর পাশে চোখে পড়লো বিশাল এক দুর্গ। বলল, ল্যান্ডলর্ড। অবাক হলাম, ছন্নছাড়া জীবনেও বুঝি প্রভু থাকতে হয়?

আমার সাথে ছিল বৃটিশ রিচার্ড আর কেনিয়ার মার্থা। কাজের কথা নাই বা বলি। রিচার্ডই মূলত তার ভাষা আমাদের ভেঙে ভেঙে বোঝাচ্ছিল। কথা বলতে বলতে একসময় তৃষ্ণার্ত হলাম। মার্কোপোলো হাত দিয়ে এক কাঠের সরাইখানা দেখিয়ে দিল। হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্র তীরবর্তী সেই সরাইখানায় ঢুকলাম। কাঠের হাফ দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়লো গোল কতগুলো টেবিল আর চেয়ার, কয়েকটি কাঠের বেঞ্চ, একটা ধুৃলায় ভরা পিয়ানো আর একটা কাচের র‌্যাক যার উপরে বিভিন্ন বৈয়ামে রাখা চা পাতা, চিনি, বিস্কিট, আর একটা বৈয়াম ভর্তি কয়েন। বেশ কয়েকটা জগাকৃতির কাচের বোতল যাতে লাল, খয়েরি তরলে পূর্ণ। কাচের শেলফের অপর পাশে সার্ভ করবার বা রান্না করবার স্পেস। তবে দিন শেষ না হওয়ায় কেউই সেখানে ছিল না। দিনে তারা বেরিয়ে যায় ভিক্ষায়। রাতে এসে জোট বেঁধে হল্লা করে। রিচার্ড সামনে রাখা চার্ট দেখে পকেট থেকে খুচরো পয়সা সেই পয়সার বৈয়ামে রাখলো। এরপর ইলেকট্রিক জগে নিজেই চা বানিয়ে আমাদের পরিবেশন করে নিজেও চুমুক দিলো।

সারা দুনিয়া যাদের আমরা চোরের জাতি বলে চিনি, তাদের বিশ্বাসের সচিত্র চিত্র বিস্মিত হয়ে দেখতে দেখতে চায়ে ফুঁ দিলাম। সভ্য সমাজের নিষিদ্ধ সব পসরা নিয়ে তারা ব্যবসা করে বেড়ায়। ৪০ রকমের হাশিস সেখানে পাওয়া যায় ঘরগুলোতে। একটা জিপসি ঘরের বন্ধ জানালায় উঁকি দিল আমার অনুসন্ধানী মন, সোফা , বিছানা, বাসনপত্র, জামা কাপড়ের সাথে ওয়াশিং মেশিনও চোখে পড়লো।

শহরটি রাষ্ট্রের সাধারণ কড়া আইনের বাইরে আগেই বলেছি। শুধু ‘ডু’ আর ‘ডু নট’ এর কিছু সাইন। কোন জায়গায় লেখা ‘ নো রানিং’ বা ‘নো ফটোগ্রাফি অর ফিল্মিং’। গুগলে জানলাম, ২০১২ সালের দিকে প্রায় ৪০ বছরের সরকারের সাথে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। ‘আমাকে আমার মতোন থাকতে দাও’ নীতির জয়ের মাঝে তারা এক বাউলিয়ানা জীবনের অধিকার পেয়েছে। ফিরে আসার সময় থমকে গেল চোখ ‘You are now entering the EU’  মানে ডেনিশ সরকার মনে করিয়ে দিচ্ছে, তুমি ফিরেছো তোমার সভ্যতায়!  আমি পেছন ফিরে তাকালাম একবার অসভ্য বিশুদ্ধ বাতাসে আর পা দিলাম আমার সভ্য বন্দীশালায়।

 

লেখক: প্রভাষক, তেজগাঁও কলেজ

 

সারাবাংলা/ এসএস

পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া রে…
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন